ঢাকা, রোববার 2 September 2018, ১৮ ভাদ্র ১৪২৫, ২১ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কুরআন পড় কুরআন পড়াও

ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ : চারিদিকে আবার মুখে মুখে রব উঠেছে কুরআন পড়, কুরআন পড়াও। বিশ্বব্যাপী প্রজ্জলিত আগুনের লেলিহান শিখা নিভাবার আর কোন পথ নেই। সবাই কুরআন ছেড়েছে তাই অশান্তির এই অগ্নিশিখা। অজ্ঞতা, পাপাচার আর ধ্বংসলীলার প্রবাহ দ্রুত ধাবমান চারিদিকে। দিকে দিকে চলছে ধ্বংস, আগুন, হত্যাযজ্ঞ, জ্বিনা, ব্যভিচার, মাদকাসক্ত সহ ছাত্র দ্বারা চরমভাবে কলুসিত সব শিক্ষাঙ্গন, গ্রাম, গঞ্জ, শহর বন্দর। ফলে আকাশ-বাতাস পাহাড় পর্বত, সবই কাঁপছে। ভূমি কম্পে ধ্বসে পড়ছে গণ মানুষের শহর বন্দর। এসব ধ্বংসের মূল নায়ক, মিঃ ইবলিশ তার সিংহাসনে বসে অট্টহাসিতে হাসেন। পাঁচ বছরের শিশুদের ধর্ষণ শেষে গলাটিপে হত্যার দৃশ্য অনবরত ঘটছে। ঘরে ঘরে, স্কুল, কলেজ, বিশ্বদ্যিালয়ে, দেশে, বিদেশে প্রতিদিনই চলে ধর্ষণ, হত্যা, গুম ও মাদকদ্রব্য পানের মহোৎসব। ধর্ষণের সেঞ্চরী চলে বিশ্ববিদ্যালয়েও। নিশাখোর মেয়ে তার পিতাকে পাষণ্ডের মত হত্যা করে উল্লাস করার দৃশ্য বিশ্ব মিডিয়ায় বার বার চাক্ষুষ প্রদর্শিত হচ্ছে। এভাবেই শেষ করছে পিতা, সন্তানকে, মাতা তার কন্যাকে। পুত্র হত্যা করে তাদের মা বাবা, প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধবদের। যেখানে সেখানে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাজা, আফিমসহ হাজারো রকমের নেশাদ্রব্যের নিয়মিত খদ্দের হয়ে যুবসমাজ আজ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌঁচেছে। কুরআন বিরোধী শাসকদের চরিত্রের প্রভাবে এভাবেই পাপাচার বাড়তে বাড়তে চরমে পৌঁছে গিয়েছে অবাধ্য নারী পুরুষ। কুরআন বিরোধী মানুষের তৈরী পূঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ ইত্যাদি মতবাদের মানবতা বিরোধী আঘাতে বিশ্ব মানবতা দ্রুত ধ্বংস প্রাপ্ত। তাগুতী শক্তির প্রভাবে, মরণ ছোবলের এ আঘাতে অগ্রনী মুসলিম দেশের শাসকরাও। মুসলমানের দেশে যখন মানুষের গড়া এ সব মতবাদের শাসন চালানো হয় তখন নাগরিক সাধারণ সুশাসিত না হয়ে শোষিত হয়। শান্তির পরিবর্তে অশান্তি, জুলুম, অত্যাচার আর বৈষম্যের যাতাকলে নিষ্পেষন চলতে থাকে।
ফলে ইহুদী খৃষ্টান বৈদ্বিষ্ট সবাই মিলে মুসলিম নিধনের মহা যুদ্ধে নিমজ্জিত বিশ্বজুড়ে। বার্মায় রোহিঙ্গা নিধন, নারী ধর্ষণ, আগুন দিয়ে বাড়ীঘর জ্বালানো ছাড়াও লক্ষ লক্ষ মুসলিম নাগরিক বিতাড়ন হচ্ছে। তেমনী ভাবে, জেরুসালেম, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, সিরিয়া, কাষ্মির, সোমালিয়া, ইরাক, ইয়ামেনসহ চারিদিকে চলছে ব্যাপকহারে মুসলিম নিধন। মানবতা বিরোধী সব অপকর্ম এভাবেই সর্বত্র বিস্তারিত হয়ে চলছে। চারিদিকে অবাধ্যতার কুফল হিসেবে আপতিত এসব আগুন নিভানোর ঔষধ মাত্র একই। আর তা হলো আল্লাহর ভবে আল্লাহর বিধান আবার বিজয়ী করা। তাই সমস্বরে সবাই শপথ নিবো আল কুরআনের পক্ষে। আবার সমস্বরে বলতে হচ্ছে আল কুরআন যেখানে, আমরা সবাই সেখানে।
তাই সব শিশুকে বল- কুরআন পড়। বড়রা কুরআন পড়। ছেলেরা কুরআন পড়। মেয়েরা কুরআন পড়। সবাই আবার কুরআন ধর। কুরআন পড়। কুরআনের হুকুম মানো। কুরআনের সমাজ গড়। সবার মনের মাঝে আল্লাহকে বসাও। বাঁচতে চাওতো আল্লাহর দেখানো শান্তির পথেই আসো। কুরআনের বিধান চালু কর। শয়তানী সব কারসাজী নির্মূূল কর। এক সাথে চল সবাই কুরআন পড়ি। কুরআনের সমাজ গড়ি, সবাই মিলে কুরআন পড়ি সবার আগে। পরে অন্য কিছু শিখি। কুরআনের পথে দৌড়াও সবাই। দৌড়াও আল্লাহর পথে। অশান্তি দুঃখ আর জুলুমের বিদায়ের জন্য সবাই মন থেকে কুরআনের পথে চল। জ্বালো কুরআনের  আলো ঘরে ঘরে। যারা কুরআন পড়ে না, কুরআন মানে না, তারা বড়ই দুর্ভাগা। দুর্ভোগ সবই তাদের কপালে। হাতে ধরে তাদের ফিরাও। কচি কাঁচা শিশুদের তাই কুরআন পড়াও। কুরআন পড় মসজিদে। কুরআন পড় মাদ্রাসায়। কুরআন পড় স্কুলে, কুরআন পড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। কুরআন পড় অফিসে আদালতে। কুরআন পড় কল কারখানায়। কুরআন পড় যানবাহনে। কুরআন পড় লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা, ট্রেন বা বিমানে। কুরআন পড় দিনে, রাতে, সকাল, সন্ধ্যায় সর্বদা সর্বত্র।
হ্যা তখনই মুক্তি আসবে দুনিয়ায়। মুক্তি আসবে পরকালে, কবরে, হাশরে। জান্নাতের অনরূপ শান্তি আর শান্তি আসবে চারিদিকে। কারণ এই কুরআন যার পক্ষে সাক্ষী দিবে সেই জান্নাতী হবে। অতি সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় সুপাঠ্য, আমাদের এই পাক কুরআন। বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক পঠনীয় এই কুরআন। এই কুরআনের হাফেজ যত বেশী সৃষ্টি হয়েছে অন্য কোন কিতাবের মুখস্তকারী এ পরিমানে নেই। বিশ্বব্যাপী যত বই ছাপানো হয়েছে তার সমষ্টির চেয়েও অনেক বেশী ছাপানো হয়েছে এই কুরআন মজিদ। কুরআন হল বিশ্ববাসীর জন্য মহা উপদেশ মালা। আল কুরআন সত্যের স্মারক। কুরআন সিফা ও রহমত স্বরূপ। আল কুরআন সম্মোহনী শক্তিতে ভরপুর। কুরআন হল ইনসাফের মানদন্ড। কুরআন হল আইনের একমাত্র উৎস। বিশ্ব সমস্যার সমাধানের মহান উদ্দেশ্যে নাজিলকৃত মহা মহিম রবের পাঠানো এই পাক কুরআন। আল্লাহ বলেন, “যদি আমি এই পাক কুরআনকে পাহাড়ের উপর নাজিল করতাম তবে আপনি মুহাম্মাদ (সা.) অবশ্যই ঐ পাহাড়কে আল্লাহর ভয়ে ভীত ও বিগলিত অবস্থায় দেখতে পেতেন। (সূরা হাশর)
আলকুরআন বিশ্ব মানবতার মুক্তি সনদ। আল্লাহর মহা নিয়ামত আর জ্ঞানের মূল উৎস হল আল কুরআন। কুরআন হল সর্বশ্রেষ্ঠ মুজেজা। আল কুরআন এমন এক মহাগ্রন্থ যার কোন একটি আয়াত কেউ কোন দিন বানাতে পারেনি, পারবেও না কোন দিন। বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি নর নারী যারা নামাজ আদায় করে তাদেরকে এই কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করতে হয় প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্তে বার বার।
আল কুরআন পৃথিবীর সেরা সম্পদ। এটা আল্লাহর পবিত্র বিধান। মানুষের রুহ, দেহ, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ জাতি আর পরকাল সবকিছুর জন্যই আল কুরআন মহা নেয়ামত। আল কুরআন সব সমস্যার সমাধান। কুরআনের প্রথম অহি হল- “পড়”, কুরআন পড়া ফরজ। স্বয়ং আল্লাহ কুরআন পড়া ফরজ করে দিয়েছেন। কুরআন হল জ্ঞানের মূল ভান্ডার। কুরআনের কোন বিকল্প নেই। কুরআনের গুরুত্ব তুলে ধরে আল্লাহপাক সূরা ফাতিরের ৩২ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেন- “আমি আমার বান্দাদের মাঝে তাদের সে কিতাবের উত্তরাধিকারী করেছি। যাদের পছন্দ করেছি। আমরা সেই কুরআনের উত্তরাধিকারী মুসলমান আমরা কিভাবে কুরআনের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করতে পারি? বুখারী শরীফের ৫০২৮ নং হাদীসে বর্ণিত রাসুল (স.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, সে কুরআন নিজে শিখে এবং অন্যকে শিখায়। মুসলিম শরীফের ২৪৬৫ নম্বর হাদিসে বর্ণিত।
রাসুল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করবে এবং তা মুখস্থ করবে এবং বিধিবিধানের প্রতি যত্ববান হবে, সে উচ্চ সম্মানিত ফেরেস্তাদের সংগে অবস্থান করবে। আর যে কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কুরআন পড়বে, তার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখবে সে দ্বিগুণ। সওয়াবের অধিকারী হবে। মুসলিম শরীফের ১৬৩১ নম্বর হাদীসে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, “মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সব আমলের ধারবাহিকতা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের ধারাবাহিকতা জারি থাকে। তা হলেঃ
১। সদকায়ে জারিয়া, ২। কোন এলমের মাধ্যম রেখে যাওয়া, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়, ৩। নেক  সন্তান রেখে যাওয়া যে তার জন্য দোয়া করবে। মুসলিম শরীফের ২০৭৪ নম্বর হাদীসে হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যখন লোকেরা কোন ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব কুরআন পাঠ করে, তখন তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হয়। আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফেরেশ্তারা তাদের বেষ্টন করে নেয় এবং স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের মজলিসে তাদের আলোচনা করতে থাকেন।
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত- কেয়ামতের দিন সবচেয়ে বেশী মর্যাদা শীল হবেন কুরআনের পাঠক, সেদিন বলা হবে, পড় যেভাবে দুনিয়ায় পড়তে। তোমার পড়া যেখানে শেষ হবে সেখানেই হবে তোমার স্থান। বুখারী শরীফের ৬৪৬৯ নম্বর হাদীসে বর্ণিত- পৃথিবীতে এমন একটি গ্রন্থ কী খুজে পাওয়া যাবে যে গ্রন্থের একটি শব্দ পড়ালে ১০টি নেকী পাওয়া যায়? অথচ কুরআনের একটি হরফ পড়লে ১টি নেকী হয়। আর ১টি নেকী ১০ নেকীর সমান। আবু দাউদের ৩৬৭৫ নম্বর হাদীসে বর্ণিত যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে ও তদানুযায়ী আমল করে কেয়ামতের দিন তার মা বাবাকে নূরের মুকুট পরানো হবে, তার আলো সূর্যের আলো অপেক্ষা প্রখর হবে।
অন্য হাদীসে এসেছে- তোমরা যাবতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষা করো এবং তা মানুষকে শিক্ষা দাও। তোমরা দ্বীনের বিধিবিধান ও দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করো এবং তা মানুষকে শিক্ষাদান করো। তোমরা কুরআন শিখো এবং তা মানুষকে শিক্ষা দান করো।
কুরআন তেলাওয়াত করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি নাজিল হয়। (মুসলিম শরীফ- ১১৬৭)
রাসুল বলেছেন, তোমাদের প্রতি আমি দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না যতক্ষন পর্যন্ত এ দুটি জিনিস আঁকড়ে ধরে রাখবে। এ দুটি জিনিস হলো আল্লাহর কিতাব (কুরআন)। আর আমার সুন্নাহ (হাদীস)। আবু দাউদ ৪৫৩৩
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কুরআন তোমার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে দলিল। (সহিহ মুসলিম- ৩২৮)
আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি রহমানের জিকির বা কুরআন থেকে বিমুখ হয়ে জীবন যাপন করবে আমরা তার পেছনে নিয়োগ করে দেই একটা শয়তান, সে হয়ে যায় তার সংগী। এই শতয়ানেরাই মানুষকে বাধা দিয়ে রাখে আল্লাহর পথ থেকে। অথচ তারা মনে করে তারা সঠিক পথে আছে। (সূরা আর যুখরুফ ৩৬-৩৭)
যখন কুরআন তেলাওয়াত হয় তখন তোমরা মনোযোগ সহ তা শোনো এবং চুপ থাকো যাতে তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়। (সূরা আরাফ- ২০৪)
রাসুল (সা.) বলেছেন- যেখানে কুরআনের মজলিস বসে সেখানে ফেরেস্তারা বাতাস করতে থাকে এবং সমুদ্রের মাছ তাদের জন্য দোয়া করতে থাকে।
আল্লাহু আকবার। আল্লাহই মহান। মহান প্রভু আল্লাহ এই দুনিয়া জাহানের মালিক। সমস্ত সৃষ্টি কুল তাঁরই সৃষ্টি। আমরা চাই শান্তি। আল্লাহ তাই এই শান্তির জন্যই দিয়েছেন সেরা নবী, সেরা কিতাব। তিনি পাঠিয়েছেন আল কুরআন, এই কুরআন আমাদের সুর। কুরআন আমাদের গান। কুরআন আমাদের সংবিধান। কুরআন আমাদের  পাথেয়। কুরআন আমাদের সব সমস্যার সমাধান। কুরআন আমাদের জান্নাত। তাই পূর্ব পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ সব দিক থেকেই সবাই এক আওয়াজে আসুন আবার এই কুরআনেই ফিরে আসি। আসুন জীবন, মৃত্যু, দুনিয়া, আখেরাত সবকিছুর জন্যই এই কুরআন পড়ি। সবাই মিলে কুরআন পড়ি, কুরআন পড়াই। আসুন আমরা সবাই মিলে পরম শান্তির স্থান জান্নাতে যাই। হে আল্লাহ আমাদের সেই তৌফিকই দাও। আমিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ