ঢাকা, সোমবার 3 September 2018, ১৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২২ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফিলিস্তিন জনগণের অধিকার! বিশ্ববিবেক ফিরে তাকাও

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পন্ডিতদের মতে এ শর্ত মেনে নেওয়া ইসরায়েলের জন্য মোটেই কঠিন ও সমস্যাজনক হওয়ার কথা নয় যেহেতু ইসরায়েল অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে আছে এবং জাতিসংঘের প্রস্তাব মেনে নিয়ে ফিলিস্তিনিদের তাদের প্রাপ্য ভূমি ফিরিয়ে দিয়ে ১৯৬৭ সালের মানচিত্র অনুযায়ী নিজেদের সীমানা প্রত্যাহার করাটাই ইসরায়েলের জন্য এখন সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত ও বুদ্ধিবৃত্তিক পদক্ষেপ। অথচ আমেরিকার (তথা আমেরিকান ইহুদিদের) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে ইসরায়েল গায়ের জোরে জাতিসংঘের নির্দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলের অনুরোধ ক্রমাগত অমান্য ও উপেক্ষা করে চলেছে এবং বিশ্ববিবেককে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে ফিলিস্তিনি সীমানায় ইচ্ছেমতো ইহুদি বাসস্থান নির্মাণ করা সহ উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক অভিযান ও নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে মিথ্যে আত্মপ্রতিরক্ষার নামে। যা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে পৌছানোর ব্যাপারটাকে বাহ্যত অসম্ভব করে তুলছে। এতক্ষণ যা কিছু লিখলাম, তা সবই মূলত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার ইতিহাস এবং তা সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলের পরামর্শ বা সুপারিশ।
এবার আমার সীমিত জ্ঞানের আলোকে এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিটা তুলে ধরব। ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট, আহমোদিনেজাদ-এর বিগত বছরগুলোতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন মুসলিম সম্মেলনে হরহামেশা ইসরায়েলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার হুমকি, গাজার শাসন ক্ষমতা দখলকারী হামাসের ইসরায়েলকে দেশ হিসেবে কখনই স্বীকৃতি না দেওয়ার ঘোষণা কিংবা বিশ্বব্যাপী রেডিক্যাল ডানপন্থি মুসলিম নেতৃবৃন্দের ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্য বিরোধিতা ও ইসরায়েল ধ্বংসের কামনা ইত্যাদি সবই আমার ব্যক্তিগত অভিমতে স্রেফ ‘পলিাটক্যাল স্টান্ট’ যার আসলে কোনো মানে নেই। এসব কথাবার্তা স্রেফ সমমনা রেডিক্যাল শ্রোতাকুল ও সমর্থকদের খুশি করার অপচেষ্টা মাত্র। বলাবাহুল্য, এ ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর কথাবার্তা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী শান্তি পূর্ণ সমাধানে পৌছানো পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় এবং শান্তির বিরোধিতাকারীদের হাতকে শক্তিশালী করার বরং উৎকৃষ্ট উপাদান। যার প্রমাণধূর্ত ইসরায়িলি প্রশাসনের এসব কথাবার্তাকে হইলাইট করে বিশ্ববাসীর কাছে বরংবার প্রচার করা এবং এর মাধ্যমে ইসরায়েলের প্রতি অমুসলিম দেশগুলোর সমর্থন ও সহমর্মিতা আদায় করার পাশাপাশি এগুলোকে ছুঁতো-নাতা ও ওজর বানিয়ে ফিলিস্তিনে আগ্রাসন চালিয়ে যাওয়া। কাজেই মুসলিম নেতৃবৃন্দের ইসরায়েল সম্বন্ধে এ সমস্ত ‘রাবিশ’ (বাজে/ফালতু) কথাবার্তা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মুসলমানদের প্রত্যাখ্যান করা উচিত।
এ কথা ভূলে গেলে চলবে না যে, ইসরায়েল জাতিসংঘ কর্তৃক প্রস্তাবিত ও স্বীকৃত একটা স্বাধীন রাষ্ট্র। আরবলীগ সে সময় জাতিসংঘের প্রস্তাবিত দ্বিজাতি  বিভাজনের মানচিত্র মেনে নিলে এবং পার্শ্ববর্তী আরবদেশেগুলো ইসরায়েলকে আক্রমণ না করলে ইসরায়েল আজও হয়তো সেই ১৯৮৭ সালের সীমানা সংবলিত দেশই থাকত এবং ফিলিস্তিনিরা হয়তো স্বাধীভাবে তাদের অংশের নিজস্ব ভূখন্ড শাসন করতে পারত। বিশেষ করে ১৯৬৭ সালে ঈজিপ্ট ও জর্ডানের ইসরায়েলি সীমানায় সৈন্য সমাবেশ ও ইজিপ্ট কর্তৃক সুয়েজ খালের ইসরায়েলি নৌ চলাচলের পথ বন্ধ না করলে হয়তো তৃতীয় ইসরায়েল-আরব যুদ্ধ সংঘটিত হতো না এবং ওয়েস্ট ব্যাংক, ইস্ট জেরুজালেম ও গোলান হাইট? স? আরবদেশগুলোর হাতছাড়াও হতো না। কাজেই, আমার ব্যক্তিগত অভিমতে মুসলমানরা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাইলে সচেতন সধারণ মুসলমানদের উচিত রেডিক্যাল মুসলিম নেতৃবৃন্দের ইসরায়েলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার মতো ফালতু পলিটিক্যাল স্টান্টের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করা, তাদের চরমপন্থি কথাবার্তা প্রত্যাখ্যান করা এবং আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সাথে মুখোমুখি বসে আলোচনার মাধ্যমে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য তাদেরকে চাপ দেওয়া।
একথা যদিও সত্যি যে, সেই সপ্তম শতাব্দী থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময় ধরে আরব মুসলমানরা উক্ত এলাকা শাসন করেছে এবং যে কারণে আরব সৃংস্কৃতি, সভ্যতা ও ভাষা সেখানে বিস্তার লাভ করেছে । কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্যি যে, ইসরায়েলি ভূমিতে ইহুদিদের বংশানুক্রম বা ‘রুট (মূল) আব্রাহামিক ধর্মের আবির্ভাবের সেই শুরু থেকেই প্রোথিত এবং এই ভূমিতে তাদের ও ধর্মীয় অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে মাইগ্রেট করা অধিকাংশ হিন্দু পরিবার ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন; বার্মা কিংবা পাকিস্তানে নয়। যদি কখনও সামাজিক সমস্যা বা রাজনৈতিক কারণে আমেরিকান কালোরা আমেরিকা ত্যাগ করে, তাহলে সম্ভবত আফ্রিকাতেই ফিরে যাবে অধিকাংশ কালোরা । ধর্মীয় পূণ্যভূমি ও পূর্বপুরুষদের আদি নিবাসকে ঘিরে ইহুদিদের ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিরাচরিত স্বপ্ন স্বভাবতই অবাস্তা কিছু নয়। এবং ব্রিটিশ সরকারের সাথে রাজনৈতিক চুক্তির সুযোগ বর্তমান ইসরায়েলে ইহুদিদের জুয়িশরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তাদের আজীবনের স্বপ্নের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন। এছাড়া আমার জানা মতে, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করার পর সর্বপ্রথম যে কটা দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তার মধ্য ইসরায়েলও ছিল। ইসরায়েলকে অন্তত সেটুকুর জন্য কৃতিত্ব দিতে ও ইসরায়েলিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি অন্তত ব্যক্তিগতভাবে কার্পণ্য করি না। বরং সৌদি আরব সেই মুসলিম দেশ যা ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। অবশ্য এখানে এ কথা বলতে একটুও অসুবিধে নেই যে, আমি ব্যক্তিগতভাবে ইহুদিদের জুয়িশরষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধী। এবং ইসরায়েলের জুয়িশরাষ্ট্র না হয়ে সেক্যুলার রাষ্ট্র হওয়ার পক্ষে। ঠিক যেমনি করে বিশ্বব্যাপী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সেক্যুলার রাষ্ট্র হওয়ার পক্ষে আমি। আজ ইসরায়েল একটা ইহুদিরাষ্ট্র না হয়ে সেক্যুলার রাষ্ট্র হলে সেখানে বসবাসরত সংখ্যালঘু আরব মুসলমানরা তুলনামূলক অনেক কম বৈষম্যের শিকার হতো এবং সে দেশের ইহুদিদের মাঝে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় ‘রেডিক্যালিজম’ এর (প্রতিক্রিয়াশীলতা) উত্থান ও তীব্রতা আনেকাংশে প্রশমিত হতো।
আমার ব্যক্তিগত অভিমত, কেবল আমেরিকার ইসরায়েল পলিসি নয়, বরং ইসরায়েলের নিজস্ব পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণে বিশেষ করে ইসরায়েলি প্রশাসনের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নীতি নির্ধারণেও আমেরিকায় বসবাসকারী প্রভাবশালী ইহুদিদের গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রয়েছে। এবং প্রভাবশালী ইহুদিদের এই অংশটাই যে আমেরিকার ইসরায়েল- ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক নীতি নির্ধারণে সবিশেষ ভূমিকা পালন করে, সেটা আমি ওপরেই আলোচনা করেছি। যে কোনো কারণেই হোক, ইসরায়েলি প্রশাসন ও তাদের আমেরিকান দোসর, প্রভাবশালী ইহুদি গোষ্ঠীর ভেতর কেন জানি ‘হকিশ’ মনোভাব ও আপোষহীনতার প্রবণতা প্রকট। এছাড়া প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ইসরায়েল ও আমেরিকায় মাইগ্রেট করে আসা ইহুদিরা সাধারণভাবে অধিক কট্টরপন্থি যারা ইসরায়েলি রাজনীতিতে ক্রমে প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছে এবং ইসরায়েলি প্রশাসনের ‘হকিশ’ মনোভাবের পেছনে এদের ভূমিকাও অন্যতম। সমস্যা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা-ইসরায়েলের সমম্বিত ও সম্মিলিত পেশিশক্তি প্রদর্শন এবং ‘ইকিশ’ ও আপোষহীন মনোভাব ফিলিস্তিনসহ গোটা আরববিশ্বকে ক্রমে ইসরায়েল বিরোধী বানিয়ে ফেলছে। এবং আমেরিকার (মূলত আমেরিকায় বসবাসকারী প্রভাবশালী ইহুদি গোষ্ঠীর) প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্স প্ররোচনায় ইসরায়েল প্রতিবেশী প্রত্যেকটা আরবদেশকে শত্রু বানিয়ে রাজনৈতিকভাবে আখেরে কতখানি লাভবান হচ্ছে তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। কেননা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয় যে, পৃথিবীর কোনো দেশই চিরকাল একক পরাশক্তি হিসেবে টিকে থাকে না। আমেরিকাও হয়তো একসময় থাকবে না। সাধারণভাবে আমেরিকা রিরোধী চায়না বা রাশিয়ার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশের সুসম্পর্ক রয়েছে। কাজেই আমেরিকা কখনও বিশ্ব একক পরাশক্তি হিসেবে তার কর্তৃত্ব হারালে ইসরায়েল সাথে সাথেই আক্রান্ত হবে পার্শ্ববর্তী আরবদেশগুলো দ্বারা। এবং কে জানে চায়না বা রাশিয়ার সামরিক সাহায্য নিয়ে ইসরায়েলকে তখন হয়তো তুলোধুনো করে ছাড়বে এসব দেশ। এ তো গেল চূড়ান্ত ভবিষ্যতবাণী । বাস্তবে যা হয়তো নাও ঘটতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এয়ার-স্প্রিং-এর মাধ্যমে আরববিশ্বের কিছু কিছু দেশে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর সেসব দেশে সরকার গঠনে ইসরায়েলের প্রতি বৈরী মনোভাবাপন্ন অংশটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার সম্ভাবনার বিষয়ে অনেক পশ্চিমা প-িতই ধারণা করছেন। এবং ইসরায়েলের বর্তমান ফিলিস্তিন নীতি এসব দেশের নবগঠিত সরকারের ইসরায়েলের সাথে পূর্বেকার শান্তিচুক্তি, সীমানাচুক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বহাল রাখার বা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে প-িতদের ধারণা। এছাড়া আমেরিকার ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণে শিয়া অধ্যুষিত ইরানের প্রতি চরম শত্রু মনোভাবাপন্ন সাদ্দাম ও তালেবানদের পতন হওয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে শক্তিশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের সাথে শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠায় ও ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র আরবদেশগুলোর প্রতি যত বেশি আপোষহীন ও শত্রুতামূলক মনোভাব প্রদর্শন করবে, ইরান বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সংকটে তত বেশি শক্তিশালী ভূমিকায় অবতর্র্ণি হবে। আর ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি কেউ যদি সত্যিই হুমকি হয়ে থাকে, তবে সেটা স্বাধীন ফিলিস্তিন বা প্রতিবেশী আরবদেশগুলো নয়, বরং সেটা ইরান হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক বলে মনে করেন মধ্যপ্রাচৌর রাজনীতিতে অভিজ্ঞ প-িতবর্গ। কাজেই ইসরায়েলের উচিত যত দ্রুত সম্ভব আন্তর্জাতিক মহলের ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নিয়ে স্বাধীন ফিলিস্থিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক সাহায্য করা। অথচ, আমেরিকার নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে ইসরায়েলকে ব্যবহারকরণ এবং আমেরিকায় বসবাসকারী প্রভাবশালী ইহুদি গোষ্ঠীর ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আমেরিকান প্রশাসনকে দিয়ে বাধা প্রধান ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনের সাথে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার ক্রমে এক অনন্য রাজনৈতিক অচলবস্থার ভেতরে আটকে ফেলেছে এবং এর মাধ্যমে সাধারণ ইসরায়েলিদের জিম্মি বানিয়ে ফেলেছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলি প্রশাসনের ‘হকিশ’ মনোভাব ও লিলিস্তিনিদের ওপর চালিত দমন নীতির মূল্য দিতে হচ্ছে নিরীহ সাধারণ ইসরায়েলিদের। হিজবুল্লাহ বা হামাসের বিরুদ্ধে আমেরিকার ও আমেরিকান ইহুদিদের হয়ে আহরহ প্রক্সি (প্রতিস্থাপন) যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে ইসরায়েল এবং প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণে প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে অসংখ্য নিরীহ ইসরায়েলি। কাজেই সাধারণ শান্তিকামী ইসরায়েলিদের ্উচিত তাদের আভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণে আমেরিকার তথা আমেরিকায় বসবাসকারী প্রভাবশালী ইহুদিদের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করা এবং ইসরায়েলি প্রশাসনের ‘হকিশ’ মনোভাব ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি দমন নীতির প্রতিবাদ করা। ইসরায়েলি জনগণ নিজ দেশের সরকারের ফিলিস্তিনিদের ওপর আরোপিত দমন নীতির ও অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিনি ভূখ- দখল করে রাখার বিরুদ্ধে যত দ্রুত ও যতখানি সোচ্চার হবে, ইসরায়েল- ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান তত তাড়াতাড়ি ও তত সহজে অর্জন করা সম্ভব হবে।
একথা সত্যি যে ইসরায়েলে বসবাসকারী ইহুদিদের অন্তত ৪১ শতাংশ পার্শ্ববর্তী আরবদেশগুলো থেকে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নির্বাসিত ও বিতাড়িত ইহুদিদের প্রথম বা পরবর্তী প্রজন্ম যাদের ভেতর আরবদের প্রতি সাধারণভাবে ক্ষোভ ও বিদ্বেষ থাকা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। অপরপক্ষে, ইসরায়েলি প্রশাসন কর্তৃক নিপীড়িত ও নির্যাতিত এবং নিজ ভূখণ্ডে উদ্বাস্তু হিসেবে মানবেতর জীবনযাপনকারী ফিলিস্তিনি আরবদের মধ্যে ইসরায়েলিদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও বিদ্বেষ থাকাটাও স্বাভাবিক। কিন্তু একই সাথে এটাও সত্যি যে, বৃহত্তর স্বার্থে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য চিরস্থায়ী শান্তি নিরাপত্তা অর্জন ও সুনিশ্চিত করতে একে অপরকে ক্ষমা এবং পাশাপাশি নিজ সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ওপর ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী সমাধান করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে সাধারণ ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা এগিয়ে না এলে শুধু আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় কিংবা ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা এগিয়ে না এলে শুধু আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় কিংবা ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি প্রশাসনের তথাকথিত ‘শান্তি আলোচনা’র মাধ্যমে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সমস্যার স্থায়ী সমাধান অর্জন করা কখনই হয়তো সম্ভব হবে না। আমার আশা, শান্তিকামী সাধারণ ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা এই চরম সত্যিটা একসময় ইপলদ্ধি করতে সক্ষম হবেন এবং একে অপরকে ক্ষমা করে শান্তি স্থাপনে যৌথভাবে উদ্যোগী হবেন। পৃথিবী শুদ্ধু মানুষ কেবল তখনই হয়তো ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী সমাধান প্রত্যক্ষ করতে পারবে।
এ বছর রমজান মাসে এই প্রথমবারের মতো আমেরিকায় নিয়োজিত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন তার ওয়াশিংটন ডিসি’র বাসভবনে ইফতার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন (অনেকটা বিল ক্লিন্টনের সময় থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউসে আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের প্রতিবছর স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ইফতার অনুষ্ঠান পালনের অনুকরণে)। স্থানীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দের অনেকের উপস্থিতিতে ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশন করা সহ আগত মুসল্লিদের জন্য মাগরিব নামাজ পড়ার ব্যবস্থাও করা করা হয়েছিল রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে। ফিলিস্তিন ও মুসলিমবিশ্বের সাথে ইসরায়েলের শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টার ও পারস্পরিক ধর্মীয় সহনশীলতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটা ছিল এক অবিস্মরণীয় পদক্ষেপ ও নতুন দিগন্তের সূচনা। যদিও বিশ্বব্যাপী মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও প-িতদের অনেকে ইসরায়েলি রাষ্টদূতের এ পদক্ষেপকে হিপোক্রেসি (কপটতা) ও ‘পলিটিক্যাল স্টান্ট’ বলে চিহ্নিত করছেন এবং এ ইফতারকে ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্তমাখা ইফতার’ বলে সঙ্গায়িত করেছেন, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অভিমত, শত্রু মনোভাবাপন্ন দু’ দেশের বা দু’জাতির মধ্যে সেতুবন্ধন স্থাপনের ও সহনশীলতা সৃষ্টির যে কোনো পদক্ষেপ, তা যত ক্ষদ্রই হোক না কেন, আশাব্যঞ্জক ও প্রশংসনীয়। ভবিষ্যতে বিভিন্ন মুসলিম দেশের আমেরিকাস্থ রাষ্ট্রদূতরাও তাদের স্ব স্ব দূতাবাসে কিংবা বাসভবনে ইহুদিদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসবের দিনে স্থানীয় ইহুদি নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানাবেন পারস্পরিক এই সৌহার্দ্যপূর্ণ যোগাযোগের প্রচলনকে ধরে রাখতে, সেটাই আমার আশা।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নিয়ে আমার আজকের প্রবন্ধটা শেষ করব ইহুদিদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রচলিত একটা হাসির গল্প বলে (স্রেফ রসিকতার উদ্দেশ্যে) লন্ডনের হিথ্রো থেকে ইসরায়েলের তেলআবিবগামী এক বিমান আকাশপথে যান্ত্রিক গোলোযোগে পড়লে বিমানে আরোহী যাত্রীদের সংখ্যাধিক্যতা যান্ত্রিক গোলোযোগের প্রধান কারণ বলে প্রতিয়মান হয়। বিমানচালক মাইক্রোফোনে ঘোষণা দেন যে, কে এমন মাহান দেশপ্রেমিক আছেন যিনি স্বদেশের সম্মানার্থে বিমানের জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্যান্য যাত্রীসহ বিমান নিরাপদে গন্তব্যে পৌছতে স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দেবেন? বিমানচালকের এ ঘোষণায় বিমানের একমাত্র সাদা ব্রিটিশ যাত্রী ‘লং লিভ গ্রেট ব্রিটেন’ (গ্রেট ব্রিটেন দীর্ঘজীবী হউক) বলে বিমানের জানালা দিয়ে ঝাপিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর বিমানচালক জানালেন, যান্ত্রিক গোলাযোগ কিছুটা প্রশমিত হলেও বিপদ এখনও কাটেনি এবং অন্তত আরো একজন যাত্রীকে স্বদেশের সম্মানার্থে আত্মাহুতি দিতে হবে। তখন বিমানের একমাত্র জাপানিজ যাত্রীটি লং লিভ জাপান’ (জাপান দীর্ঘজীবী হউক) বলে বিমানের জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বিমান ইতিমধ্যে ইসরায়েলের আকাশ সীমানায় প্রবেশ করলে বিমান চালক তার সর্বশেষ ঘোষণায় জানালেন, যান্ত্রিক গোলোযোগ অনেকাংশ প্রশমিত হলেও বিপদ সম্পূর্ণরূপে কাটেনি এবং শেষবারের মতো আর একজন যাত্রীকে স্বদেশের সম্মানার্থে আত্মাহুতি দিতে হবে, নতুবা নিরাপদে বিমানটাকে রানওয়েতে নামানো সম্ভব হবে না। বিমান যাত্রীদের মধ্যে তখন রয়েছে শুধু একদল ইহুদি এবং গোটা কয়েক ফিলিস্তিনি আরব। এক ইহুদি যাত্রী তার পাশে বসা এক ফিলিস্তিনি আরবকে বিমানের জানালা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়ে বলে উঠলেন, লং লিভ ইসরায়েল (ইসরায়েল দীর্ঘজীবী হউক)। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ