ঢাকা, মঙ্গলবার 4 September 2018, ২০ ভাদ্র ১৪২৫, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পথে তিনি এগুচ্ছেন

গতকাল সোমবার নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবর্তে ‘একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার’ ইচ্ছারই প্রতিফলন হিসেবে দেখছে বিএনপি। নেপালে বিমস্টেক শীর্ষ সম্মেলন থেকে ফিরে রোববার সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন গতকাল সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের কাছে এক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য গোটা জাতিকে হতাশ করেছে। এখন তিনি (প্রধানমন্ত্রী) যে পথে এগুচ্ছেন সেই পথটা হচ্ছে, একদলীয় শাসন ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করার। জনগণের রায় নেওয়ার কোনো পথ আমরা দেখতে পারছি না এবং তার কোনো ইচ্ছা নেই। সকল দল সমান সুযোগ নিয়ে অংশগ্রহণ করবে সেই ইচ্ছাও তাদের নেই।
নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এসময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, এবিএম মোশাররফ হোসেন, আবদুস সালাম আজাদ, আসাদুল করীম শাহিন, মুনির হোসেন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন সংবিধান সম্মতভাবে হবে, এটা ঠেকানোর শক্তি কারো নেই- প্রধানমন্ত্রীর এই রকম বক্তব্যের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, এটা তো তিনি (শেখ হাসিনা) বলেই আসছেন।  এসব কথা বলেই তো তারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে চান, রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোকে ব্যবহার করে তারা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চান। জনগণকে এখানে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের যে সমস্ত ইভিল ডিজাইন আছে তাদের পরাজিত করবে।
আলোচনার পথ নাকচ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আপনাদের পথ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের সামনে এখন পথ জনগণ। জনগণই এর উত্তর দেবে। মির্জা ফখরুল বলেন, এটা বাস্তব কথা যে, এখন বড় সংকট সেটি হচ্ছে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটা অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন। যেটা গোটা দেশের মানুষের দাবি। সেই দাবিগুলোকে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) নাকচ করে দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, সংবিধান অনুযায়ী সবকিছু হবে। সংবিধান তো মানুষের  তৈরি করা। ইতিপূর্বে যে সংবিধান ছিলো সেটা তো তারাই পরিবর্তন করেছেন। সংবিধান তো অসংখ্যবার কাটছাঁট করে তারা তাদের সুবিধা মতো করে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, আজকে জাতি আশা করেছিলো বৃহত্তর জনগণের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, দেশে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করার স্বার্থে তারা  এই বিষয়গুলো নিয়ে ইতিবাচক কথা বলবেন এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব যেন সুষ্ঠুভাবে আসতে পারে সংসদ নির্বাচনে সেই ব্যবস্থা নেবেন। সেটা তারা করতে পারেননি। এই ব্যর্থতার দায়-দায়িত্ব তাদেরকেই  নিতে হবে।
বিরোধী দলের ওপর সরকারের দমননীতির সমালোচনা করে ফখরুল বলেন,  আজকে সমস্ত দেশে আবার ধরপাকড় শুরু করেছে, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার শুরু করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তারা একটা নির্বাচন করতে চান। তারা বলেন যে গণতন্ত্র আছে। এটা কোন গণতন্ত্র যে সব দিকে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হবে আর তারা নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাবেন। এভাবে তো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা জনগণের দাবি নিয়ে লড়াই করছি, সংগ্রাম করছি। এটা তো বিএনপির দাবি নয়, এটা জনগণের দাবি যে আমরা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাই, আমরা প্রতিনিধিত্বটা চাই যেটা সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্ব হবে, জবাবদিহিমূলক সংসদ হবে, সকলে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে জনগণের কাছে। সেই পার্লামেন্ট  তৈরি করার জন্যই আজকে আমরা কথা বলছি, আন্দোলন করছি, দাবি করছি। এর জন্যই আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে এবং এর জন্যই তারেক রহমান সাহেব দেশের বাইরে, হাজার হাজার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়ে আছেন, রাজনৈতিক কর্মী গ্রেপ্তার হয়ে আছেন। তারা তো সব বিএনপির নেতা-কর্মী নয়। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য জনগণই তাদের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং জনগণই একথাগুলোর জবাব দেবে।
বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না- প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, এর আগে ২০১২-১৩ সালেও তারা সংলাপের দাবি উপেক্ষা করেছিল, পরে সংলাপে বাধ্য হয়।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা জনগণের দাবি নিয়ে লড়াই করছি। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন, জনগণের রায় প্রদান, এসব তো বিএনপির দাবি নয়, জনগণের দাবি। আমরা জনগণের ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিতে লড়াই করে যাচ্ছি। আমরা সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব চাই, আর সেটি জনগণেরই দাবি। আমরা শুধু জনগণের দাবির প্রতি সমর্থন রেখে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংসদের জন্য আন্দোলন করছি। যেখানে সবাই জনগণের কাছে জবাব দিতে বাধ্য থাকবে। আর এ জন্য খালেদা জিয়া কারাগারে। বিরোধী রাজনৈতিক অনেক নেতাকর্মী কারাগারে আছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য জনগণই ব্যবস্থা নেবে, তারাই সেটির জবাব দেবে।
সরকারের প্রতিহিংসার আক্রোশের তারেক রহমান বিদেশে নির্বাসিত বলে মন্তব্য করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক চক্রান্তে প্রতিহিংসামূলকভাবে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানকে জড়ানো হয়েছে। ১/১১ সরকার যে মামলার অভিযোগপত্রে তার নাম দিতে পারেনি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সস্পূরক চার্জশিট দিয়ে তারেক রহমানের নাম দেয়া হয়েছে। এটা সরকারের প্রতিহিংসার চরিতার্থের নামান্তর। অর্থাৎ নির্দোষ তারেক রহমান আওয়ামী লীগের আক্রোশের শিকার। সারাদেশ দুঃশাসনের বন্দীশালায় পরিণত হয়েছে। এমতাবস্থায় আমরা সকলে জননেতা তারেক রহমানের কারামুক্তি দিবসকে স্মরণ করছি। আমি মনে করি তিনি কারামুক্ত নন, আসলে নির্বাসিত। এটা কারাবন্দি হওয়ারই আরেকটি নামান্তর। কারণ মিথ্যা মামলাগুলোতে তাকে দেশে আসতে বাঁধা দেয়া হচ্ছে -এটা পরিস্কার।
২০০৭ সালের ৭ মার্চ  ১/১১ এর সেনা সমর্থিত সরকার তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে। পরের বছরে ৩ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান স্বপরিবারে।
মির্জা ফখরুল বলেন, ২১ আগস্টের মামলায় পরপর তিনটি তদন্তে তারেক রহমানের নাম ছিলো না। পরবর্তিতে যে ব্যক্তিকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি করা হয়েছিলো কোনো প্রমাণ না রাখার জন্য তাকে ইতিমধ্যে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। ফাঁসির আগে পরবর্তিকালে সেই ১৬৪ সেই ব্যক্তি অস্বীকার করেছিলেন এবং প্রত্যাহার করে  নিয়ে ছিলেন সেটাও সেই আদালত গ্রহন করেনি।
খালেদা জিয়ার সাজার প্রসঙ্গে টেনে তিনি বলেন, দেশের বিপুল জনপ্রিয় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজকে মিথ্যা একটি মামলায় বেআইনিভাবে কারাবন্দি। হাইকোর্ট তাকে জামিন দেয়া হলেও তাকে মুক্ত করা হচেছ না। প্রতিহিংসামূলক এই সরকার দেশনেত্রীকে হয়রানি করার জন্য পরিকল্পিত আইনি প্রক্রিয়ার নামে তাকে সাজা করা হয়েছে। একব্যক্তির অদম্য ক্রোধ ও হিংসার চরম বর্হিপ্রকাশ ঘটেছে জাতীয়তাবাদী ঐক্যের প্রতীক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ওপর। তারেক রহমানের দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করেন বিএনপি মহাসচিব।
এর আগে গতকাল দুপুরে যুব ফোরামের উদ্যোগে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের মিলনায়তনে উন্মুক্ত ‘বাংলাদেশ ইয়থ পার্লামেন্ট বসে। এতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েকশ সদস্য অংশ নেন। তারা উন্মুক্ত এই সংসদের সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক দল, জাতীয় সংসদ, সংবিধান, ন্যায়পাল, গণভোট, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কিত নানা প্রস্তাব উত্থাপন করেন।  পরে প্রস্তাবগুলো উন্মুক্ত সংসদে কন্ঠভোটে দেয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।
অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এটা শুধু বাঙালির ক্ষেত্রে নয়, সারাদেশে অসংখ্য যুবকদের ক্ষেত্রে ঘটেছে, ঘটছে। অনেকে গুম হয়ে গেছে, অনেকে খুন হয়ে গেছে, অনেকে পঙ্গু হয়েছে, অনেকে পুত্র হারিয়েছে, সন্তান হারিয়েছে। ওই যে মা বসে আছেন, কিছুক্ষণ আগে চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো আর বলছিলেন আমার ছেলেটাকে অনেকদিন ধরে দেখিনি, আমার নাতী-নাতনীগুলোকে দেখিনি- এটা হচ্ছে বাস্তবচিত্র বাংলাদেশে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ দুই ভাগ হয়েই আছে। এক দল অত্যন্ত সুবিধা পাচ্ছেন, আরেক দল সুবিধা বঞ্চিত। সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য তো এ  দেশ সৃষ্টি করা হয়েছিলো। দুর্ভাগ্য আমাদের আজকে গুটিকতক লোকের হাতে সেই সুযোগগুলো চলে গেছে। তাদের বক্তব্যের মধ্যে, চলার মধ্যে সেই দাম্ভিকতা প্রচন্ডভাবে বেড়ে চলেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে যুব সমাজকে ‘ঘুরে দাঁড়ানো’র  আহবান জানান বিএনপি মহাসচিব।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা জি এম রাব্বানীর (নয়ন বাঙালি) ওপর নির্মম নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নয়ন বাঙালি যুবকদের কথা বলতে গিয়ে, একটা সৃজনশীল সমাজের কথা বলতে গিয়ে, একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলতে গিয়ে তাকে নির্যাতিত হতে হয়েছে। জীবনের হুমকির কারণে তাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে।
সংগঠনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম মুনিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানের  বিদেশ থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জিএম রাব্বানী (নয়ন বাঙালি) অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম মুনির ও সোহান হাফিজ শাহকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটির নাম ঘোষণা দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ