ঢাকা, মঙ্গলবার 4 September 2018, ২০ ভাদ্র ১৪২৫, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ক্রেডিট কার্ডে প্রতারিত হচ্ছেন গ্রাহকরা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : নিরাপদ কেনাকাটা কিংবা কোনো বিল পরিশোধ করতে ‘ইলেক্ট্রনিক মানি’ খ্যাত ক্রেডিট কার্ড অনেক সহজ ও নিরাপদ। বর্তমানে এ ধারার লেনদেনও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশে স্মার্ট লেনদেনে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করুন, খুব সহজে সবখানে নিরাপদে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে লেনদেন করা যায়। এমন বিভিন্ন চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। ব্যাংকের কর্তাব্যক্তিরাও ক্রেডিট কার্ডের সুবিধার কথা গ্রহকদের বুঝাচ্ছেন। নগদ টাকার বিকল্প হিসাবে ক্রেডিট কার্ডের সুবিধাও অনেক। নানান সুবিধা বিবেচনা করে গ্রাহকরা ক্রেডিট কার্ড নিচ্ছেন। কিন্তু গ্রাহকদের বুঝানোর সময় কিছু বিষয় গোপন রাখা হচ্ছে। আর এতে ফাঁদে পড়ে বিভিন্ন মাশুল দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। অনেক সময় গ্রাহকদের অজান্তে ঋণ বেড়ে যাচ্ছে চক্রবৃদ্ধি হারে। ব্যাংকগুলোর মার্কেটিং পলিসির কাছে হেরে গিয়ে কার্ড নিয়েছেন অনেক গ্রাহক। ব্যাংক তাদের সঙ্গে ‘শর্ত প্রযোজ্য’ দিয়ে ভয়াবহ প্রতারণা করছে। অনেকের কাছে এটি এখন আতঙ্কের বিষয়। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সময়ের ব্যত্যয় ঘটলেই ঘটবে বিপদ। অর্থাৎ সুদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে রয়েছে এক ধরনের শুভংকরের ফাঁকি। ব্যাংকগুলো ১৬ থেকে ৩৬ শতাংশ হারে সুদ নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে নিচ্ছে ৩০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না। ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত সুদ আদায় করায় সম্প্রতি ১৮টি ব্যাংককে শোকজ চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সূত্র জানায়, ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার কত হবে সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের মে মাসে একটি নীতিমালা দেয়। নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ব্যাংক যে সুদে ভোক্তা ঋণ দেয়, তাদের ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার তার চেয়ে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বেশি হতে পারবে। তবে বাস্তবে তেমনটা দেখা যাচ্ছে না।
জানা গেছে, অতিরিক্ত সুদের কারণে জনপ্রিয়তা না পেলেও ব্যাংকগুলোতে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবসা বেশ রমরমা। ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত মুনাফার জন্য বিভিন্নভাবে গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ঋণ নিতে উৎসাহিত করছেন। বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে ঋণও দিয়ে দিচ্ছেন। গত বছরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ঋণ দেয়ার পরিমাণ বেড়েছে ২৩০ কোটি টাকা। তবে চটকদার বিজ্ঞাপনে গ্রাহকরা বছরের পর বছর চরম প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। প্রায় প্রত্যেক ক্রেডিট কার্ডধারীরই এ বিষয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ সব কারণে বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড জনপ্রিয় হচ্ছে না বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা না মেনে ব্যাংকগুলো তাদের ইচ্ছা মাফিক সুদ ও অন্যান্য ফি আদায় করায় এমনটি ঘটছে। ব্যাংক ও ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুদের হারই ক্রেডিট কার্ডের একমাত্র ব্যয় নয়। সময়মতো মাসিক মূল্য পরিশোধ না করলে জরিমানা গুনতে হয়। এ জন্য সময়জ্ঞান না থাকলে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার বেশ বিপজ্জনক। ক্রেডিট কার্ড দিয়ে নগদ টাকা তুললে গুনতে হয় বাড়তি ফি।
নাম না বলার শর্তে কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি থেকে মুক্তি ও জামানত ছাড়া ঋণ সুবিধার কারণে তুলনামূলকভাবে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের চাহিদা বেশি। আবার উচ্চ সুদ হার ও নামে-বেনামে হিডেন চার্জ আরোপ করে ব্যাংকও ভালো আয় করে এই খাত থেকে। তারা বলেন, যেহেতু ব্যাংকগুলো জামানত ছাড়া ঋণ দেয়, সেহেতু এ খাতে ঝুঁকিও বেশি। এ কারণে ক্রেডিট কার্ডে অতিরিক্ত সুদ নেয় ব্যাংকগুলো। এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের হিডেন চার্জও নেয়া হয়। যদিও এটা ঠিক না।
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা জানান, ব্যাংকের মার্কেটিং প্রতিনিধিদের অনুরোধ ও তাদের বিভিন্ন সুবিধার অফারের প্রচারণায় ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক হবার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। ব্যাংকগুলোর মার্কেটিং পলিসির কাছে হেরে গিয়ে কার্ড নিয়েছেন অনেক গ্রাহক। ব্যাংক তাদের সঙ্গে ‘শর্ত প্রযোজ্য’ দিয়ে ভয়াবহ প্রতারণা করছে। ব্যাংকগুলো ১৬ থেকে ৩৬ শতাংশ হারে সুদ নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে নিচ্ছে ৩০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত। আর তাদের এ প্রতারণা থেকে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যাংকার, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা কেউই বাদ পড়ছেন না। এদের মধ্যে যারা একটু সচেতন, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হচ্ছেন। বাকিরা এ ক্রেডিট কার্ডের ফাঁদে অর্থদণ্ড দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ বিষয়ে একজন ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী বলেন, একবার ০৫ পয়সা বিল কম দেওয়ার জন্য ৫০০ টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছিল। কারণ ওই ব্যাংকের জরিমানা আদায়ের ন্যূনতম পরিমাণ ছিল ৫০০ টাকা।
জানা যায়, ব্যাংকাররা সব সময় বলে থাকেন যে ক্রেডিট কার্ডে আরোপিত সুদের হার হলো আড়াই থেকে তিন শতাংশ। কিন্তু এই সুদের হার যে মাসিক, এটা বলা হয় না। সাধারণত, সকল সুদের হার বাৎসরিক হিসাব করা হলেও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার মাসিক হিসাব করে অনেক ব্যাংক। এখানেই শুভংকরের ফাঁকি। এতে প্রতি মাসেই এ ঋণ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে। ব্যাংকগুলোতে ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে যে সুদ ঘোষণা করা হয় বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি হয়। কেননা টাকা আদায়ে তারা সাধারণত থার্ড পার্টি নিয়োগ করে থাকে। এ ছাড়া কোনো গ্রাহক যদি নির্ধারিত সময়ের ভেতর বিলের ৯০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করে দেন, তবু পরের মাসে পুরো টাকার ওপর পুরো মাসের জন্য সুদ আরোপ করা হয়। এ ছাড়া সার্ভিস চার্জ, নবায়ন ফি, পেনাল্টি চার্জগুলো তো রয়েছেই। পেনাল্টির ক্ষেত্রে বেশিরভাগই ঘটে গ্রাহকের অজ্ঞতার কারণে। আর ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে ইচ্ছা করেই গ্রাহককে এসব বিষয়ে সচেতন করা হয় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গত জানুয়ারি মাসের হিসাবে দেখা গেছে, ভোক্তা ঋণের চেয়ে প্রায় সবগুলো ব্যাংকেরই ক্রেডিট কার্ডের ঋণে সুদের হারের ব্যবধান ৫ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি। জানুয়ারি মাস শেষের হিসাবে দেখা গেছে, জনতা ব্যাংকের ভোক্তা ঋণে সুদের হার ১১ থেকে ১২ শতাংশ। অথচ ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার ২৪ শতাংশ। একইভাবে ব্যাংক এশিয়ার ক্রেডিট কার্ডে যেখানে সুদের হার ৩০ শতাংশ, সেখানে ভোক্তা ঋণে সুদের হার ৯ থেকে ১২ শতাংশ। ব্র্যাক ব্যাংকে ভোক্তা ঋণে সুদের হার ১০ থেকে ১৩ শতাংশ আর ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার ৩৩ থেকে ৩৬ শতাংশ। ঢাকা ব্যাংকে ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার ২৪ শতাংশ আর ভোক্তা ঋণে সুদ ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। এভাবে ইস্টার্ন, এক্সিম, মিডল্যান্ড, মার্কেন্টাইল, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, এনসিসি, স্টান্ডার্ড, ট্রাস্ট এবং প্রাইম ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার ৩০ শতাংশ। ওয়ান ব্যাংকে ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার সাড়ে ২৮ থেকে সাড়ে ৩১, মধুমতি ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৭ শতাংশ, এনআরবি ব্যাংকে ২৫, আইএফআইসি, যমুনা, মেঘনা, প্রিমিয়ার, শাহজালাল ইসলামী ও সাউথইস্ট ব্যাংকে ক্রেডিট কার্ডের সুদ ২৪, এনআরবি কমার্সিয়ালে সুদ ১৬ থেকে ৩০, দ্য সিটিতে এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে ২৫ শতাংশ। যা এসব ব্যাংকের ভোক্তা ঋণের সুদের হারের চেয়ে অনেক বেশি। এর বাইরে বিদেশী ব্যাংকগুলোতেও ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার ভোক্তা ঋণের চেয়ে বেশি। বিদেশী মালিকানার ব্যাংকগুলোর মধ্যে তিনটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে সুদের হার ২২ থেকে ২৫ শতাংশ আর কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ২১ থেকে ২৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ক্রেডিট কার্ডের ঋণ দেয়ার পরিমাণ বেড়েছে ২৩০ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকদের মাঝে ঋণ বিতরণ করেছে ৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকরা ঋণ নিয়েছিলেন ৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক ব্যাংক খাতের ঋণে সুদের হার যেখানে সিঙ্গেল ডিজিটে আনার কথা সেখানে ক্রেডিট কার্ড ঘোষণা দিয়ে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করছে ব্যাংকগুলো। এরপর ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে ক্রেডিট কার্ড সেবার বিপরীতে ২৭ থেকে ২৮ ধরনের ফি (মাশুল) নেয়া হচ্ছে। ব্যাংকভেদে ফি’র নাম ভিন্ন হলেও চার্জ কাটা হয় প্রায় একইহারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত সুদ আদায় করায় সম্প্রতি ১৮টি ব্যাংককে শোকজ চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডের সুদহার নীতিমালার আলোকে আদায় করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে ওই চিঠিতে।
উল্লেখ্য, কোনও ধরনের জামানত ছাড়া ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে একজন  গ্রাহককে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে ব্যাংক। এছাড়া, সহজে নগদায়ন করা যায় এমন ‘তরল জামানত’ থাকলে ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যায়। ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ৩১টি ব্যাংক গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ