ঢাকা, রোববার 2 September 2018, ১৮ ভাদ্র ১৪২৫, ২১ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দান-সাদাক্বার ফযীলত

শাইখ ‘আবদুল্লাহ আল ক্বাফী মাদানী : ধন-সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তা’আলা। তিনি যাকে ইচ্ছা সেটা প্রদান করে থাকেন। এজন্য এ সম্পদ অর্জন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে তাঁর বিধি-নিষেধ মেনে চলা আবশ্যক। সৎ পন্থায় সম্পদ উপার্জন ও সৎ পথে সেটা ব্যয় করা হলেই তার হিসাব প্রদান করা সহজ হবে। কিয়ামতের দিন যে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কোন মানুষ সামনে যেতে পারবে না, তন্মধ্যে দু’টি প্রশ্নই ধন-সম্পদ বিষয়ক। প্রশ্ন করা হবে, কোন পথে সম্পদ উপার্জন করেছ এবং কোন পথে সেটা ব্যয় করেছ।
সন্দেহ নেই ধন-সম্পদ নিজের আরাম-আয়েশ এবং পরিবারের ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে ব্যয় করার অনুমতি ইসলামে আছে এবং অনাগত সন্তানদের জন্য সঞ্চিত করে রাখাও পাপের কিছু নয়। কিন্তু পাপ ও অন্যায় হচ্ছে, সম্পদে গরীব-দুঃখীর হক্ব আদায় না করা। অভাবী মানুষের দুঃখ দূর করার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা। অথচ আল্লাহ তা’আলা বলেন: “এবং তাদের সম্পদে নির্দিষ্ট হক্ব রয়েছে। ভিক্ষুক এবং বঞ্চিত (অভাবী অথচ লজ্জায় কারো কাছে হাত পাতে না) সকলের হক্ব রয়েছে।” সূরা আল মা’ আ-রিজ ৭০ : ২৪-২৫।
অধিকাংশ মানুষ দান-খয়রাত করতে চায় না। মনে করে এতে সম্পদ কমে যাবে। তাই সম্পদ সঞ্চিত করে রাখতেই সর্বদা সচেষ্ট থাকে, এমনকি নিজের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেও খরচ করতে কৃপণতা করে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : “মানুষ বলে আমার সম্পদ আমার সম্পদ অথচ তিনটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সম্পদই শুধু তার। যা খেয়ে শেষ করেছে, যা পরিধান করে নষ্ট করেছে এবং যা দান করে জমা করেছেÑ তাই শুধু তার। আর অবশিষ্ট সম্পদ সে ছেড়ে যাবে, মানুষ তা নিয়ে যাবে। সহীহ মুসলিম।
দান-সাদাক্বাহ্ করার ফযীলত: দান-সাদাক্বাহ্ করলে সম্পদ কমে না: আবূ কাবশা আল আনমারী (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত। তিন শুনেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : “সাদাক্বাহ্ করলে কোন মানুষের সম্পদ কমে না।” আত তিরমিযী হা: ২৩২৫, সহীহ; সুনান ইবনু মাজাহ।
ক) দান সম্পদকে বৃদ্ধি করে : পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “যারা আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করে তার উদাহরণ হচ্ছে সেই বীজের মতো যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। আর প্রতিটি শীষে একশতটি করে দানা থাকে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অতিরিক্ত দান করেন। আল্লাহ সুপ্রশস্ত সুবিজ্ঞ।” সূরা আল বাক্বারাহ্ ২ : ২৬১।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : “যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর পথে কোন কিছু ব্যয় করবে তাকে সাতশত গুণ সওয়াব প্রদান করা হবে।” মুসনাদ আহমাদ- হা: ১৯০৩৫, সনদ সহীহ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেন : “যে ব্যক্তি নিজের হালাল কামাই থেকে (আল্লাহ তা’আলা হালাল কামাই ছাড়া দান কবুল করেন না একটি খেজুর সাদাক্বাহ্ করে, আল্লাহ তা’আলা সেটা থাকেন, যেমন তোমরা ঘোড়ার বাচ্চাকে প্রতিপালন করে থাকো, এমনকি সেটা একটি পাহাড় পরিমাণ হয়ে যায়।” সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
খ) দানকারীর জন্য ফেরেশতা দু’আ করে : আবূ হুরাইরাহ (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন : “প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন দানকারীর জন্য দু’আ করে বলেন, “হে আল্লাহ! দানকারীর মালে বিনিময় দান করো (বিনিময় সম্পদ বৃদ্ধি কর)।” আর দ্বিতীয়জন কৃপণের জন্য বদ দু’আ করে বলেন, “হে আল্লাহ! কৃপণের মালে ধ্বংস দাও।” সহীহুল বুখারী- হা: ১৪৪২ ও সহীহ মুসলিম- হা: ৫৭/১০১০।
গ) দানকারীর দুনিয়া আখিরাতের সকল বিষয় সহজ করে দেয়া হয় : আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন : “যে ব্যক্তি কোন অভাবগ্রস্তের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তা’আলা তার দু’নিয়া ও আখিরাতের সকল বিষয় সহজ করে দিবেন।” সহীহ মুসলিম- হা: ৩৮/২৬৯৯।
ঘ) গোপনে দান করার ফযীলত : গোপন-প্রকাশ্যে যে কোনভাবে দান করা যায়। সকল দানেই সওয়াব রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন : “যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-খয়রাত করো, তবে তা কতই না উত্তম। আর যদি গোপনে ফকীর-মিসকিনকে দান করে দাও, তবে এটা বেশী উত্তম। আর তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষশা করে দিবেন।” সূরা আল বাক্বারাহ ২ : ২৭১।
ঙ) গোপনে দানকারী কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর আরশের নীচে ছায়া লাভ করবে : নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “কিয়ামত দিবসে সাত শ্রেণির মানুষ আরশের নীচে ছায়া লাভ করবে। তন্মধ্যে এক শ্রেণি হচ্ছেÑ “এক ব্যক্তি এত গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কি দান করে বাম হাত জানতেই পারে না।” সহীহুল বুখারী- হা: ১৪২৩ ও সহীহ মুসলিম।
চ) দান-সাদাক্বাহ্ গুনাহ মাফ করে ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচায় : নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “হে কা’ব ইবনু উজরাহ! সালাত (মহান আল্লাহর) নৈকট্য দানকারী, সিয়াম ঢাল স্বরূপ এবং দান-সাদাক্বাহ্ গুনাহ মিটিয়ে ফেলে যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে ফেলে।” আবূ ইয়া লা- সনদ সহীহ।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : “খেজুরের একটি অংশ দান করে হলেও তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবো।” সহীহুল বুখারী- হা: ১৪১৭ ও সহীহ মুসলিম- হা: ৬৮/১০১৬।
ছ) মানুষ কিয়ামতে দান-সাদাক্বার ছায়াতলে থাকবে : উক্ববাহ ইবনু ‘আমের (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত। নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইডি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “নিশ্চয় দান সাদাক্বাহ দানকারী থেকে কবরের উত্তাপ নিভিয়ে দিবে। আর মু’মিন কিয়ামত দিবসে নিজের সাদাক্বার ছায়াতলে অবস্থান করবে।” ত্বররানী, বাইহাক্বী, সনদ সহীহ।
লোক দেখানো দানে প্রতিদান নেই : কিন্তু বর্তমান যুগে অনেক মানুষ এমন আছে, যারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে দান করে এবং তা মানুষকে দেখানোর জন্য। মানুষের ভালবাসা নেয়ার জন্য। মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর জন্য। মানুষের মাঝে গর্ব অহংকার প্রকাশ করার জন্য। অনেকে দুনিয়ারি স্বার্থ সিদ্ধির জন্যও দান করে থাকে। যেমনÑ চেয়ারম্যান বা এমপি নির্বাচনে জেতার উদ্দেশ্যে দান করে। কিন্তু দান যদি একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয় তা দ্বারা হয়ত দুনিয়াবী কিছু স্বার্থ হাসিল হতে পারে কিন্তু আখেরাতে তার কোন প্রতিদান পাওয়া যাবে না। হাদীসে কুদসীতে নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ তা’আলা বলেন : “আমি শিরককারীদের শিরক থেকে মুক্ত। যে ব্যক্তি কোন ‘আমল করে তাতে আমার সাথে অন্যকে শরীক করবে, তাকে এবং তার শিরকী ‘আমলকে আমি পরিত্যাগ করব।” সহীহ মুসলিম- হা: ৪৬/২৯৮৫।
বরং যারা মানুষের প্রশংসা নেয়ার উদ্দেশ্যে দান করবে, তাদের দ্বারাই জাহান্নামের আগুনকে সর্বপ্রথম প্রজ্জ্বলিত করা হবে।
রাসূল (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তিকে দিয়ে জাহান্নামের আগুনকে প্রজ্জ্বলিত করা হবে। তন্মধ্যে (সর্ব প্রথম বিচার করা হবে) সেই ব্যক্তির, আল্লাহ তা’আলা যাকে প্রশস্ততা দান করেছিলেন, দান করেছিলেন বিভিন্ন ধরনের অর্থ- সম্পদ। তাকে সম্মুখে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর (আল্লাহ তা’আলা) তাকে প্রদত্ত নি’আমত রাজীর পরিচয় করাবেন। সে তা চিনতে পারবে। তখন তিনি প্রশ্ন করবেন, কি কাজ করেছ এই নি’য়ামতসমূহ দ্বারা? সে জবাব দিবে, যে পথে অর্থ ব্যয় করলে আপনি খুশি হবেন এ ধরনের সকল পথে আপনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেছি। তিনি বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এরূপ করেছ এই উদ্দেশ্যে যে, তোমাকে বলা হবে, সে দানবীর। আর তা তো বলাই হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে। তখন তাকে মুখের উপর উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” সহীহ মুসলিম।
আত্মীয়-স্বজনকে দান করা : সালমান ইবনু ‘আমের (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত। নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : “মিসকিনকে দান করলে তা শুধু একটি দান হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু গরীব নিকটাত্মীয়কে দান করলে তাতে দ্বিগুণ সওয়াব হয়। একটি সাদাক্বার; অন্যটি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার।” সুনান আন নাসাঈ, আত তিরমিযী।
দান-সাদাক্বাহ করে খোঁটা দেয়া : “হে ঈমানদারগণ! তোমরা খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান-খায়রাতকে বরবাদ করে দিও না।” সূরা আল বাক্বারাহ ২ : ২৬৪।
আবূ যার (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত। নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন : “কিয়ামত দিবসে আল্রাহ তা’আলা তিন ব্যক্তির সাথে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণা দায়ক শাস্তি। কথাটি তিনি তিনবার বললেন। আবূ যার (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) বললেন, ওরা ধ্বংস হোক, ক্ষতিগ্রস্ত হোক- কারা তারা, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, ‘টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে যে কাপড় পরিধান করে, দান করে যে খোঁটা দেয় এবং মিথ্যা শপথ করে যে ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রয় করে।” সহীহ মুসলিম।
কৃপণের পরিণতি: কৃপণতা একটি নিকৃষ্ট বিষয়। কৃপণতা থেকে মনের মাঝে হিংসা সৃষ্টি হয়। এ কারণে মানুষ লোভী হয়। ফলে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং সম্পদের লোভে যে কোন ধরনের অন্যায় ও অবৈধ কাজে পা বাড়ায়। এজন্য নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বিষয়ে উম্মাতকে সতর্ক করেছেন।
তিনি বলেছেন : “তোমরা কৃপণতা ও লোভ থেকে সাবধান। কেননা পূর্ব যুগে এই কারণে মানুষ রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, মানুষকে খুন করেছে এবং নানা প্রকার পাপাচার ও হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছে।” সুনান আবূ দাউদ, হাকিম।
এজন্য নাবী (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কৃপণতা থেকে মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। তিনি দু’আয় বলতেন, “হে আল্লাহ! তোমার কাছে কৃপণতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি...।” সহীহ মুসলিম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ