ঢাকা, বুধবার 5 September 2018, ২১ ভাদ্র ১৪২৫, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভারতীয় আদালতে মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণের নায়কদের বেকসুর খালাস

ইবরাহিম রহমান : গত ১৬ এপ্রিল ভারতের সন্ত্রাস বিরোধী (Anti-terror) আদালত হিন্দুত্ববাদ প্রচারক স্বামী অসীমানন্দ এবং আরও চারজনকে মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণ মামলার অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। আদালত বলেছে, অভিযোগকারী (Prosecution) এমনকি একটি অভিযোগও প্রমাণ করতে পারেনি। অসীমানন্দ ছাড়া আরও যারা খালাস পেয়েছেন তারা হলেন দেবেন্দ্র গুপ্ত, লোকেশ শর্মা, ভরত মোহন লাল রতেশ্বর ওরফে ভরত ভাই এবং রাজেন্দ্র চৌধুরী। আদালত রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির (NIA) মামলার বিশেষ বিচারক কে রারিন্দর রেড্ডি পদত্যাগপত্র পেশ করেন। এদিকে নিখিল ভারত মজলিস-ই-ইত্তেহাদ-উল-মুসলেমিন এর প্রধান এবং হায়দারাবাদের এমপি আসাদ উদ্দিন ওয়াইসি তার টুইটে বলেন, ‘মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণ মামলায় বিচারক সব আসামীর খালাস দিয়েছেন, তা ষড়যন্ত্রমূলক, বিচারকের সিদ্ধান্তে আমি বিস্মিত।’ এর আগে আরেক টুইট বার্তায় ওয়াইসি দাবি করেন, এনআইএ মামলাটিকে যথাযথভাবে প্রস্তুতও করে বিধায় সব আসামী খালাস পেয়ে যায়। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ ২০০৭ সালের ১৮ মে জুমার নামাজ আদায়রত অবস্থায় রিমোট কন্ট্রোলে চারশত বছরের পুরাতন মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। যার ফলে সমগ্র মসজিদ এলাকা প্রকম্পিত হয় এবং বিস্ফোরণের ফলে ৯ জন মুসল্লি নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়। পরে দুটি বিস্ফোরক ডিভাইস ঘটনাস্থলে পাওয়া যায় এবং পুলিশ তা অকেজো করে দেয়। এর ফলে ভারত জুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও সহিংসতার সূত্রপাত হয়। এমনকি দাঙ্গা বেধে যায়, তাতে পুলিশের গুলীবর্ষণে আরও ৫ জন মারা যায়। অসীমানন্দের আইনজীবী জেপি শর্মা সাংবাদিকদের বলেন, বাদীপক্ষ (NIA) একটি অভিযোগও প্রমাণ করতে পারেনি এবং সব আসামী বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। বাস্তবে শাসক দল বিজেপির সঙ্গে এনআইএ-এর যোগসাজশ ছিল এবং এনআইএ বিচারকের ওপর বরং চাপ সৃষ্টি করে। এত বড় মামলায় বিচারের সময় বা রায় ঘোষণাকালে কোর্টে কোনো সাংবাদিক প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। তদানিন্তন ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ এ্যালায়েন্স সরকার কর্তৃক এটাকে হিন্দু সন্ত্রাস বলে আখ্যায়িত করে, যা বিজেপিকেও বিব্রত করে। এটা ছিল বিজেপি প্রভাবিত একটা বিচার ও তার রায়, যা প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহ, তথ্য ও সাক্ষ্য দ্বারা বিচার করা যেত। এই মামলায় ১০ জন আসামী ছিল তার মধ্যে মাত্র ৫ জনকে বিচারের মুখোমুখী করা হয়েছে। দুইজন আসামী সন্দ্বীপ ভি ডাঙ্গে এবং রামচন্দ্র কাল সাংগ্রা পলাতক এবং সুনীল জোসী খুন হয়। বাকি দুইজনের বিরুদ্ধে এখনও তদন্ত চলছে। দুইজন পলাতক থাকার কারণ থেকে এটা পরিষ্কার যে, মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণের সাথে এরা জড়িত। রায় ঘোষণার পর ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (NIA) বিরোধী দলের সমালোচনা ও আক্রমণের শিকার হয়। এই সমালোচনায় প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও রয়েছে। রায়ের পর বিজেপির প্রতিক্রিয়া হলো, আদালত কংগ্রেসকে তুষ্ট করার নীতি অনুসরণ করেছে। ওদিকে কংগ্রেস এনআইএ’র কার্যক্রম চ্যালেঞ্জ করেছে। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধীর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি ঘটনার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে রিপোর্টারদের প্রতি তার সমালোচনার তীর নিক্ষেপ করেন। তার টুইট একাউন্টও নীরব হয়ে যায়। কংগ্রেস ও তার প্রেসিডেন্টের এব্যাপারে বাস্তবে বলার কিছু নেই। কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা গোলাম নবী আজাদ বলেন, চার বছর পূর্বে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বিজেপি সরকার প্রতিটি মামলায় খালাস নীতি পালন করে আসছে। মানুষ এনআইএ’র প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তা সত্ত্বেও আদালতের রায় প্রমাণ করে বিজেপি দেশে পীত সন্ত্রাস বাস্তবায়নে হেন প্রচেষ্টা নেই তারা করে নাই।
বিখ্যাত চিন্তাবিদগণ হোবস, মেকিয়াভেলি এবং মরগেনথো বলেন, কোন কোন সময় শাসকরা হীনস্বার্থে অনৈতিক কার্যকলাপ যেমন প্রতারণা, মিথ্যাচার, জুচ্চুরি এমনকি খুনের আশ্রয় নেয়। তবে এই ধরনের নোংরা হীন রাজনীতি বেশিদিন চলে না। এর পরই আবির্ভাব ঘটে স্বচ্ছতা, সমঝোতা ও সমৃদ্ধির রাজনীতির। দুর্ভাগ্য হলো, আধুনিক স্বচ্ছতার যুগে ভারত এখনো নোংরা ও হীন রাজনীতি অনুসরণ করে চলছে।
রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং ভিন্নমত দলনে এনআইএকে বিজেপি সরকার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। পাকিস্তানকে হেয় করার ক্ষেত্রে এনআইএ অনুরূপ ভূমিকা পালন করে চলছে। ২০০৮ সালের ২৬ নবেম্বর মুম্বাই হামলার ঘটনার পর একই বছর ৩১ ডিসেম্বর সেন্ট্রাল কাউন্টার টেরোরিজম ল এনফোর্সমেন্ট অরগানাইজেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সময়ান্তরে সেই প্রতিষ্ঠানটি (এনআইএ) এখন রাজনীতিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি, বিরোধী রাজনীতিকদের টুটি চেপে ধরাসহ ভিন্নমত দলনে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভিন্নমত দলনে এনআইএ’কে সহায়তা করার জন্য বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যার কাজ হলো এনআইএ’র দায়ের করা মামলাগুলো জোরদারে সহায়তা করা। রাজনৈতিক ভিন্নমত দলন ছাড়াও ভারতীয় মুসলিম, শিখ, মাওবাদী ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহীদের দমনে এনআইএ অতি তৎপর। কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী হুররিয়াত নেতা ও মুক্তিকামী কাশ্মীরী জনগণের বিরুদ্ধে এনআইএ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলছে। ভারত সরকার কর্তৃক হুররিয়াত নেতাদের সাথে আলোচনা অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আলোচনায় সহায়তাকারী সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা দিনেশ শর্মার সাথে আলোচনায় বসার জন্য হুররিয়াত নেতাদের ওপর উৎপীড়ন করছে এই এনআইএ।
কাশ্মীরি হুররিয়াত নেতা সৈয়দ আলী জিলানী মীর ওয়াইজ উমর ফারুক এবং মুহম্মদ ইয়াসিন মালিক কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলন দমনে এনআইএ’র ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। একইভাবে পাঞ্জাবে সমস্ত কর্মক্ষম লোককেই প্রো-খালিস্তান লোক আখ্যায়িত করে নির্যাতন চালাচ্ছে এনআইএ। এদিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ডের প্রাক্তন চীফ মিনিস্টার টিআর জিলিংকে নাগাল্যান্ড সোস্যালিস্ট কাউন্সিলের খাপলাং গ্রুপকে অর্থায়ন বিষয়ক এক তদন্ত অনুষ্ঠানে এনআইএ তলব করে। কংগ্রেস নেতা মনিশংকর পাকিস্তানী কর্মকর্তার সাথে বৈঠক করার জন্য তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার অভিপ্রায়ে শাসক দল বিজেপি নেতা অজয় আগ্রাওয়াল এনআইএ’র সহায়তা চান। অধিকন্তু এনআইএ’র বর্তমান ডিজি যোগেশ চন্দ্র মোদি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতের লোক। যোগেশ চন্দ্র মোদি ভারতীয় সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক মনোনীত স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টীম-এর সদস্য ছিলেন। যে কারণে ২০০২ সালের গুজরাটের ভয়াবহ দাঙ্গার নায়ক হওয়া সত্ত্বেও এই যোগেশ চন্দ্র সেদিন নরেন্দ্র মোদিকে নির্দোষ প্রমাণে অনুঘটকের কাজ করেন, নরেন্দ্র মোদির প্রতিদ্বন্দ্বী হরেন পাণ্ডে হত্যা মামলা থেকে নরেন্দ্র মোদিকে মুক্ত করেছেন এই যোগেশ মোদি। প্রতিদ্বন্দ্বী হরেন পাণ্ডেকে ২০০৩ সালে গান্ধীনগরে হত্যার পেছনে নরেন্দ্র মোদির হাত ছিল বলে ধারণা করা হয়।
হরেন পাণ্ডে হত্যা মামলা চালনায় অনুপযোক্ততার জন্য গুজরাট হাইকোর্ট যোগেশ মোদিকে নিন্দা করে। পাণ্ডে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রিভেনশন অফ টেরোরিজম এ্যাক্ট (POTA) এর অধীনে ১২ জনকে অভিযুক্ত করলেও ২০১১ সালে গুজরাট হাইকোর্টে সকল আসামীকে খালাস প্রদান করা হয়।
২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বরের টাইমস অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্টে প্রকাশ, কংগ্রেসের উত্তরসূরী রাহুল গান্ধী মনে করেন, ভারতের সবচেয়ে বড় হুমকি হলো হিন্দু মৌলবাদ যা ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে মুসলিমদের সাথে বিরোধ সৃষ্টি করে। মুম্বাই হামলা থেকে শাকিল ভাটকল মামলা এবং সাম্প্রতিককালে মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণের নায়কদের অভিযোগ থেকে খালাস প্রদান এমনকি হাফিজ সাঈদ, সৈয়দ সালাহউদ্দিন কামরান ইউসুফের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা; সকল ক্ষেত্রেই হীনপ্রচেষ্টা ছিল মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি ও ভারতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে পাকিস্তানকে জড়িয়ে প্রোপাগাণ্ডা করা। সকল ক্ষেত্রেই এনআইএ’কে ব্যবহার করা হয়েছে নিরপেক্ষতার পরিবর্তে বিজেপি সরকারের অস্ত্র হিসেবে। সুতরাং এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, প্রকৃতপক্ষে মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণের নায়কদের মুক্তি দিয়ে বিজেপি কোয়ালিশনের উগ্রবাদীদের হাতের পুতুল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে এনআইএ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ