ঢাকা, সোমবার 3 September 2018, ১৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২২ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মার্কিন-তুরস্ক উত্তেজনার শেষ কোথায়?

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : তুর্কি-মার্কিন সম্পর্ক এখন তলানীতে এসে ঠেকেছে। যদিও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় উভয় দেশের সম্পর্কটা বেশ উষ্ম পর্যায়েরই ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর পরিস্থিতির ক্রম অবনতি শুরু হয়েছে। মূলত দু’ন্যাটো মিত্রের মধ্যে সন্দেহ-সংশয়টা দানা বেঁধে উঠেছিল ২০১৬ সালে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে। আঙ্কারা এই ঘটনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনকে সন্দেহ করে আসছে। তুর্কি কর্তৃপক্ষ গুলেনকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য তাকে ফেরৎ পাঠানোর জন্য মার্কিন প্রশাসনকে অনুরোধ জানায়। কিন্তু ওয়াশিংটন আঙ্কারার সে অনুরোধ রক্ষা করেনি। ফলে উভয় দেশের মধ্যে কুটনৈতিক টানাপড়েনটা শুরু হয় তখন থেকেই। ক্রমেই তা মনোস্তাত্বিক লড়াইয়ে রূপ নেই। সর্বসাম্প্রতিক উত্তেজনা তার ধারাবাহিকতা মাত্র।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কেও সম্পর্কের অবনতির আরও একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন কুটনৈতিক মহল। সর্বশেষ যে উভয় দেশের মধ্যে টানটান উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে তার কেন্দ্রে রয়েছে এই চার্চটি। সেই চার্চে কর্মরত আমেরিকান যাজক অ্যান্ড্রু ব্রনসনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে সহযোগিতা করার অভিযোগ এনেছে আঙ্কারা। দুই বছর আগ পর্যন্ত অ্যান্ড্রু ব্রনসন শান্তিতে ও স্বাচ্ছন্দেই চার্চে কাজ করতেন। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১০ সাল থেকে এখানে তৈরি করা ছোট্ট ধর্মসভা পরিচালনা করতেন ব্রনসন। স্থানীয় জনসাধারণ তাকে একজন ধর্ম যাজক হিসেবেই বিবেচনা করেছে। তাই কাজকর্মে কোন বাধা-প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি।
মূলত উত্তর ক্যারোলিনা থেকে আসা ব্রনসন স্ত্রী নোরিনকে নিয়ে তুরস্কে আসেন ১৯৯৩ সালে। এখানেই তারা তাদের তিন সন্তানকে বড় করেছেন। কিন্তু তাদের সে স্বাচ্ছন্দ আর বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ২০১৬ সালের ৭ অক্টোবর স্থানীয় থানায় এই দম্পতিকে ডেকে পাঠানো হয়। তারা স্বেচ্ছায় সেখানে যান। কিন্তু তাদের আর ফেরার সুযোগ দেয়া হয়নি বরং সরকারি হেফাজতে নেয়া হয়। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় তখন থেকেই। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০১৬ সালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পর যে ৫০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। ব্রনসন দম্পতি গ্রেফতারের বিষয়টি তার ধারাবাহিকতা মাত্র।
কয়েকদিন পর নোরিন ব্রনসনকে মুক্তি দেয়া হয়। তবে ডিসেম্বর মাসে যাজক ব্রনসনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে তুরস্ক তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।
আঙ্কারার অভিযোগ, ব্রনসনের সঙ্গে দুটি গ্রুপের যোগাযোগ রয়েছে, যাদের সন্ত্রাসী বলে মনে করে তুরস্ক। সে অভিযোগেই এই মার্কিন যাজক গেস্খফতার ও  বিচার কার্যক্রম চলছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার ৩৫ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড হতে পারে। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ হলো তিনি কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টিকে (পিকেকে) সাহায্য করছেন। এই দলের নেতা ফেতুল্লাহ গুলেন-ব্যর্থ ওই অভ্যুত্থান চেষ্টার জন্য যাকে দায়ি করছে তুরস্ক। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত গুলেন অভ্যুত্থান চেষ্টার সঙ্গে কোন রকম জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে তুরস্কে ফেরত পাঠানোর দাবি করছে আঙ্কারা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদের সে দাবি এখনও পুরণ করেনি।
একজন ধর্মযাজকের বিচার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমীরা খুব ভাল চোখে দেখেনি। এমনকি ব্রনসনের স্বজন ও বন্ধুরা অভিযোগ করছেন, কূটনৈতিক দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে এই ধর্মযাজককে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে তুরস্ক। তার গ্রেপ্তার তাকে আরো মহান করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসবাইটেরিয়ান সম্প্রদায়ের লোকজন তার জন্য প্রার্থনা করছে, এমনকি তার জন্য উপবাসও করছেন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্টসহ পশ্চিমী বিশ্বের সমালোচনার মুখে তুরস্ক তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আদালতের কার্যক্রম চলছে বলেও দাবি করছে আঙ্কারা কর্তৃপক্ষ।
মূলত বর্তমান সংকটের শুরু হয় গত ১৮ জুলাই থেকে, যখন শুনানির পর তুরস্কের একটি আদালত মার্কিন ধর্ম যাজক ব্রনসনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিকে তাদের জন্য ‘অসম্মান’ বলে আখ্যা দেন এবং তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের প্রতি আহবান জানান। যদিও স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে গত ২৫ জুলাই ব্রনসনকে কারাবন্দীর বদলে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবির মুখে ব্রনসনকে মুক্তি না দেয়ায় সর্বশেষ গত ১ আগস্ট তুরস্কের বিচার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে হোয়াইট হাউজ। যা উভয় দেশের কুটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বিষয়টি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর কুটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে। আর তারই ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্ক থেকে আমদানি করা স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করা হবে  বলে ঘোষণা দেন। ট্রাম্প টুইট বার্তায় বলেন, ‘তুরস্কের সঙ্গে এই মুহূর্তে আমাদের সম্পর্ক ততটা ভালো নেই।’ সম্প্রতি মার্কিন নেতারা একটি প্রতিরক্ষা বিলে স্বাক্ষর করেছেন, যার ফলে একশোটি এফ-৩৫ ফাইটার জেট বিমান এই ন্যাটো সহযোগী দেশটির কাছে হস্তান্তর বিলম্বিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই বিতন্ডতা এখন পুরোমাত্রার একটি কূটনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। পরিণতি কোন দিকে মোড় নেয় তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এর আগে ১৯৭৪ এবং ১৯৭৮ সালে তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, যখন ১৯৭৪ সালে তুরস্ক সাইপ্রাসে অভিযান চালায়। সাম্প্রতিক এই নিষেধাজ্ঞার পর তুরস্কের লিরার মূল্যমান ২০ শতাংশ পড়ে গেছে। বিনিনিয়োগকারীরা বিক্রি বাড়িয়ে দেয়ায় আরো কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রার মানও কমেছে। যা তুর্কি অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু তুর্কি কর্তৃপক্ষ তা সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাথে তুরস্কের সাম্প্রতিক টানাপড়েনে আঙ্কারাও নির্লিপ্ত থাকেনি বরং পাল্টা জবাব হিসেবে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের ইলেকট্রনিক পণ্য বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। যা দেশ দু’টির সম্পর্ককে আরও অবনতিশীল করে তুলেছে। আমেরিকান সরবরাহকারীদের সাথে ব্যবসাকারী কোম্পানিগুলোকে বিকল্প খোঁজার জন্যও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান এক ঘোষণায় বলেন ‘আমি আমার জাতিকে আহবান জানাচ্ছি, বিশেষ করে আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে; এখন আমাদের সবচেয়ে ভালো জবাব হবে চালকের আসনে শক্তভাবে বসা। আমরা আরো বেশি উৎপাদন করব, আরো বেশি রপ্তানি করব,’। এতে সাম্প্রতিক অচলাবস্থায় দেশটির দৃঢ় অবস্থানের বিষয়টিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর টার্কিশ এয়ারলাইন্স এবং টার্ক টেলিকমের মতো বড় ব্যবসায়িক কোম্পানিগুলো ঘোষণা দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কোনো মিডিয়ায় আর বিজ্ঞাপন দেবে না। যখন দুই ন্যাটো সহযোগী দেশের মধ্যে সম্পর্ক খারাপের দিকে যাচ্ছে, তখন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় বৈঠকের জন্য এসেছেন। যা চলমান সংকটকে নতুন মাত্র দিয়েছে বলেই মনে হচেছ। যুক্তরাষ্ট্রকে এক হাত দেখে নেয়ার সুযোগের ব্যবহার করছেন ল্যাভরভ বলে মনে করছেন কুটনৈতিক মহল। রাশিয়া এবং তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা ‘অবৈধ’ এবং ‘বিশ্ব বাণিজ্যে অন্যায় সুবিধা নিতে’ ওয়াশিংটন এসব করছে বলে তাদের দাবি। তুরস্ক আর যুক্তরাষ্ট্রের এই তিক্ত কূটনৈতিক বৈরিতার কোনো সমাধানের আলো দেখা যাচ্ছে না এবং একই সাথে তুরস্কে ব্রনসনের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তা এষনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
কারণ, পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এবার বেশ কয়েকটি মার্কিন পণ্যে দ্বিগুণ শুল্কারোপ করেছে তুরস্ক। এর মধ্যে রয়েছে যাত্রীবাহী গাড়ি, অ্যালকোহল ও তামাক। তুরস্কের অর্থনীতিতে মার্কিন হামলার জবাবে এ শুল্ক বসানো হয়েছে বলে দেশটির পক্ষে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন যাজককে সন্ত্রাসবাদ মামলায় বিচার ও বিভিন্ন কূটনৈতিক কারণে দুই ন্যাটো মিত্রের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। সম্প্রতি তুরস্ক থেকে আমদানি করা অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের ওপর দ্বিগুণ শুল্কারোপের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জবাবে পাল্টা শুল্কারোপ করে গেজেট প্রকাশ করেছে তুরস্ক। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সই করা ওই গেজেটে বলা হয়েছে, মার্কিন যাত্রীবাহী গাড়িতে ১২০ শতাংশ, অ্যালকোহলে ১৪০ ও তামাক পাতায় ৬০ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রসাধনী, চাল ও কয়লার মতো পণ্যে দ্বিগুণ শুল্ক বসিয়েছে তুরস্ক।
এই কুটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে ওয়াশিংটন যদি ‘একলা চলার এবং সম্মান না দেখানোর’ পথ ত্যাগ না করে তাহলে তার দেশ নতুন বন্ধু ও মিত্র খুঁজে নেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি তুরস্কের ইস্পাত ও এ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর দ্বিগুণ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর এ মন্তব্য করেন মি. এরদোগান। ফলে লড়াইটা যে সেয়ানে-সেয়ানে শুরু হয়েছে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। একথা সত্য যে, চলমান সংকটে তুর্কি অর্থনীতিতে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শুল্ক বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তের পর থেকে ডলারের বিপরীতে তুর্কি মুদ্রা লিরার ১৮ শতাংশ দরপতন হয়েছে। তুরস্ক একটি অর্থনৈতিক সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। কিন্তু তুর্কি প্রেসিডেন্ট তার অবস্থানে অটল রয়েছেন। তিনি তার অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন,  যুক্তরাষ্ট্রকে তুরস্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। “ওদের যদি ডলার থাকে - তাহলে আমাদের আছে আমাদের জনগণ, আমাদের অধিকার এবং আমাদের আছেন আল্লাহ”  আঙ্ককারায় এক ভাষণে বলেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান।
মূলত সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কুর্দি যোদ্ধাদের অস্ত্র দেয়ার অভিযোগ রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ফলে আঙ্কারা দেশটির ওপর অনেক আগে থেকেই ক্ষুব্ধ। তা ছাড়া নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনকেও তারা বিচারের জন্য তুরস্কের হাতে তুলে দিচ্ছে না। এ ছাড়া আঙ্কারা যে রাশিয়ার কাছ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা কেনার পরিকল্পনা করছে - সেটাও একটা বড় কারণ। আঙ্কারার অভিযোগ, ফেতুল্লাহ গুলেন পেনসিলভানিয়ায় তার বাড়িতে বসে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের বিরুদ্ধে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের কলকাঠি নেড়েছিলেন। তুর্কি প্রেসিডেন্টের ভাষায়, সন্ত্রাসের অভিযোগে তুরস্কে বিচারাধীন মার্কিন ধর্মযাজক এ্যান্ডু ব্রানসনের ব্যাপারে বিচারের প্রক্রিয়া শেষ হবার অপেক্ষা না করেই ওয়াশিংটন পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে। মি. ব্রানসনের বিরুদ্ধে তুরস্কের অভিযোগ তার সাথে কুর্দি ওয়ার্কার্স পার্টি এবং ফেতুল্লাহ গুলেনের সম্পর্ক আছে। আমেরিকার শক্তিশালী ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান লবি এ নিয়ে হৈচৈ শুরু করার পর এর জবাবে তুর্কী স্বরাষ্ট্র এবং বিচারমন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। তুরস্কের মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কিছুদিন পরেই ট্রাম্প এই শুল্ক বৃদ্ধির ঘোষণা দিলেন। যা দেশ দু’টির সম্পর্ককে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
এ ছাড়াও দেশ দু’টির সম্পর্কের অবনতি হওয়ার ক্ষেত্রে আরও কিছু দৃশ্যমান কারণও রয়েছে। তুরস্ক তাদের প্রায় অর্ধেক তেল আমদানি করে ইরান থেকে। সে কারণে ইরানের ওপর পুনঃআরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুরস্কের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মনে করা হয়। তুরস্কের মাটিতে আছে ন্যাটো জোটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনজারলিক সামরিক বিমান ঘাঁটি। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে আক্রমণের জন্য নেটো এ ঘাঁটিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। এ ঘাঁটিটি বন্ধ করে দেবার জন্য তুরস্কে অভ্যন্তরীণ চাপও আছে।
তুরস্কের সরকার সমর্থক আইনজীবীর অভিযোগ করেছেন যে, ইনজারলিকে মোতায়েন কিছু আমেরিকান সেনা কর্মকর্তা এরদোগান-বিরোধী অভ্যুত্থানের পেছনে ভুমিকা রেখেছিলেন, এবং তাদের বিরুদ্ধে আদালতের কাছে গ্রেফতারি পরোয়ানাও চেয়েছিলেন তারা। গত সপ্তাহে এক অভিযোগে এই আইনজীবীরা বিচারকের প্রতি আবেদন জানান, যেন ইনজারলিক থেকে সব বিমান উড্ডয়ন বন্ধ করে দেয়া হয়। বস্তুত নানাবিধ কারণেই মার্কিন-তুরস্ক সম্পর্ক অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
চলমান সংকটের সাথে রাশিয়া সম্পৃক্ত হওয়ায় সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিষয়টির একটি কুটনৈতিক সমাধান সম্ভব হলেও কোন পক্ষকেই এ বিষয়ে ইতিবাচক মনে হচ্ছে না। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি আগামী দিনে আরও জটিল থেকে জটিলতর হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদেরকে বিশ্বপরাশক্তি হিসেবে ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। পক্ষান্তরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেপ এরদোগানকে মুসলিম বিশ্বের নতুন সুলতান হিসেবে মনে করা হয়। তাই এই খেলার ফলাফল কী হয় তা অবশ্য সময়ই বলে দেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ