ঢাকা, শনিবার 1 September 2018, ১৭ ভাদ্র ১৪২৫, ২০ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ওয়াইফ চেইনজের জন্য মানুষ কি সত্যই ব্যস্ত?

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : কী ভয়ানক ! একটি বই। নাম How to change your wife. একদিনে এর কপি বিক্রি হয় দুই মিলিয়ন অর্থাৎ ২০ লাখ। এতে নিশ্চয় প্রকাশক দারুণ খুশি। কারণ একদিনে কয়েক কোটি ইউরো বা ডলার উপার্জন। ভাবা যায়?
এমনই মাথা টাল করা খবর দিয়েছেন লন্ডন থেকে বন্ধু জনাব ফারুক হাসান। ওয়াইফ মানে বউ কতোটা একঘেয়ে এবং বিরক্তিকর হতে পারে তার জাজ্বল্যমাণ প্রমাণ এটি। হ্যা, বউ। বাংলায় মাত্র দুই অক্ষর। হিন্দিতেও তাই। ‘বহু’। বিহারের কাছাকাছি যেমন দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ অঞ্চলেও বউকে প্রায়ই ‘বহু’ বলে ডাকা হয়। ইংরেজিতে অবশ্য wife, ৪ বর্ণ। বাংলা কিংবা হিন্দির ডবল। তবে বাংলার কাছকাছি ভাষা তথা তামিল, অহমীয়া, উর্দু, নেপালি, রাখাইন বা রোহিঙ্গান প্রভৃতি ভাষাতেও বউ বা বহুই।
কোনো কিছুর নাম লিখতে অক্ষর বা বর্ণ যতো কম ততো সহজ এবং ভুলও হয় কম। যেনাম লিখতে অক্ষর বেশি তা লিখতে ভুলও বেশি হয়। এটা হাতে লেখুন বা কম্পিউটারে লেখুন, সমস্যা একই। শুধু কি বউ বা wife লেখতেই এ সমস্যা? না। বউয়ের মেয়ে কন্যা লেখতেও এমন বর্ণ নিয়ে ঝামেলা হয়। ‘কন্যা’। দুই অক্ষর। য-ফলা এবং আকারের ব্যাপার থাকলেও ইংরেজিতে Daughter লেখতে ৮ অক্ষর। কী ভয়ানক। দুই থেকে আট। ভাবা যায়? আমি ইংরেজিতে ডটার লিখতে প্রায়শ ভুল করি শুধু অক্ষরের আধিক্যের কারণে।
যাই হোক, বউ চেইনজ নিয়ে কথা শুরু। অন্যদিকে না গিয়ে কেন্দ্রীয় বিষয় নিয়েই নিবদ্ধ থাকি। বউ চেইনজের ব্যাপারটা খুব সহজ না হলেও অনেকেই তা চান। মুসলিমসমাজে বউ চেইনজের আইনগত ব্যবস্থা থাকলেও তা খুব সহজ নয়। অনেক ঝুঁকি আছে। তবে পৃথিবীর অনেক দেশে বউ বদলানো কোনও ব্যাপারই না। টাকা থাকলে তা অনেকটাই সহজ। আমার এক বন্ধু জার্মানি গিয়ে বউ বদলেছে। তবে বউ বদলালেই সুখী হওয়া যায় না। প্রায়শ বউ বদল হলে জীবনটাও আসলে বদলে যায়। জার্মানপ্রবাসী বন্ধুটির ক্ষেত্রেও জীবন বদলে গেছে। সে অন্য কাহিনী আরেক দিন বলা যাবে না হয়। ইউরোপ-আমেরিকায় বউ বদলাবার জন্য মানুষ যে প্রায় পাগলপারা উল্লিখিত বইয়ের বিক্রিসংখ্যাই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। লেখক বইয়ের নাম ‘হাউ টু চেইনজ ইউর ওয়াইফ’ দেননি। তিনি দিয়েছিলেন ‘হাউ টু চেইনজ ইউর লাইফ’। লেখকের মগজে এমনটি হয়তো ছিলও না। তিনি মানুষের জীবন বা এর ধারাক্রম পরিবর্তনের কথা ভেবেছিলেন। লেখকের মানসিকতা নিশ্চয়ই মননশীলতার পরিচায়ক। চিন্তাশীল মানুষের ভাবনা এমনই হবার কথা।
যিনি খবরটা দিয়েছেন, তিনি উল্লেখ করেছেন, এটা নাকি প্রিন্টিং মিস্টেক বা ছাপার ভুল। আমার কাছে তা মনে হয়নি। এর এডিটর ও পাবলিশার শলাপরামর্শ করে বইয়ের কাটতি বা প্রমোশন অব সেলসের জন্য এমন কৌশলের অবলম্বন করেছেন। লাইফের জায়গায় ওয়াইফ করে দিয়ে বাজিমাত করে ছেড়েছেন। ঘটনা যদি এমনই হয় তাহলে এডিটর ও পাবলিশারকে ধন্যবাদ দিতেই হবে। বিশেষত ‘হাউ টু চেইনজ ইউর ওয়াইফ-এর ঝানু পাবলিশারকে ধন্যবাদ না দিয়ে সত্যই কোনো উপায় নেই।
ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা বউ চেইনজের জন্য পাগল হলেও আমাদের এশিয়ানদের মধ্যে সেই তাড়া নেই। বিশেষত প্রকৃত মুসলিমরা এক ওয়াইফ নিয়েই লাইফ পার করতে আগ্রহী বেশি। তবে হাসবেন্ড ও ওয়াইফের মধ্যে বিশেষ কারণে বনিবনা বা মিল না হলে বিকল্প ব্যবস্থা আছে। আর এটা থাকাই সমীচীন। অন্যথায় তা অমানবিক পর্যায়ে চলে যায়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি গরমিল হয় এবং এক সঙ্গে বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়ে তাহলে আলাদা হবার অপসন থাকাটার নামই ইনসাফ বা মানবিকতা। মহানুভবতাও বলা যায়। কাউকে নিয়ে একসঙ্গে থাকা যদি অসম্ভবই হয় তাহলে জোরজবরদস্তি করে লাভ কী।
তবে বাঙালি মুসলিমসহ প্রায় মুসলিমই সংসার ভাঙে না। ভাঙতে চায় না। ইসলামী বিধান মুতাবেক স্বামী যেমন স্ত্রীর অলঙ্কার, তেমনই স্ত্রীও। একজন আরেক জনের পরিপূরক। স্বামী যেমন মূল্যবান সম্পদ। স্ত্রীও তেমনই। কেউ কারুর চেয়ে কম নয়। বেশিও নয়। মুসলিমসমাজে স্বামী-স্ত্রী পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ। এ বন্ধন আমৃত্যু অটুট। তবে সংসারজীবনে কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার সমাধান আছে। অপসন রয়েছে। বউ বদলের জঙ্গলি কানুন নেই। এখানেই মুসলিমসমাজ ও অমুসলিমসমাজের মধ্যে ফারাক। শুধু মুসলিমইবা বলি কেন, বাঙালি অমুসলিমরাও এখানে এক স্ত্রী নিয়েই জীবন কাটাতে আগ্রহী। যারা দেশের বাইরে গিয়ে বিশেষত ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে বাঙালিত্ব বিসর্জন দিয়ে বসেন তাদের কথা ভিন্ন।
তবে কোনো পরিবারে যদি কাজের প্রয়োজনে আরও লোকের দরকার হয় কিংবা আগের স্ত্রীরা শারীরিকভাবে অক্ষম হয় তাহলে মুসলিম গৃহকর্তার একাধিক স্ত্রী রাখবার অনুমিত আছে। এমনকি একসঙ্গে ৪ স্ত্রীও রাখতে পারে। এর বেশি নয়। তবে সকল স্ত্রীর সঙ্গে সমান আচরণ করবার কড়া নির্দেশ দেয়া আছে। যেমন: স্ত্রীদের যদি চিরুনি দেয়া হয় তাহলে সবারই যেন একই মানের হয়। এমনকি চিরুনির দাঁতগুলোও যেন সমানসংখ্যক হয়। বিষয়টা নিশ্চয়ই বোঝা গেছে?
লেখক যদি বইয়ের থিম পাল্টাতে না চান তাহলে ‘হাউ টু চেইনজ ইউর লাইফ’ -এর নাম বদলাবার সুযোগ প্রকাশকের নেই। তিনি প্রকাশকের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত মামলা ঠুকে দিতে পারেন। আর সে মামলা হতে পারে প্রতারণার। ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারেন। অতি মুনাফার লোভে প্রকাশকের যদি বইয়ের নাম পাল্টানো প্রমাণিত হয় তাহলে রয়েলটি যা লেখকের পাবার কথা তার চেয়ে বেশি ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। আর যদি রয়েলটির জন্য প্রকাশকের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন তাহলে একজন লেখকের জন্য তা দুর্ভাগ্যজনক।
‘হাউ টু চেইনজ ইউর লাইফ?’ এর পরিবর্তে বইটির নাম ‘হাউ টু চেইনজ ইউর ওয়াইফ?’ অর্থাৎ ‘আপনার বউকে বদলাবেন কীভাবে?’ চেইনজ মাত্র একটি অক্ষরের। ‘এল’ অক্ষরটিকে শুধু ‘ডব্লিউ’ করে দেয়া হয়েছে। ছিল লাইফ। হয়েছে ওয়াইফ। এতে আর কী? কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে ভাবুন। কী মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর পরিবর্তন ঘটেছে একটি মাত্র অক্ষরের পরিবর্তনে? লেখক লেখেছিলেন ‘জীবন বদলানো’। আর প্রকাশক করেছেন সেটাকে ‘বউ বদলানো’। দুটো কি এক ও অভিন্ন? নিশ্চয়ই না। আকাশ-পাতাল ফারাক।
ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের বউ বদলে তেমন অসুবিধে নেই। ইচ্ছে করলেই পারেন। আইনগত ঝামেলা মিটালেই আর সমস্যা তেমন নেই। তবে মুসলিমসমাজে ঝামেলা অনেক। যাদের সন্তানাদি নেই তাদের জন্য কিছুটা সহজ। আর যাদের সন্তান হয়ে গেছে তাদের জন্য বিষয়টা বেশ জটিল। তবু বউ বদলের ফর্মুলা যদি কেউ আবিষ্কার করেই ফেলেন তাহলে মন্দ কী ! এই হচ্ছে পশ্চিমা চিন্তাচেতনা।
আলোচ্য বই ‘হাউ টু চেইনজ ইউর ওয়াইফ’ যারা কিনেছেন, তারা সবাই বউ চেইনজ করতে চান তা হয়তো নয়। এইরকম হটকেক সমতুল্য বই কেউ সংগ্রহে না রেখে পারেন? তাই কেউ অতি আগ্রহে অথবা কেউ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেও বইটি সংগ্রহ করতে পারেন। তবে কেউ যাতে বইয়ে প্রাপ্ত উপদেশ বা পরামর্শ অনুযায়ী হুটহাট করে বউ বদলানোর কাজে হাত না দিয়ে বসেন। এতে হিতে বিপরীত হবার আশঙ্কাই বেশি। কারণ মূল বইটি কিন্তু ওয়াইফ চেইনজ নিয়ে নয়; লাইফ চেইনজ নিয়ে লেখা। এর সম্পাদক ও প্রকাশক প্রমোশন অব সেলসের জন্য এ অপকর্মটি করেছেন। বইটি প্রকাশের আগে এমন মাথা টাল হবার কা- সম্পর্কে বেচারা লেখক হয়তো কিছু জানতেও পারেননি।
তবে হ্যাঁ, যারা সত্যই সত্যই লাইফ চেইনজ করতে চান তারা ওয়াইফ চেইনজ করে দেখতে পারেন। ওয়াইফ চেইনজ করলে লাইফ যে চেইনজ হবেই তা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ ওয়াইফ চেইনজ করা কয়েক বন্ধুকে আমি প্রত্যক্ষ করেছি ওদের জীবন কীভাবে চেইনজ তথা তছনছ হয়েছে। সুখের সংসার কী করে ভাঙতে হয়, জীবন কী করে দুর্বহ ও বিপন্ন করে তুলতে হয় তা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। কাজেই যারা পুরনো পণ্যের মতো বউ বদলে ফেলতে চান তারা খুব সাবধানে এবং ভেবেচিন্তে এগুবেন। কাজটা যথেষ্ট টাফ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ