ঢাকা, মঙ্গলবার 4 September 2018, ২০ ভাদ্র ১৪২৫, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মালিক পক্ষের প্রস্তাবকে সমর্থন করছে না গার্মেন্ট শ্রমিকরা

গতকাল সোমবার মজুরি বোর্ডের সামনে আন্দোলনরত গার্মেন্ট শ্রমিক সংগঠনসমূহের উদ্যোগে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুুরি ১৬,০০০ টাকা ঘোষণার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয় -সংগ্রাম

মুহাম্মদ নূরে আলম: গত ৮ মাস ধরে পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিতে কাজ করছে মজুরি বোর্ড। এরই মধ্যে ন্যূনতম মজুরি প্রস্তাবও করেছে শ্রমিক-মালিক, দুই পক্ষই। তবে, মালিক পক্ষের প্রস্তাবকে কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য বলছেন না শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা শ্রমিক সংগঠন ও গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউড অব লেবার স্টাডিস- বিলস। বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা। গত জুলাই মাসে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সভায় পোশাকশিল্পের মালিকেরা মজুরি মাত্র ১ হাজার ৬০ টাকা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দেন। সব মিলিয়ে তাঁরা মজুরি ৬ হাজার ৩০০ টাকা দিতে চান। অন্যদিকে শ্রমিকপক্ষ ১২ হাজার ২০ টাকা মজুরি দাবি করেছে।
শ্রম মন্ত্রণালয় গত ৩১ জানুয়ারি পোশাকশিল্পের মজুরি বোর্ড গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। ১৬ জুলাই তৃতীয় সভায় নিজেদের মজুরি প্রস্তাব দেয় মালিক ও শ্রমিকপক্ষ। কম মজুরির প্রস্তাবের পক্ষে মালিকপক্ষ লিখিত যুক্তি দিয়েছে, প্রতিযোগী অন্য দেশের চেয়ে পোশাক শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কম। উভয় পক্ষের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ১৬ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে মানববন্ধন ও সভা-সমাবেশ করছে।
এদিকে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় মজুরি সবচেয়ে কম গার্মেন্টস শ্রমিকদের। বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশ। আবার কম মজুরি দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ দ্বিতীয়। শ্রীলঙ্কার শ্রমিকেরা সবচেয়ে কম মজুরি পান, মাসিক ৬৬ মার্কিন ডলার। তারপর বাংলাদেশে ৬৮ ডলার। শ্রমিকের মজুরি সবচেয়ে বেশি তুরস্কে, ৫১৭ ডলার।
২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমনটাই উঠে এসেছে। সেই প্রতিবেদনে শীর্ষ ২০ পোশাক রপ্তানিকারক দেশের শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি উল্লেখ ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী চীনে ন্যূনতম মজুরি ১৫৫ ডলার, ভিয়েতনামে ১০০, ভারতে ৭৮ ডলার, কম্বোডিয়ায় ১২৮, পাকিস্তানে ৯৯ ডলার, ফিলিপাইনে ১৫০ ডলার। আর গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউড অব ডেভেলাপমেন্ট স্টাডিস-বিআইডিএস সূত্র বলছে, সর্বনিম্ন মজুরি ৮ হাজার টাকা করা হলেও মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় প্রকৃত অর্থে এক টাকাও বাড়বে না শ্রমিকদের বেতন। জীবন যেখানে যেমন। রাজধানীর বাসিন্দা এখানকার ৫ পরিবারের সদস্য। যাদের জন্য রান্না হয় একটি চুলায়, যারা দরকারি নানা কাজ সারেন একটি গোসলখানায়। এই মানুষগুলোর প্রতিদিনের শুরু একইভাবে, জীবিকার তাগিদে দিন কাটে ঘড়ি ধরে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।
 দৈনন্দিন আয়-ব্যয়ের হিসাবে কতটুকু সচ্ছল তারা? যখন উন্নয়নশীল দেশের প্রাথমিক স্বীকৃতি পাওয়া এই দেশে মাথাপিছু আয় ১৭শ’ ১০ ডলার অর্থাৎ বাৎসরিক গড় আয় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। গার্মেন্টস শ্রমিকদের একজন বলেন, ‘নয় বছর হলো চাকরি করি। বেতন মাসে ৭ হাজার টাকা। ওভারটাইম মাসে ৫০ থেকে ৬০ ঘণ্টা হয়। আরও এক শ্রমিক বলেন, আমরা ৮ জন মানুষ সংসারে। আমার বড় ছেলে আর আমি চাকরি করি। বেতন না বাড়ালে চলবে কি করে।’
বলা হয়ে থাকে, সবচেয়ে সুশৃঙ্খল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত তারা। তাদের হাতেই ঘুরে রফতানির চাকা। পোশাক শিল্পের এই কারিগরদের মজুরি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যেখানে স্বতঃস্ফূর্ত মালিকপক্ষও। বিজিএমইএ বলেন, ‘সবকিছু হিসাব করলে দেখা যায় ২৬ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পায়। সেখানে আমরা ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছি।’
তবে, মালিকপক্ষের এই প্রস্তাবকে গ্রহণযোগ্য বলছে না বিলস। তাদের যুক্তি, সর্বশেষ ২০১৩ সালে মজুরি নির্ধারণকালে ৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির যে বিধান রাখা হয়, তাতে ৫ বছরের ব্যবধানে সর্বনিম্ন বেতন ৫ হাজার ৩৬০ টাকা এমনিতেই দাঁড়িয়েছে ৬,৪৬০ টাকায়, যা মালিকপক্ষের প্রস্তাবিত বেতনের চেয়ে ১শ’ টাকা বেশি। বিলসের দাবি, প্রতি গ্রেডেই কম বেতন প্রস্তাব করেছে বিজিএমইএ। বিলসের সূত্রে জানাযায়, ‘এখন যা মজুরি হয়েছে তার থেকে কেন কম দেয়া হবে। মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে বেতন পুনঃনির্ধারণের জন্য। আমি সবকিছু বিবেচনা করে বলতে পারি এই প্রস্তাব গৃহীত হতে পারে না। শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন দাবি, ১২ হাজার টাকা। আর গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলছে, ঢাকায় রেডি মেইড গার্মেন্টস কারখানার সখ্যা ৩ হাজার ২১৯, চট্রগ্রামে ৫২৮ টি কারখানা রয়েছে, যেসব কারখানায় প্রায় ৪৪ লাখ শ্রমিক কাজ করে। শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরির ক্ষেত্রে অনেকটা উদারতার পরিচয় দিয়েছে শ্রমিকপক্ষ। সিপিডির গবেষণা বলছে, ‘দেখা গেছে শ্রমিকদের মাসিক ব্যয় তাদের মজুরি থেকেও বেশি।’
উর্ধমুখী ব্যয়ের বাজারে জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হবে, সেই পরামর্শ বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা- বিআইডিএসের। বিআইডিএসর একজন গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা গবেষণা করে দেখেছি ৮ হাজার টাকা বেতন কোন বৃদ্ধি নয়। মজুরি বৃদ্ধি হতে হবে সত্যিকার অর্থে। ৪৪ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত যে খাতে, এবার সেই খাতের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের মধ্য দিয়ে সস্তা শ্রমের তকমা থেকে বেড়িয়ে আসবে দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প; সেই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ