ঢাকা, শনিবার 1 September 2018, ১৭ ভাদ্র ১৪২৫, ২০ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিক্ষানীতি হতে হবে সমাজবান্ধব

মাহমুদুল হক আনসারী : শিক্ষা শিক্ষক ও সমাজ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সমাজের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে শিক্ষা ও শিক্ষক। তাই শিক্ষা শিক্ষক নীতিমালাকে সর্বদাই রাষ্ট্র ও সমাজবান্ধব করতে হবে।  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সমাজে যে আন্দোলন ও অস্থিরতা চলছে তাতে সরকার বার বার  এমপিও নীতিমালার কথা বললেও নানা জটিলতায় তা হয়ে উঠেনি। অবশেষে ১২ জুন ২০১৮ সরকার এমপিও নীতিমালা ২০১৮ শিরোনামে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। আপাতত দৃষ্টিতে এ নীতিমালার ভিত্তিতে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক এমপিওর সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেও শর্তের ভেড়াজালে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আটকে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সঙ্গত কারণে এ নীতিমালা কতটুকু  শিক্ষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে তা নিয়ে  নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমরা লক্ষ্য করে আসছি স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে নানা সংস্কার আনার চেষ্টা করলেও প্রকৃতপক্ষে দিনের পর দিন সমন্বয়হীনতা বেড়েছে শিক্ষাব্যবস্থায়। আশির দশকের মাঝামাঝি শিক্ষাক্রম ও শিক্ষার মাধ্যমসংক্রান্ত জটিলতা প্রকট হতে শুরু করে। এখন তা বিশৃঙ্খলতায় পরিণত হয়েছে।
এর সবচেয়ে বড় কারণ শিক্ষার বেসরকারিকরণ। ওই সময় শহরাঞ্চল, বিশেষ করে ঢাকায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের যাত্রা শুরু হয়, তাদের শিক্ষাক্রম ন্যাশনাল কারিকুলামভুক্ত নয়, তারা ইউরোপ বা আমেরিকার কারিকুলাম অনুসরণ করে থাকে। আগেও কিছু প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি মাধ্যম পড়ার সুযোগ ছিল, তবে তারা একই শিক্ষাক্রম মেনে চলত। স্কুল কলেজগুলো ছিল সম্পূর্ণ সরকারি অথবা আধা-সরকারি; সম্পূর্ণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছিল হাতেগোনা। এখন শহর মফস্বলে অগণিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ক্রমে বেসরকারি ইংরেজী মাধ্যম স্কুল ও মাদ্রাসার সংখ্য বাড়ছে; শহরে এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরই আধিক্য। একথা ঠিক যে, শহরে মধ্যবিত্তের পকেট কেটে বেসরকারি স্কুল কলেজগুলো চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানে দরিদ্র বা নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তানের প্রবেশাধিকার নেই। কারণ তাদের মা-বাবার পকেটের আকৃতি এসব প্রতিষ্ঠানের চাহিদার অকৃতির সমানুপাতিক নয়। তাদের ভরসা সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুলই বলা যায়। মফস্বলে বা গ্রামাঞ্চলে শহরের আদলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়। যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেখানে গড়ে উঠেছে সেগুলো কোচিং সেন্টারের বেশি কিছু নয়।
এসবের বাইরে যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে সেগুলো সরকারি না হলেও প্রচলিত অর্থে ‘বেসরকারি’ নয়। স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের  সহায়তায়, কিছুসংখ্যক উদ্যোক্তা শিক্ষকের চেষ্টায় সেগুলো চলে। তাঁরা বেশি সময় এই ‘বেসরকারি’ অবস্থায় থাকতেও চান না। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীরা প্রায়ই সরকারি সহায়তার দাবিতে রাজপথে নামেন। তাদের কাম্য এ সরকারি   সহায়তার নাম এমপিও (মান্থলি পে অর্ডার)। ২০১০ সালের পর থেকে এমপিও প্রদান বন্ধ রয়েছে। মাঝে মধ্যে কিছু এমপিও শর্তসাপেক্ষে ছাড়া হলেও তা একেবারে হাতেগোনা। এ অবস্থায় সরকারি এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি করেছেন। নীতিমালা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু তার প্রয়োগ সহজ ও যুক্তিসঙ্গত হতে হবে।
নীতিমালা যদি এমপিওভুক্তির প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়ায়, তাহলে উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। নীতিমালাকে সহনীয় করে শিক্ষকের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের কর্তব্য সামাজিক দায়বদ্ধতা আদায় করে নিতে হবে। শিক্ষকের প্রতি সমাজের যে পরিমাণ কর্তব্য রয়েছে, তার চেয়ে বেশী দায়িত্ব আছে সমাজের প্রতি শিক্ষকের। একটি আদর্শ সমাজ রাষ্ট্র পরিবার গঠনে শিক্ষকের দায়িত্ব কর্তব্য বলে শেষ করা যাবে না। শিক্ষকতার পেশা অন্য ১০ পেশার মতো গতানুগতিক পেশা বলে আমি মনে করি না। শিক্ষা পেশার সাথে নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষার নীতি নৈতিকতা মূল্যবোধ সমাজে জাগ্রত করার দায়িত্ব শিক্ষক সমাজের। তাদের প্রতিও সমাজ ও রাষ্ট্রকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখতে হবে। পারিবারিকভাবে আত্মমর্যাদায় তাদের বেঁচে থাকার অধিকার রাষ্ট্রকে দিতে হবে। বর্তমানে শহর গ্রামে যে হারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে স্কুল কলেজ গড়ে উঠছে মনে হয় না যে, এসবপ্রতিষ্ঠান কোনো নিয়মের মধ্যে চলছে। গুটি কয়েক ব্যাক্তি ও উদ্যোক্তার উদ্যোগে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় অথবা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো অনুমতি না নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত সেটাও জনগণ ভাবছে। নিয়মনীতির বিধিমালা না মেনে বাসা বাড়ির ছাদ, রাস্তার আঙিনায় নানা ধরণের এসব কঁচিকাঁচার শিক্ষার নামে গলা কাটা পকেট কাটা প্রতিষ্ঠানের লাগাম টেনে ধরতে হবে।
তাদেরকে নিয়ম নীতি মালার আওতায় আনতে হবে। যত্রতত্র ইচ্ছে মতো গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠানের বিরোদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার নামে অপশিক্ষা এবং ছাত্রছাত্রীদেরকে ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হবে। কোনটি আসল কোনটি নকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রী বুঝে নিতে কষ্ট হচ্ছে। এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদারকি ব্যবস্থা সবসময় থাকতে হবে। আমরা আশা করি যেসব শিক্ষক কর্মচারীকে বৈধ পন্থায় নীতিমালার মাধ্যমে আশ্বস্ত করা হযেছে তারা যেন বঞ্চিত না হন। পুণরায় হতাশায় না পড়েন। নীতিমালাকে সচ্ছ এবং সহজ করে শিক্ষা ও শিক্ষকবান্ধব করতে হবে। জাতির ও রাষ্ট্রের ভবিষৎতের কথা মাথায় রেখে এমপিওভুক্তিকরণ যৌক্তিকভাবে অব্যাহত রাখার পক্ষে জনমত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ