ঢাকা, সোমবার 3 September 2018, ১৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২২ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হঠাৎ ইভিএম বিতর্ক

আশিকুল হামিদ : পরবর্তী তথা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের প্রশ্নে এরই মধ্যে সুচিন্তিতভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছে নির্বাচন কমিশন। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে অন্য কিছু বিশেষ তথ্যের উল্লেখ করা দরকার। প্রথমত নির্বাচনের তারিখ কিন্তু এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তবে শোনা যাচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের কোনো এক তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কোনো কোনো মহল থেকে ২৭ ডিসেম্বরের কথাও বলা হচ্ছে। যে তারিখেই হোক না কেন, ‘সংবিধানের নির্দেশনা’ অনুসারে নির্বাচন ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই অনুষ্ঠান করতে হবে।
ওদিকে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রাধান্যে এসেছে নির্বাচনকালীন সরকার। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেতু ও সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মাস দেড়েক আগেই জানিয়ে রেখেছেন, ছোট আকারের নির্বাচনকালীন সরকার তারাই গঠন করবেন। সে সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদেও শেখ হাসিনাই বহাল থাকবেন। এটাও যে ‘সংবিধানেরই নির্দেশনা’- সে কথাটাও স্মরণ করিয়ে দিতে ভুল হয়নি মিস্টার ওবায়দুল কাদেরের। সর্বশেষ একাধিক উপলক্ষে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে আবার জানানো হয়েছে, ছোট আকারের নির্বাচনকালীন সরকারে দেশের ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত দল বিএনপিকে সুযোগ দেয়া হবে না। কারণ, বর্তমান ‘নির্বাচিত’ সংসদে বিএনপির কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। অর্থাৎ এমন সব দলের লোকজনকে নিয়েই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে, বর্তমান সংসদে যেসব দলের এমপি রয়েছেন।
সাধারণভাবে শুনতে মন্দ না হলেও বিষয়টি কিন্তু মোটেও সাধারণ নয়। কারণ, যে সংবিধানের দোহাই দেয়া হচ্ছে, সে সংবিধানকে অনেক আগেই যথেচ্ছভাবে সংশোধন করে রেখেছেন ক্ষমতাসীনরা। সুতরাং ধরেই নেয়া যায়, কথিত নির্বাচনকালীন সরকারও তারা নিজেদের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুসারেই গঠন করতে পারবেন। অন্যদিকে দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে তেমন কোনো সরকার কিন্তু মোটেও গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, সংশোধনপূর্ব তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রশ্নে ছাড় দিলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ‘নিরপেক্ষ’ সরকারের দাবি জানিয়ে রেখেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নয়া পল্টনে অনুষ্ঠিত স্মরণকালের বিশাল জনসভায় দাবিটির পুনরাবৃত্তি করার পাশাপাশি আরো কয়েকটি দাবি যুক্ত করেছে বিএনপি। বেগম খালেদা জিয়ার শর্তহীন মুক্তি, তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারের পদত্যাগ ও সংসদ ভেঙে দেয়া, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি অর্থাৎ নির্বাচনের সময় সব দলের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে সশস্ত্র বাহিনীকে নিযুক্ত করা এবং বর্তমান ‘অথর্ব’ ও ‘সেবাদাস’ নির্বাচন কমিশনকে ভেঙে নতুন কমিশন গঠন করা রয়েছে দাবিগুলোর মধ্যে।
লাখ লাখ মানুষের ওই সমাবেশ থেকে বিএনপি জানিয়ে দিয়েছে, দলটির দাবি পূরণ না করা হলে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। অর্থাৎ বিএনপি কোনো নির্বাচন হতে দেবে না। দলটি বরং প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টাকে প্রতিহত করবে। বিএনপির নেতারা অবশ্য নিজেদের কথা বলেননি। বলেছেন, জনগণ প্রতিহত করবে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনায় বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়েছে। কারণ, বেগম খালেদা জিয়ার মতো তিন-তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দন্ডিত করার এবং কারাগারে ঢোকানোর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা যা কিছুই বোঝাতে চান না কেন, বিএনপিই যে এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় দলের অবস্থানে রয়েছে সেকথার প্রমাণ পাওয়া গেছে ১ সেপ্টেম্বরের বিশাল জনসমাবেশেও। সুতরাং বিএনপিকে এক পাশে ঠেলে রাখা এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরো একটি একতরফা নির্বাচন করার চিন্তা অবশ্যই কাজে আসবে না। বিএনপির দাবিগুলোর ব্যাপারে আগে ফয়সালা করতে হবে। না হলে সংসদ নির্বাচন নিয়েই সংশয়ের সুষ্টি হবে।
এদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়লেও নির্বাচন কমিশন কিন্তু ‘খেল’ যথেষ্টই দেখিয়ে চলেছে। তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন ও সংসদ ভেঙে দেয়ার মতো বিষয়গুলো যখন প্রাধান্যে থাকার কথা, কমিশন তখন সব কাজ ফেলে সংসদ নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারের ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কমিশনকে বেশি ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে প্রায় দেড় লাখ ইভিএম কেনার তৎপরতায়। এখানে আবার নাকি টাকার খেলা তথা ‘হরিলুটের’ ব্যাপার-স্যাপার রয়েছে! এমন ভাবনার কারণ, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের খবরে জানানো হয়েছে, মৌলিক ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতে প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার আগেই কমিশন তিন হাজার ৮২৯ কোটি টাকায় ব্যয়ে প্রায় দেড় লাখ ইভিএম কেনার কার্যক্রমে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
প্রায় দেড় লাখই কেন- তার কারণ জানাতে গিয়ে কমিশন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের হিসাবে তিনশ সংসদীয় আসনে সম্ভাব্য ভোটকক্ষ হতে পারে দুই লাখ ২০ হাজারটি। সে হিসাবে নির্বাচনের সময় প্রতি কেন্দ্রে একটি করে বাড়তি মেশিনসহ দুই লাখ ৬৪ হাজারটি ইভিএম-এর দরকার পড়বে। আর যদি অর্ধেক সংখ্যক আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয় তাহলে দরকার পড়বে এক লাখ ৩২ হাজার মেশিনের। এই হিসাবের ভিত্তিতেই প্রাথমিকভাবে দেড় লাখ মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। তাই বলে সিদ্ধান্তটি কিন্তু সর্বসম্মতভাবে নেযা সম্ভব হয়নি। গত ২৯ আগস্ট কমিশনের এ সংক্রান্ত সভায় আপত্তি ও ভিন্নমত জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তিনি এমনকি সভাও বর্জন করে বেরিয়ে এসেছেন। মিস্টার মাহবুব তালুকদারের এই বর্জন নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জমে উঠেছে। অনেকে একে একটি সাজানো নাটকের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, নির্বাচনকালীন সরকার এবং সংসদ ভেঙে দেয়ার মতো জরুরি বিষয়গুলো থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়াই যার উদ্দেশ্য।
একজন মাননীয় নির্বাচন কমিশনার ভিন্নমত পোষণ করে সভা বর্জন করলেও নির্বাচন কমিশন কিন্তু তার সিদ্ধান্ত বজায় রেখেছে। সংখ্যায় কিছুটা কমবেশি হলেও ইভিএম কমিশন আমদানি করবেই। কারণ, ‘হরিলুটের’ পাশাপাশি কমিশন বাণিজ্যের ব্যাপার-স্যাপারও তো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়! জানা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রবল বিরোধিতার মুখে কমিশন ১৫০ আসনের পরিবর্তে ১০০ আসনে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহার করার চিন্তা-ভাবনা করছে। সে অনুপাতে সংখ্যার দিক থেকে ইভিএম আমদানিও কমে আসতে পারে। দেড় লাখের স্থলে সংখ্যা হতে পারে এক লাখ বা তার কিছু কম বা বেশি।
কিন্তু ইভিএম কমিশন আমদানি করবেই! এ উদ্দেশ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও সংশোধন করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কারণ, বিদ্যমান আরপিও অনুযায়ী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার সুযোগ নেই। ইভএম কেনার এবং ভোটকেন্দ্রে ব্যবহার করার আগে আরপিও অবশ্যই সংশোধন করতে হবে। কিন্তু বিষয়টি তাই বলে মোটেই সহজ নয়। কারণ, এ বিষয়ে সংশোধনের জন্য প্রথমে কমিশনকে একটি খসড়া প্রস্তুত করতে হবে। কমিশনের ভেতরে পাস বা গৃহীত হলে খসড়াটিকে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। এ ধরনের বিষয়ে মন্ত্রণালয় সাধারণত কিছু না কিছু যোগ-বিয়োগ করার জন্য খসড়া ফেরৎ পাঠিয়ে থাকে।
ফেরৎ পাঠালে মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুসারে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং পরিমার্জনা করতে হবে। তারপর সেটাকে আবারও পাঠাতে হবে আইন মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় যদি আর কোনো পরিমার্জনা না করে তাহলে আরপিওর খসড়াটিকে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করতে হবে। এতে যে কোনো সংশোধনী আনার এবং পরিমার্জনা করার প্রশ্নাতীত অধিকার রয়েছে মন্ত্রিসভার। তেমন কিছু করলে আবারও সেটা আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে ফেরৎ আসবে। আর ফেরৎ যদি না আসে তাহলে খসড়াটিকে আইন হিসেবে অনুমোদনের জন্য জাতীয় সংসদে পেশ করতে হবে। সংসদে পাস হলেই কেবল সংশোধিত আরপিওর ভিত্তিতে ইভিএম-এর ব্যবহারসহ কমিশনের পক্ষে পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।
বলাবাহুল্য, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য বেশ কয়েক মাসের, এমনকি বছরেরও বেশি সময় দরকার হওয়ার কথা। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এখনও শূন্যের ঘরেই রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ইভিএম-এর ব্যবহার প্রসঙ্গেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক ও বিরোধিতা রয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার জোটের সঙ্গীরা ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে থাকলেও দেশের জনপ্রিয় প্রধান দল বিএনপিসহ অধিকাংশ দলের পক্ষ থেকেই অন্তত আগামী নির্বাচনে ইভিএম-এর ব্যবহার করার কঠোর বিরোধিতা করা হয়েছে। বিএনপি আশংকা প্রকাশ করে বলেছে, এতদিন দলীয় লোকজন এবং গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের দিয়ে জাল ভোট দেয়ার মাধ্যমে জিতে আসার ফলে বিষয়টি এখন বিশ্ববাসীর সামনেও প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এজন্যই নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ক্ষমতাসীনরা যান্ত্রিক জালিয়াতির ফন্দি এঁটেছেন। সে লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রও শুরু হয়ে গেছে। একই কারণে হঠাৎ করে কমিশন ইভিএম-এর জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার অংকে টাকা ব্যয় করে ইভিএম কেনার প্রক্রিয়ায় নিয়ম মানা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে কি না, নাকি সুচিন্তিত তাড়াহুড়োর মাধ্যমে আরো একটি বড় ধরনের ‘হরিলুট’ ও কমিশন বাণিজ্যের আয়োজন করা হচ্ছে- ঘটনাপ্রবাহে এ ধরনের প্রশ্ন যেমন উঠেছে, তেমনি দেখা দিয়েছে অনেক সন্দেহ ও সংশয়ও। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, গত বছরের জুলাই মাসে একাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নানামুখী পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছিল। তখনও ইভিএম-এর ব্যবহার প্রসঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই জানানো হয়নি। কমিশন অবশ্য স্বীকার করেছিল যে, ইভিএম ব্যবহারের জন্য তাদের কারিগরি সামর্থ্যসহ যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই। এসবের জন্য সময়, লোকবল এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
লক্ষ্যণীয় যে, সে একই নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি হঠাৎ করেই ইভিএম-এর ব্যাপারে জোর তৎপরতা শুরু করেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি তথ্যাভিজ্ঞরাও কারিগরি সামর্থ্য, যথেষ্ট সংখ্যক জনবল এবং প্রশিক্ষণ ছাড়া সংসদ নির্বাচনে এখনই ইভিএম-এর ব্যবহার করা উচিত হবে না বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, কমিশন এমন এক মেশিনের জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে, যে ইভিএম বিশ্বের ৯০ শতাংশেরও বেশি দেশে এরই মধ্যে বাতিল ঘোষিত হয়েছে। কোনো কোনো দেশের সর্বোচ্চ আদালত এমনকি একে সংবিধান বিরোধী বলেও রায় দিয়েছে। বড় কথা, ইভিএম-এর ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন এমন এক সময়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে, যখন নির্বাচনের বাকি রয়েছে চার মাসেরও কম সময়। এজন্যই বলা হচ্ছে, কমিশনের উচিত এবারের মতো প্রচলিত নিয়মে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। পরবর্তীকালে যথেষ্ট প্রস্তুতি ও সময় নিয়ে ইভিএম সম্পর্কে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ