ঢাকা, বুধবার 5 September 2018, ২১ ভাদ্র ১৪২৫, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মানবতা বিরোধী অপরাধে মিয়ানমারের বিচার ও ভাষানচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন

আগামী ১০ সেপ্টেম্বর জেনেভায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিষদের ৩৯তম অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এই অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন উত্থাপিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে বলে পত্র-পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রসমূহের বরাত দিয়ে এসব রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, আসন্ন এই অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের বক্তব্যে বর্তমান বিশ্বের নিকৃষ্টতম মানবিক বিপর্যয় ও জঘন্যতম সংকট হিসেবে রোহিঙ্গা ইসু থাকবে। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানীদল মানবাধিকার পরিষদে রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে তাদের পুরো প্রতিবেদন উপস্থাপনের পাশাপাশি তা বিশ্লেষণ করবে এবং মিয়ানমারের বিচারের উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ তুলে ধরবে।
জানা গেছে, মিয়ানমারে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল রিপোর্টার ইয়াংহি লি ইতোমধ্যে মিয়ানমারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে উদ্যোগ নিতে মানবাধিকার পরিষদসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়াও গণহত্যা প্রতিরোধ এবং শাস্তি প্রদান বিষয়ক সনদের ৭০তম বার্ষিকী উপলক্ষে মানবাধিকার পরিষদে একটি উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা হবারও কথা রয়েছে। সেখানে গণহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টা আদামা দিয়েংয়েরও বক্তব্য দেয়ার সম্ভাবনা আছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা এই আলোচনায়ও রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়টি আসবে। বলা বাহুল্য, আদামা দিয়েং গত মার্চ ও জুন মাসে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এসেছিলেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর যে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। এই অপরাধকে গণহত্যা প্রমাণ করার জন্য তিনি সচেষ্ট থাকবেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের এই উদ্যোগ অভিনন্দন যোগ্য। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী যে গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন লুণ্ঠন ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে মানব ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত বিরল, শুধুমাত্র ধর্ম বিশ্বাস ও ভিন্ন আদর্শের কারণে একটি জনগোষ্ঠীকে এভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার অপচেষ্টা একটি নিকৃষ্টতম অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সাধারণ নাগরিক যারা এই গণহত্যা ও নির্যাতনের সাথে জড়িত তাদের সবাইকে শাস্তির আওতায় আনা দরকার। শুধু তাই নয় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রত্যর্পণ এবং পিতৃ পুরুসের সম্পত্তি ও ভিটেমাটিতেও পুনর্বাসনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সেই দশের সরকারকে বাধ্য করা দরকার বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ও সবচেয়ে নিকটের বলি হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং তারও অনেক কিছু করার আছে। ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়ে বিরাট মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত এবং সৌদি আরবসহ আরো বহু দেশে অনেক রোহিঙ্গা মুসলিম বাস্তুচ্যুত ও নির্যাতিত হয়ে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ওপর অবিচারের শাস্তি প্রদান এবং তাদের বাড়িঘরে তাদের ফেরৎ নেয়ার বিষয়ে চাপ প্রয়োগের জন্য ওআইসিভুক্ত দেশসমূহসহ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আমরা অনুরোধ করতে পারি। নব্বই এর দশক থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের এই অত্যাচার অবিচার চলছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এ জন্য তাদের কোনও প্রকার শাস্তি না দেয় তাহলে ভবিষ্যতে শুধু মিয়ানমার নয় কোন রাষ্ট্রেই সংখ্যালঘু ধর্ম বিশ্বাসী অথবা নৃগোষ্ঠীর লোকদের জীবন ও সম্মান-সম্পত্তির নিরাপত্তা থাকবে না। এই সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এবং নিরাপত্তা পরিষদেরও অধিবেশন শুরু হবে। রোহিঙ্গা গণহত্যা, রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন এবং মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারে উদ্যোগ নেয়ার জন্য আমি সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদ উভয়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। তারা রোহিঙ্গা গণহত্যার তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ ও বিচার প্রক্রিয়ায় উদ্যোগ নেয়ার জন্য নিজেরাই একটি নতুন কাঠামো সৃষ্টি করতে পারেন অথবা নিরাপত্তা পরিষদ স্বয়ং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ফৌজদারী আদালতকে (আইসিসি) এই দায়িত্ব দিতে পারেন, মোদ্দা কথা হচ্ছে মিয়ানমারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য তাদের ভয়াবহ অপরাধগুলোর তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরী। এই দেশটি তার অপরাধ অস্বীকার করার পাশাপাশি তথ্য প্রমাণ ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। মিয়ানমারের অবস্থানরত মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল রেপোর্টিয়ার ইয়াং হি লি সম্প্রতি সিএনএনকে বলেছেন, ‘আমি আশা করছি মিয়ানমারের জবাবদিহিতা কাঠামো সৃষ্টির জন্য মানবাধিকার পরিষদের প্রস্তাব সদস্য দেশগুলো সেপ্টেম্বর মাসেই সমর্থন করবে। অন্য রাষ্ট্রগুলোকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মিয়ানমার পরিস্থিতির তদন্তকারী দল তার সুপারিশে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং জবাবদিহিতায় বাধ্য করার জন্য আঞ্চলিক বিভিন্ন জোট যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আসিয়ানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যে এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বলেছে তারা মিয়ানমারের জবাবদিহিতার উদ্যোগ নেবে।
এই অবস্থায় পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে বলেই মনে হয় এবং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার একটি সমাধানের চেষ্টা করা উচিত বলে মনে হয়।
॥ দুই ॥
বাংলাদেশে বর্তমানে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় স্থাপিত ক্যাম্পে বসবাস করছে। কক্সবাজার ছাড়া চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায়ও বেশকিছু রোহিঙ্গা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এদের আবাসন ও ভরণপোষণ অত্যন্ত কঠিন কাজ হলেও বন্ধু ভাবাপন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় এনজিওগুলোর সহযোগিতায় বাংলাদেশ এই দুরূহ কাজের আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে গত রোববার খবর বেরিয়েছে যে, সরকার তড়িঘড়ি করে রোহিঙ্গাদের ভাষাণচরে নেয়ার একটা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, এও খবর বেরিয়েছে যে, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা এর বিরোধিতা করছে, তারা যেতে চাচ্ছে না এবং কিছু এনজিও সরকারের এই উদ্যোগকে পছন্দ করছে না। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং ভেবে দেখা প্রয়োজন। ভাষাণচর নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নিকটে ২০০৬ সালে জেগে ওঠা একটি চর। এর আরো তিনটি নাম আছে। এর একটি অংশ ঠেংগারচর নামে পরিচিত যেখানে classified forest সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। আরেকটি অংশ গ্যাংগিরারচর নামে অভিহিত। এখানে অল্প কয়েক ঘর জেলের বসতি আছে। আরেকটি অংশ চর বদ্রে মনির নামে পরিচিত এবং এখানে একটি ভূমি অফিস আছে। এলাকাটি আমি সফর করেছি। এটি হাতিয়া থেকে পূর্ব দিকে ২০ কি.মি. দূরে অবস্থিত। চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার জাজ্জারচর বা আর্মি ক্যাম্প থেকে ২০/৩০ কি.মি., সন্দ্বীপের উত্তর-পূর্ব কোণ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে। আয়তন ৯০ বর্গ কিলোমিটার, উত্তর-দক্ষিণে ১৫ কি.মি. লম্বা এবং ৬ কি.মি চওড়া, চরটির পশ্চিম দিকে নতুন চর জাগছে, তবে এর কোন দিকেই ভাঙন নেই। সরকারি জরিপের কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। চরটির উত্তর-পূর্বাংশে জলদস্যুদের উপদ্রব রয়েছে। হাতিয়া এবং সন্দ্বীপবাসীদের দেয়া তথ্যানুযায়ী চরটি এখনো বসবাস উপযোগী হয়নি। নিরাপত্তার জন্য এর চারপাশে ৪২ কিলোমিটার লম্বা (১৫+১৫+৬+৬) বেড়িবাঁধ দেয়া প্রয়োজন। আরো প্রয়োজন কোস্টগার্ড ও থানা প্রতিষ্ঠা। এখানে খাওয়া, রান্নাবান্না ও গোসলের জন্য মিঠা পানির প্রয়োজন। এই পানির ব্যবস্থা করতে হলে প্রচুরসংখ্যক গভীর নলকূপ, বড় বড় পুকুর ও দীঘি খনন করতে হবে যা খুবই ব্যয়বহুল। এছাড়াও আবাসিক ভবন, সাইক্লোন সেন্টার, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচার জন্য গবাদি পশুর আশ্রয় কেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল, মসজিদ মাদরাসা মক্তব প্রভৃতি তৈরি করাও জরুরি। বিচ্ছিন্ন এই চরে অর্থনৈতিক কোনও কর্মকাণ্ড নেই। নিকটবর্তী হাতিয়া দ্বীপে আসা যাওয়ার জন্য কমপক্ষে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে। সেখানে থাকতে হলে নিজেরাই তরিতরকারি চাষ করতে হবে। গবাদি পশু নিজেদেরকেই পুষতে হবে। এ জন্য প্রত্যেক পরিবারকে এক একর জমি বরাদ্দ করে চাষাবাদের জন্য আলাদা পুঁজি দেয়া অপরিহার্য। তাদেরকে গরু, মহিষ, ছাগল এবং হাঁস-মুরগিও সরবরাহ করতে হবে। এতিম ছেলেমেয়েদের জন্য এতিমখানা এবং সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষারও ব্যবস্থা করতে হবে। এই কাজ খুবই ব্যয়বহুল এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সহযোগিতা ছাড়া সম্পন্ন করা কঠিন। জানা গেছে যে, সরকার ভাষানচরের উন্নয়নের জন্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ৪১৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার সংস্থান রেখেছে এবং এই উন্নয়নের দায়িত্ব নৌবাহিনীকে দেয়া হয়েছে। এর আগে ১০ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার মধ্যে অন্ততপক্ষে ভাষাণচরে এক লাখ রোহিঙ্গার পুনর্বাসনের জন্য আবাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে একনেক বৈঠকে ২৩১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে ২০১৯ সালের নবেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এই প্রকল্পের অধীনে ১২০টি গুচ্ছ গ্রামে ১৪৪০টি ব্যারাক হাউজ এবং ১২০টি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এতে গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি পালন এবং মৎস্য চাষেরও ব্যবস্থা থাকবে বলে জানা গেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা কুটির শিল্প প্রভৃতিও থাকছে বলে জানা গেছে।
সমুদ্রের বুকে দুর্গম ও জনবিচ্ছিন্ন এই চরে রোহিঙ্গাদের বসতি নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। মিয়ানমার থেকে মার খেয়ে আসা ভাগ্যাহত এই জনগোষ্ঠীকে উত্তাল সমুদ্রের মাঝখানে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ এই এলাকায় পুনর্বাসনের যৌক্তিকতা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
এই অবস্থায় নিজস্ব তহবিলের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে আবাসন তৈরির পর সেখানে যদি রোহিঙ্গারা না যায় তাহলে পুরো অর্থ ও প্রকল্পই সমুদ্রে বিসর্জনের নামান্তর হবে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আস্থায় নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া সমীচীন বলে আমি মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ