ঢাকা, মঙ্গলবার 4 September 2018, ২০ ভাদ্র ১৪২৫, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঘৃতকুমারী অনন্য ওষুধিগুণের এক ভেষজ উদ্ভিদ

মুহাম্মদ নূরে আলম : ঘৃতকুমারী একটি অতি জনপ্রিয় ভেষজ গাছ। ঘৃতকুমারী গাছের উদ্ভিদ তাত্ত্বিক নাম Aloe vera বা এ্যালোভেরা। এটা দেখতে অনেকটা কাঁটাওয়ালা ফণীমনসা বা ক্যাকটাসের মতো। দেখতে ক্যাকটাসের মত হলেও এর রয়েছে নানাবিধ গুণাবলী। বাংলাদেশের চাষিদের কাছে এটি এখন লাভজনক ভেষজ উদ্ভিদ নামে অধিক পরিচিত। দেশের ভেষজ গ্রামের চাষিরা এ ভেষজটি চাষ করে বছরে বিঘা প্রতি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা লাভ করেছেন। প্রতিদিন সেই গ্রাম থেকে এক ট্রাক ঘৃতকুমারী গাছের পাতা দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়। বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে প্রথম নাটোরের লক্ষীপুরের খোলাবাড়িয়া গ্রামের আফাজ পাগলা আ্যালোভেরা চাষ শুরু করেন। ১৯৯৭ সালে সে গ্রামে এর চাষ ছিল মাত্র ২ হেক্টর। বর্তমানে গ্রামটিতে প্রায় ২৫ হেক্টরে জমিতে আ্যলোভেরা চাষ হয়। নাটোর জেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের ১৬ টি গ্রামের প্রায় ১৪ টি গ্রামে এর চাষ হয়।
এ্যালোভেরা অনেক গুণ: ঘৃতকুমারীর ব্যবহার বহু যুগ আগে থেকেই। তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এর অনেক গুণের কথা মানুষ জানতে পেরেছে। যা জানার ফলে ঘৃতকুমারী ব্যবহার করে পেয়েছেন অনেক রোগের সমাধান। ঘৃতকুমারীর পাতার ভেতরের শাঁস পানির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে প্রতিদিন খেলে শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমে যাবে। ঘৃতকুমারীর জুস ব্লাড সুগার লেভেল ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তাই ডায়বেটিক রোগীদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। নিয়মিত ঘৃতকুমারীর রস পানে পরিপাক প্রক্রিয়া সহজ হয়। ফলে দেহের পরিপাকতন্ত্র সতেজ থাকে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। তাছাড়া ডায়রিয়া সারাতেও ঘৃতকুমারীর রস দারুণ কাজ করে। নিয়মিত ঘৃতকুমারীর রস সেবন শরীরের ক্লান্তি-অবসাদ দূর করে শক্তি যোগানসহ ওজনকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে। যারা দীর্ঘকাল ফিব্রোমিয়ালজিয়ার মতো সমস্যায় ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে ঘৃতকুমারীর রস দারুণ কাজ করে। এটি দেহে সাদা ব্লাড সেল গঠন করে যা ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে। শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণে ঘৃতকুমারীর রস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঔষধির কাজ করে। ঘৃতকুমারীর রস সেবনের ফলে শরীরে বিভিন্ন ভিটামিনের মিশ্রণ ও খনিজ পদার্থ তৈরি হয় যা আমাদেরকে চাপমুক্ত রাখতে এবং শক্তি যোগাতে সাহায্য করে। ঘৃতকুমারীর রস হাড়ের সন্ধিকে সহজ করে এবং দেহে নতুন কোষ তৈরি করে। এছাড়া হাড়ও মাংসপেশীর জোড়াগুলোকে শক্তিশালী করে। সেই সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন প্রদাহ প্রশমনেও কাজ করে। ঘৃতকুমারীর শাঁস প্রতিদিন নিয়ম করে কয়ক সপ্তাহ লাগালে একজিমা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কোন জায়গা যদি আগুনে পুড়ে যায় তাহলে টাটকা পাতার শাঁস ঐ জায়গায় লাগলে চট জলদি আরাম পাওয়া যায়। ফলে ফোসকা পড়ে না এবং চামড়ায় দাগ হয় না। মুখের মেছতার ওপর কিছু ঘৃতকুমারী পাতার রস রেখে দিলে ত্বক নরম হয় এবং ক্ষতচিহ্ন দেখা যায় না। মুখের মেছতা খুব গুরুতর হলে ঘৃতকুমারীর রস পানির সঙ্গে মিশিয়ে খান। প্রতিদিন দু’বার, প্রত্যেকবার ১০ মিলিলিটার। এছাড়া ঘৃতকুমারীর একটি পাতা, মধু ও একটি ছোট শসা মিশিয়ে মাস্ক করুন বা মেছতার ওপর রেখে দিন। মেছতা দূর হবে। কোমরে ব্যথা হলে শাঁস অল্প একটু গরম করে মালিশ করলে আরাম পাওয়া যায়। ঘৃতকুমারীর রস ব্রণের দাগ সারাতে খুবই উপকারী ভূমিকা রাখে। এর কাজ হচ্ছে ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখা। এছাড়া ঘৃতকুমারী গরমে প্রশান্তি ও চুলের পুষ্টি দিতে কার্যকরী উপাদান। পাশাপাশি প্লীহা, যকৃত, কৃমি, বাত, বহুমুত্র, ক্ষুধামন্দা ও বদহজম দূর করতে এর তুলনা নেই।
উৎপত্তি ও বিস্তার: ঘৃতকুমারীর আদি নিবাস উত্তর আফ্রিকায় হলেও তা এখন বাংলাদেশসহ এশিয়ার আরও অনেক দেশে জন্মাচ্ছে। উত্তর আফ্রিকার মরোক্ক, মৌরিতানিয়া,মিসর এমনকি সুদানেও এ গাছ জন্মে। সপ্তদশ শতাব্দিতে আলোভেরা চীন ও দক্ষিণ ইউরোপের প্রবর্তিত হয়। অষ্ট্রেলিয়া, বারবাডোজ, বেলিজ, নাইজেরিয়া, প্যারাগুয়ে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও গাছটি দেখা যায়। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা,থাইল্যান্ড,ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মালেশিয়া প্রভৃতি দেশেও ঘৃতকুমারী জন্মে।
প্রজাতি ও গাছের বর্ণনা: ঘৃতকুমারী বহুবর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ এবং দেখতে অনেকটা আনারস গাছের মত। এর পাতাগুলি পুরু, দুধারে করাতের মত কাঁটা এবং ভেতরে লালার মত পিচ্ছিল শাঁস থাকে। কার্ল লিনিয়াস ১৭৫৩ সনে সর্বপ্রথম এ গাছের প্রজাতি অষড়ব ঢ়বৎভড়ষরধঃধ াধৎ.াবৎধ নামে বর্ননা করেন। পরে ১৭৬৮ সনে নিকোলাস লরেন্স বুরম্যান এর প্রজাতির নাম দেন অষড়ব াবৎধ (খ.) ইঁৎস.ভ. ঘৃতকুমারী গাছ বেশ কয়েক বছর বাচে। ইহা একটি রসালো বা সাকুলেন্ট প্রকৃতির গাছ। এই গাছ ৬০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, গাছের গোড়া থেকে অনেকগুলো পাতা একরে পর এক উর্ধমুখী ভাবে বের হয়। পাতা বেশ মাংসল,পুরু,নরম,সবুজ ও দুই কিনারা কাঁটাযুক্ত বা করাতের মতো। গ্রীষ্মকালে লম্বা ডাটায় এর ফুল ফোটে। ফুলের ডাটা প্রায় ৯০ সেমি লম্বা হয়। ফুলের রং হলদে, নলাকার।
ব্যবহার: ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রায় দুই হাজার বছর পূর্ব থেকেই এই গাছ ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রসাধন ও ওষুধ শিল্পের কাচামাল হিসেবে আ্যালোভেরার নির্যাস ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শরীরের নানা রোগ ব্যধি দূর করতে এ গাছের ব্যবহার সর্বজনবিদিত। এর পাতা কাটলে ভেতরে জেলির মতো থকথকে তালের শাসের মতো সাদা স্বচ্ছ শাস পাওয়া যায়। হালকা তিক্ত স্বাদের এ শাস শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য ও শক্তি বাড়ানোর জন্য শরবত করে খাওয়া হয়। শহর বন্দরে অনেক খুচরা বিক্রেতা ফুটপাতে এই শরবত বিক্রি করে থাকে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জ্যামাইকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া, জাপান ও চীনে আ্যালোভেরা থেকে ভেষজ ওষুধ তৈরি করা হয়।
মাটি ও জলবায়ু:সবরকম জমিতেই ঘৃতকুমারী চাষ সম্ভব তবে দোঁয়াশ ও অল্প বালি মিশ্রিত মাটিতে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয় । সুনিষ্কাশিত জমি যেসব জমিতে পানি জমে না এরুপ উচু জমিতে ঘৃতকুমারীর চাষ করা যায়। তবে লবনাক্ত ও চরম অম্লীয় মাটিতে ভালো হয় না। নিচু ও পানি জমা জমিতে গাছ পচে যায়। যে কোন দোআশ মাটিতে চাষ ভালো হয় তবে বেলে দোআশ মাটি উত্তম। এটেল মাটিতে চাষ না করা ভালো। ছায়া জায়গায় হবে না, ঘৃতকুমারীর জন্য দরকার সারাদিন রোদ পড়ে এমন জমি।
জমি তৈরি: ঘৃতকুমারী চাষ করতে হলে জমি প্রথমে ভালোভাবে পরিষ্কার করে চাষ দিতে হবে। চাষের সময় হেক্টর প্রতি ১০ থেকে ১২ টন গোবর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। এছাড়া এ সময় হেক্টর প্রতি ২২৫ থেকে ২৫০ কেজি টিএসপি ও ৭৫ থেকে ১০০ কেজি এমওপি সার দিতে হবে। নাটোরের আলোভেরা চাষিরা সাধারণত বেশি করে গোবর সার দিয়ে এর চাষ করেন, খুব কম চাষিই রাসয়নিক সার দেন। অনেক চাষিরা প্রচুর ছাই ব্যবহার করে থাকেন। তবে কেউ কেউ বিঘা প্রতি ২৫ থেকে ৩০ কেজি টিএসপি এবং ১০ কেজি এমওপি সার জমি প্রস্তুতের সময় ব্যবহার করেন। সার মেশানোর পর জমিতে চারা লাগানোর জন্য বেড তৈরি করতে হবে। বেড হবে ১.৫ থেকে ২.২৫ মিটার চওড়া। প্রতি দুই বেডের মাঝে ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার নালা রাখতে হবে।
চারা রোপণ: ঘৃতকুমারীর তিন রকম চারা লাগানো হয়- রুট সাকার বা মোথা,গাছের গোড়া থেকে গজানো চারা ও গাছের গোড়ার অংশ কেটে ফেলে পুরো গাছ। বাণিজ্যিকভাবে রুট সাকার লাগানো লাভজনক নয় বিধায় এটি লাগানো হয় না। পুরাতন গাচের গোড়া থেকে গজানো চারা মাতৃগাছ থেকে আলাদা করে প্রথমে এক খন্ড জমিতে বা বেডে লাগানো হয়। সেখানে এসব চারা ২ থেকে ৩ মাস লালন পালন করে বড় করা হয়। পরে মূল জমি চাষ দিয়ে এসব চারা তুলে সেখানে লাগানো হয়। এতে চারার প্রতিষ্ঠা ভাল হয়। তবে এরুপ চারা লাগিয়ে পাতা তোলার জন্য ৬ মাস অপেক্ষা করতে হয়। তাই বাণিজ্যিক চাষের জন্য এরুপ চারা লাগানোর চেয়ে মোথা কেটে বাদ দিয়ে সরাসরি পুরাতন গাছ লাগাতে বেশি পছন্দ করে থাকেন। এতে দ্রুত পাতা তোলা যায়। এরকম গাছ লাগানোর ৩ মাসের মাথায় পাতা তোলা যায়। অনেকদিন জমিতে থাকার পর একই গাছ থেকে উপর্যুপরি পাতা তোলার পর গাছের গোড়া যখন লম্বা হয়ে যায় এবং গাছ যখন খাড়া থাকতে পারে না,তখন গাছ কেটে ২/৩ টা পাতা বাদ দিয়ে সেসব গাছ লাগাতে হবে। লাগানো গাছ যেন সুস্থ সবল হয় সেদিক লক্ষ্য রাখতে হবে।
রোপণ সময়: বছরের যে কোন সময় ঘৃতকুমারীর চারা লাগানো যায়। তবে শীত ও বর্ষা কালে চারা না লাগানো ভালো। সাধারণত কার্তিক অগ্রাহায়ণ মাসে চারা বেশি লাগানো হয়। তবে শীত ও বর্ষাকালে চারা না লাগানো ভালো। সাধারণত কার্তিক- অগ্রহায়ণ মাসে চারা বেশি লাগানো হয়। কেননা এ সময় চারা লাগালে শীতের মধ্যে গাছ মাটিতে লেগে যাওয়ার চেষ্টা করে। শীতের সময় বাজারে আ্যালোভেরার পাতার চাহিদা থাকে না। তাই চাষিরা এ সময় পাতা সংগ্রহ থেকে বিরত থাকে। পক্ষান্তরে এই ২-৩ মাসের মধ্যে চারা জমিতে ভালো ভাবে লেগে যায়। শীত শেষে বসন্তে নতুন পাতা ছাড়তে শুরু করলে পাতা সংগ্রহ করা শুরু হয়। এ পদ্ধতিতে চাড়া রোপন করলে বেশি পাতা পাওয়া যায়।
সাধারণত কোন রাসয়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। যদি ইউরিয়া সার দিতে হয় তাহলে বছরে একবার সবটুকু ইউরিয়া সার জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় মাসে জমিতে ছিটিয়ে দিলেই চলে। সার ছিটানোর পর আগাছা নিড়িয়ে মাটির সঙ্গে সার মিশিয়ে দিতে হয়। বেশি ইউরিয়া সার দিলে রোগের আক্রমণ ও প্রকোপ বেড়ে যায়। শুষ্ক মৌসুমে জমিতে প্রয়োজন মাফিক সেচ দিতে হবে। মাঝে মাঝে জমির আগাছা নিড়িয়ে দিতে হবে। ঘৃতকুমারী গাছ জমিতে প্রায় দুই বছর থাকে। তাই দ্বিতীয় বছরেও প্রথম বছরের ন্যায় একই হারে জমিতে সার ও সেচ দিতে হবে।
ফসল সংগ্রহ ও ফলন: ঘৃতকুমারী চারা লাগানোর ছয় মাস পর থেকে পাতা তোলা শুরু করা যায়। বছরে ৯ – ১০ মাস পাতা তোলা যায়। শীতকালে পাতা তোলা বন্ধ থাকে। সাধারণত প্রতি ১৫ দিনে একটি পাতা বের হয়। তবে চাষিরা মাসে একটি গাছ থেকে ১-২ টি পাতা সংগ্রহ করে। গাছের বৃদ্ধি ও পাতা বড় হলে প্রতি মাসে ২ টি পাতা তোলা যায়। পাতা তোলার পর পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে ছায়ায় শুকিয়ে আটি বেধে বাজারে বিক্রি করা যায়। অথবা ঝুড়িতে কলাপাতা দিয়ে স্তরে স্তরে সাজিয়ে প্যাকেট করে দূরবর্তী বাজারে পাঠানো হয়। স্থানীয় ভাষায় ৫০ থেকে ৫৫ কেজি পাতার এক আটি বা বোঝাকে এক গাইট বলে। এক ট্রাকে ২০০ থেকে ৩০০ গাইট ধরে। প্রতি ৬ গাইট ঘৃতকুমারীর বাজার দর ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। এ হিসাবে এক বিঘা জমি থেকে বছরে প্রায় ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকার পাতা বিক্রি করা যায়। এক বিঘা জমিতে ঘৃতকুমারী চাষ করতে বছরে প্রায় ৬০,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা খরচ হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ