ঢাকা, সোমবার 3 September 2018, ১৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২২ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজপথে আন্দোলনের বিকল্প দেখছে না বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : দলের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে আয়োজিত জনসভায় বেগম খালেদা জিয়াসহ রাজবন্দীদের মুক্তি, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার, লেবেল প্লেয়িং ফিল্ডসহ বিভিন্ন দাবিতে তীব্র আন্দোলনের কথাই বললেন সিনিয়র নেতারা। সমাবেশে যোগ দেয়া প্রায় সব নেতাই বলেছেন, এই সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে কোনো লাভ হবেনা। তারা বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম জিয়াসহ রাজবন্দীদের মুক্তি সম্ভব নয়। বক্তারা সবাই বলেছেন, এই সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথই হবে দাবি আদায়র প্রধান উপায়। এ ছাড়া সমাবেশে আসা তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন একই কথা। তারাও বলছেন, ২০১৪ সালের অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে আগামী নির্বাচনের আগে দাবি আদায়ে কঠোর ও তীব্র আন্দোলন করাই একমাত্র পথ। তাদের মতে, কারাবন্দী খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করে নির্বাচনে যাওয়ার একমাত্র উপায় সক্রিয় আন্দোলন, যা ২০১৪ সালের মতো নিষ্ফলা হবে না। এবার হবে ‘ডু অর ডাই’ আন্দোলন।
নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই সমাবেশ হয়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ফকিরের পুল থেকে শুরু করে কাকরাইল পর্যন্ত লম্বা সড়কটি যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ব্যানার হাতে হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থকরা মিছিল মিছিলে সমাবেশ জনসমুদ্রে রূপ নেয়। দুপুর ২টায় শুরু হয়ে জনসভাটি শেষ হয় বিকাল সাড়ে ৫টায়। নেতা-কর্মীরা ‘মুক্তি মুক্তি মুক্তি চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই,’ ‘আমরা নেত্রী, আমার মা, বন্দী থাকতে দেবো না’, ‘খালেদা জিয়াকে বন্দী রেখে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না’, ‘তারেক রহমান বীরের বেশে আসবে ফিরে বাংলাদেশ’ ইত্যাদি শ্লোগান দিতে থাকে। খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে নয়া পল্টনের কার্যালয়ের সামনে তার বিশাল প্রতিকৃতি সম্বলিত কয়েকটি ডিজিটাল ব্যানার টানানো হয়।
আন্দোলনের বিষয়ে বিশাল এ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, আজ আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, সব রাজনৈতিক দল, সংগঠনকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জনগণের দাবি আদায় করতে হবে। অপশাসনকে পরাজিত করতে হবে। জাতিকে মুক্তি দিতে হবে। বিএনপির মহাসচিব বলেন, আমরা সবাইকে আহ্বান জানাব, গণতন্ত্রকামী সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঐক্যবদ্ধ হোন। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন। দেশকে স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত করুন।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মহাসচিব বলেন, আমাদের আজ বুকে সাহস নিয়ে, বুকে বল নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আজকের জনসমুদ্র প্রমাণ করেছে আজ বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বুকের রক্ত দিতে হবে, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে, দেশকে মুক্ত করতে হবে। যারা দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছে, তাদের রক্ত ছুয়ে শপথ নিতে হবে আমরা দেশের গণতন্ত্রকে মুক্ত করব, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করব।
আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ও সমাবেশের প্রধান অতিথি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের নেতা-কর্মীদের কাছে আবেদন, আন্দোলন ছাড়া, দেশনেত্রী মুক্ত হওয়া ছাড়া, মাদার অব ডেমোক্রেসির মুক্তি ছাড়া গণতন্ত্র মুক্ত হবে না এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে না। আন্দোলনের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য আমি প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
গাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভবপর নয়। একমাত্র পথ হচ্ছে রাজপথ। এজন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের নেত্রীকে মুক্ত করে নির্বাচনের দিকে এগুতে হবে। আমাদের আন্দোলন হবে আমাদের নেত্রীর মুক্তির জন্য, সংসদ ভেঙে দেয়ার জন্য, একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে জন্য।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আর অবৈধভাবে জোর করে ক্ষমতায় থাকা যাবে না। আমরা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। যথা সময়ে এই সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নামা হবে। ঢাকা মহানগর দক্ষিনের সভাপতি কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, এভাবে দেশ চলতে পারে না। শেখ হাসিনাকে বলব, জনগণের আওয়াজ কী আপনি শুনতে পারছে না? এই আওয়াজ আপনার পতনের আওয়াজ। এই সরকারের নির্যাতনের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের লুটেরাদের বিরুদ্ধে পাড়ায়-মহল্লায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বানও জানান তিনি।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশে আসা বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, এইভাবে সরকারের বিরুদ্ধে হুমকি ধামকি দিয়ে কোনো লাভ হবেনা। আন্দোলনই একমাত্র সমাধান। চকবাজার থানা কমিটির নেতা কুতুব উদ্দিন বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। তবে এটা ঠিক আন্দোলনের বাইরে সরকার কোনও দাবিই মানবে না। এক্ষেত্রে আরও সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই নেতা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, হাইকমান্ড যা-ই বলুক, আমরা তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের মাধ্যমেই লক্ষ্যে পৌঁছাবো।
মোহাম্মদপুর থানা কমিটির সদস্য মাহবুব মিয়া বলেন,আন্দোলন ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি অসম্ভব। এমনকি অন্যান্য দাবিও আদায় করা যাবেনা। আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে বলে মত দেন রেলওয়ে কলোনি ইউনিয়ন সেক্রেটারি গোলাম মাওলা। সমাবেশে যোগ দেওয়া মানুষের সংখ্যা লাখের ওপরে, এমন তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, এত মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে বিএনপির জনপ্রিয়তা কতটা! আর এই উপস্থিতি রাজপথে লাগবে। গোলাম মাওলা বলেন, আমাদের চিন্তা ম্যাডামকে মুক্ত করে সরকারকে সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধ্য করতে হবে।
সমাবেশস্থলে কথা হয় তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী ছাত্রদলকর্মী মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আজকে (শনিবার) সমাবেশে নেতাদের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে, বেগম জিয়াকে ছাড়া কোনও নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। আমরাও চাই, সেই হিসেবেই চলবে দল। তবে আন্দোলনেই হবে সব সমাধান সেটি পরিস্কার।
পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার সাবেক ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক জহির হোসেন বলেন, তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন করতে হবে। কারণ, তখন প্রশাসন কিছুটা নমনীয় থাকবে। বরগুনা জেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। এরপর নির্বাচন নিয়ে চিন্তা করতে হবে। চলমান আন্দোলন দিয়ে তাকে মুক্ত করা যাবে না।
রাজধানীর বাইরে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকেও আন্দোলনের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার দুপুরে রাজশাহীতে এক আলোচনা সভায় বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, চলতি মাসেই কঠোর আন্দোলন আসছে। এ আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পালনোর পথ পাবে না। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। আন্দোলনে মাঠে থেকে একতাবদ্ধভাবে দাবি আদায়ের সংগ্রাম করার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়ে মিনু বলেন, এই প্রথম বাংলাদেশের তিন বারের সফল প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে। বেগম জিয়াকে মিথ্যা সাজানো মামলায় সাজা দিয়ে নির্জন কারাগারে রাখা হয়েছে। তাঁর মুক্তি ও নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে চলতি মাসেই কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ