ঢাকা, সোমবার 3 September 2018, ১৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২২ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মহামূল্যবান প্রত্ন সম্পদ পাচারে আন্তর্জাতিক চক্র সক্রিয় !

কামাল উদ্দিন সুমন : বরগুনা সদরের ছোট গৌরিচন্না গ্রামের আব্দুস সাত্তার চৌদ্দারের ছেলে তারিকুল ইসলাম লিটন (৪০)। কাজের সন্ধানে ২০ বছর বয়সে বরগুনা  জেলা থেকে ঢাকা আসে। গুলশান-২ নম্বরে ডিসিসি মার্কেটে একটি এন্টিক শপে কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করে। ৮ বছর  কাজ করার পর একই মার্কেটে নিজেই ‘কাঁসা সেন্টার’ নামে একটি অ্যান্টিক হ্যান্ডিক্রাফটের  দোকান খুলে বসে। নিজের এই এন্টিক শপের আড়ালে দেশের মহামূলবান প্রত্নম্পদ পাচারের ব্যবসার সাথে সে জড়িয়ে পড়ে।
 গত  ২৭ আগস্ট রাত ৯টার দিকে রাজধানীর ভাটারা থানার নর্দ্দার শহীদ আব্দুল আজীজ সড়কের একটি বাসা (নম্বর ক-২৭) থেকে বিপুল পরিমাণ প্রত্নসম্পদ উদ্ধারসহ লিটনের ভাই মনিরুলকে (৩৬) গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি)। প্রত্নসম্পদের মধ্যে রয়েছে ১০টি বিভিন্ন ধরনের কষ্টি ও বেলে পাথরের মূর্তি, ১৮টি বিভিন্ন ধরনের ধাতব মুদ্রা, একটি প্রাচীন তা¤্রলিপি এবং কয়েকটি বিভিন্ন ধরনের অতি প্রাচীন স্মারক। মনিরুলের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে তার ভাই লিটনের প্রত্ম সম্পদ পাচারের খবর।
শুধু লিটন নয়, দেশের মহামূল্যবান প্রত্ন সম্পদ পাচারের সাথে আন্তজার্তিক চোরাচালান চক্রের যোগসাজশ পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। দীর্ঘদিন ধরে এ চক্রের সদস্যরা প্রত্ন  সম্পদ পাচার করে আসছে। দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে তারা মূল্যবান প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ করে গোপনে পাচার করছে বিদেশে।
প্রত্নসম্পদ উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্বদানকারী  ডিবির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ বশির উদ্দিন জানিয়েছেন, চক্রটি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রত্নসম্পদ সংগ্রহের পর তা ঢাকায় সংরক্ষণ করে। পরে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের সদস্যরা ঢাকায় এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এসব প্রত্নসম্পদের মূল্য নির্ধারণ করেন। সেখান থেকে অতি মূল্যবান এসব প্রত্ননিদর্শন চলে যায় বিদেশে।
২৭ আগস্ট প্রত্নসম্পদের চালানটি ধরা পড়ার দুদিন পর ৩০ আগস্ট রাজধানী থেকে পাচারের আগে প্রত্নসম্পদের আরেকটি চালান জব্দ করেছে র্যা ব। চালানটিতে উদ্ধার হয় কষ্টিপাথরের মূর্তি। এছাড়াও গত জুনের মাঝামাঝি সদরঘাট থেকে আরেকটি কষ্টিপাথরের মূর্তি পাচারকালে উদ্ধার করেন পুলিশ।
‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোং ১৮০৮’ লেখা কষ্টিপাথরের মূর্তিটি পাচারকালে গ্রেফতার হন বুয়েট থেকে পাস করা শাহেদুর রহমান বাবলা নামের এক প্রকৌশলী। তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় পুরাকীর্তি আইনে একটি মামলাও হয়েছে। যদিও মাত্র ১৮ দিন কারাবাসের পর জামিনে মুক্তি পান শাহেদুর রহমান বাবলা।
শাহেদুর রহমান বাবলার কাছ থেকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে এসআই এনামুল হক জানান, কষ্টিপাথরের মূর্তিটি বরগুনার এক কৃষক মাটি কাটার সময় উদ্ধার করেন। পরে এটি ৫০ লাখ টাকা চুক্তিতে কিনে আনেন তিনি। জামান নামের এক ব্যক্তির কাছে প্রত্নসম্পদটি ১ কোটি টাকায় বিক্রি করতে চুক্তিবদ্ধও হন। সেই চুক্তি মোতাবেক তিনি কষ্টিপাথরের মূর্তিটি ঢাকায় নিয়ে আসেন।
র্যা বের পরিসংখ্যান বলছে, গত এক যুগে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে ৩০৪টি অভিযান পরিচালনা করেছে র্যা ব। এসব অভিযানে পাচারের সময় উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ২৯৭টি প্রত্ননিদর্শন। এর মধ্যে  বিভিন্ন ধরনের ৪৮৬টি মূর্তি ও ৮১১টি মূর্তির ভগ্নাংশ। পরে উদ্ধার হওয়া প্রত্নসম্পদগুলো সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে জমা দেয় র্যা ব। পাচারের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২১৮টি। গ্রেফতার হয়েছেন ৪৪০ জন।
র্যা বের গোয়েন্দা শাখার তথ্য বলছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশকিছু মূল্যবান প্রত্নসম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদ চুরি করার জন্য বেশ সক্রিয় কিছু দেশী-বিদেশী চক্র। চক্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে পরস্পর যোগসাজশে কষ্টিপাথরের তৈরি মূর্তি ও মূল্যবান দ্রব্য অবৈধভাবে পাচার করে আসছে। তবে এর মধ্যে কিছু চক্র আছে, যারা পুরনো কয়েন থেকে শুরু করে নানা ধরনের সামগ্রী অধিক মূল্যে বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে অনেকের সঙ্গে প্রতারণা করে থাকে। তাদের বিরুদ্ধেও নজরদারি রয়েছে র্যা বের গোয়েন্দা শাখার।
সূত্র জানায়, চুরি হওয়া প্রত্নসম্পদের অধিকাংশই বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বিদেশে পাচার হয়ে থাকে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পাচারকালে অন্তত সাতটি প্রত্নসম্পদ উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রত্নসম্পদের সবচেয়ে বড় চালানটি উদ্ধারের পর তা পরিদর্শনে যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও ঐতিহ্য অন্বেষণের নির্বাহী পরিচালক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নগ্রামের পাশাপাশি বিক্রমপুরের বেশকিছু স্থানে প্রায় ১৬ বছর ধরে জরিপ, অনুসন্ধান, খনন ও গবেষণাকর্মের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি।
ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গোয়েন্দা পুলিশের উদ্ধার করা প্রত্ননিদর্শনগুলো শতভাগ আসল। এগুলো মহামূল্যবান। বাংলাদেশ অনেক সমৃদ্ধ একটা দেশ। এখানে বিভিন্ন জনপদে মূল্যবান অনেক প্রত্নসম্পদ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। দেশী কিছু রাঘববোয়ালের সহায়তায় আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যরা এসব প্রত্নসম্পদ পাচার করছে। এসব অতিমূল্যবান প্রত্নসম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো শক্ত ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব মো. আলতাফ হোসেন বলেন, আমাদের নিজস্ব কোনো ইন্টেলিজেন্স নেই। যদি এনবিআর, দুদকসহ অন্যান্য সংস্থার মতো আমাদেরও নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স টিম থাকত, সেক্ষেত্রে আমরা প্রত্নসম্পদ রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি করতে পারতাম। এখন আমরা কেবল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রত্নসম্পদগুলো যথাযথ নিয়মে সংরক্ষণের কাজটি করে থাকি। পাশাপাশি যদি কখনো প্রত্ননিদর্শন পাচারের কোনো তথ্য পাই, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ