ঢাকা, মঙ্গলবার 4 September 2018, ২০ ভাদ্র ১৪২৫, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নতুন ধরনের নেশাদ্রব্য‘এনপিএস’ বা ‘খাট’ ভাবাচ্ছে সবাইকে

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ‘নিউ সাইকোট্রফিক সাবটেনসেস’ বা ‘এনপিএস’। এক ধরনের বিকল্প নেশাদ্রব্য। কাথ শ্রেণিভুক্ত এক ধরনের উদ্ভিদ থেকে তৈরি এই নেশাদ্রব্য আফ্রিকার দেশগুলোতে বহু আগে থেকেই প্রচলিত। তবে ইদানিং বিভিন্ন দেশে হেরোইন বা ইয়াবার মত মাদকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ভেষজ নেশার পাতা। গত শুক্রবার রাজধানী ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো গুদাম এবং শান্তিনগরের এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে আটশ কেজি এই নেশাদ্রব্য উদ্ধার করেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর,তাদের ভাষায় যা বাংলাদেশে ‘নতুন’।এই নতুন নেশাদ্রব্যের বড় চালান ধরা পড়ার পর তার নামের সাথে পরিচিত হয়েছে বাংলাদেশ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্টদের ভাবাচ্ছে এই নতুন নেশাদ্রব্য।
উইকিপিডিয়া ঘেটে দেখা গেছে, হর্ন অব আফ্রিকা ও আবর উপ-দ্বীপাঞ্চলে জন্মায় গুল্ম জাতীয় এই মাদক। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘কাথা ইডুলিস’, যদিও স্থানীয়ভাবে একে খাট, কাট, খাত, ঘাট, চাট, অ্যাবিসিনিয়ান টি, সোমালি টি, মিরা, অ্যারাবিয়ান টি ও কাফতা নামেও ডাকা হয়।
খাটে অ্যালকালোইড ক্যাথিনন নামক এক ধরনের উদ্দীপক উপাদান থাকে, যার কারণে উত্তেজনা বাড়ে, ক্ষুধা কমে যায় এবং শরীরের উষ্ণতায় তারতম্য ঘটে। আমেরিকান কোকো পাতা, এশিয়ান পানের মতোই স্থানীয়দের মধ্যে হাজার বছর ধরে এই নেশাদ্রব্যের শুকনো পাতা চিবিয়ে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।
তবে এর আসক্তি খুব ভয়ঙ্কর। খাটের কারণে অবসাদ, দৃষ্টিভ্রম, অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দাসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে৷। বেশি রস চিবিয়ে নেশা করলে বিপদও মারাত্মক। বিশেষজ্ঞদের বলছেন, ‘দাঁত এবং মাড়িতে ঘা হতে পারে। এ ছাড়াও, ইন্দ্রিয় শক্তি এবং যৌনক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খাট জীবনী শক্তিও কমিয়ে দেয়।’
১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) একে মাদকদ্রব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। কানাডা, জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে এটি অবৈধ না হলেও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ইসরাইলে এই উদ্ভিদের পাতা ওষুধ তৈরিতে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। তবে মাদক নিয়ন্ত্রক সংস্থা- ডিইএ একে ক্ষতিকারক হিসেবে সতর্ক করেছে।
অপরদিকে আফ্রিকার দেশ জিবুতি, কেনিয়া, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া এবং ইয়েমেনে এর উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় এবং অবাধে সেবনের বৈধতা রয়েছে।
সোমালিয়ার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সোমালিল্যান্ডের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ ‘খাট’ এ আসক্ত। তাদের মতে, ‘খাট মদের চেয়েও ভালো। এই নেশা শক্তি যোগায়। এটা নেয়ার পর স্বাভাবিকভাবে কাজ করা যায়।’
 সোমালিল্যান্ডের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং জনজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে এই নেশাদ্রব্য। প্রতিদিন এর পেছনে ১ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় ৯ লক্ষ ৩০ হাজার ইউরো খরচ করে সেখানকার মানুষ।
দশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোমালিল্যান্ডের বার্ষিক বাজেটের ২০ শতাংশই আসে খাট খাত থেকে। সোমালিল্যান্ডে বছরে ৫২৪ মিলিয়ন ডলারের খাট বিক্রি করে ইথিওপিয়া।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ইথিওপিয়া থেকে বাংলাদেশের নওয়াহিন এন্টারপ্রাইজ নামের এক কোম্পানির ঠিকানায় গত ২৭ অগাস্ট একটি পার্সেল পাঠানো হয়। ওই পার্সেলে মাদক আসছে বলে বাংলাদেশকে আগেই সতর্ক করে দেয় আন্তর্জাতিক একটি মাদকবিরোধী সংস্থা। মো. নাজিম (৪৭) নামের এক ব্যক্তি শুক্রবার দুপুরে ওই পার্সেল নিতে শাহজালালের কার্গো ভিলেজে এলে তাকে আটক করেন মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা। পরে পার্সেল থেকে পাওয়া যায় চারশ কেজি ‘এনপিএস’।নাজিমকে গ্রেপ্তারের পর তাকে নিয়ে শান্তিনগরের নওশীন এন্টারপ্রাইজে অভিযান চালান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। সেখানে পাওয়া যায় আরও সাড়ে চারশ কেজি একই ধরনের নেশাদ্রব্যের মজুদ।কর্মকর্তারা বলছেন, দেখতে চায়ের পাতার মত এই নেশাদ্রব্য আনা হয়েছে গ্রিন টির মত প্যাকেটে করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নাজিম দাবি করেছেন, এগুলো চা বলেই তিনি জানতেন; মাদক হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি তার জানা ছিল না। ইথিওপিয়ার এক লোকের সঙ্গে তার চুক্তি ছিল, সেখান থেকে ঢাকায় পাঠানো চালান তিনি আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। সেজন্য প্রতি ২০০ কেজিতে তিনি ৮০০ ডলার করে পাবেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কেমিকেল এক্সামিনার আবু হাসান বলেন, "বাংলাদেশে এই ধরনের নেশাদ্রব্য নতুন। এক সময় আফ্রিকার দেশগুলোতে ব্যবহৃত হলেও ইদানিং এ নেশা ইউরোপ, আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে।”শুকনো ওই নেশার পাতা মুখে নিয়ে চিবিয়ে আবার কখনও পানির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া হয়। ওই পাতায় থাকা ক্যাথিনোন ও ক্যাথিন অ্যালকালয়েড থাকে বলে ইয়াবার মতই নেশা হয় বলে আবু হাসান জানান।তিনি বলেন, “এই নেশাদ্রব্য যৌন উদ্দীপনা বাড়াতে বা দীর্ঘ সময় জেগে থাকতে সাহায্য করে বলে ধারণা করা হয়। তবে এটি সেবনে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”
 দেশে গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঘোষণা দিয়ে এক যুদ্ধে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নেশায় বুদ হয়ে থাকা প্রজন্মের মুক্তির প্রতিজ্ঞায় ‘মাদক বিরোধী’ সে যুদ্ধ এখন পর্যন্ত সফল বলে জানাচ্ছেন তারা।যদিও মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে গত ১৫ মে থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত মাদক বিরোধী অভিযানে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে ২০২ জন। জেলে আটক রয়েছে আরো কয়েক হাজার মাদক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
তা সত্ত্বেও দেশে মাদক আসার পথ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার নজির দেখা যাচ্ছে না, যার প্রমাণ মেলে গত শুক্রবার  নতুন মাদকের চালান  জব্ধের পর।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম শিকদার বলেন, আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া থেকে ইতিহাদ বিমানের একটি ফ্লাইটে করে নতুন মাদকের এই চালানটি ঢাকায় আসে।‘এটি দেখতে অনেকটা চায়ের পাতার মতো। এক ধরনের গাছ থেকে এনপিএস তৈরি হয়। পানি বা তরল জিনিসে মিশিয়ে এটি সেবন করলে মানবদেহে এক ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এই মাদকটি ইয়াবার মতো কাজ করে।’ এনপিএস মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের তফসিলের ‘খ’ ক্যাটাগরির মাদক বলেও জানান তিনি।এই মাদকটি গ্রিন-টি’র আদলে বাংলাদেশে আনা হয়। পরে এগুলো দেশে বিক্রির পাশাপাশি অন্য দেশেও পাচার করা হবে। এজন্য বাংলাদেশকে পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

দেশে প্রতিকেজি ১৫ হাজার চা হিসেবে বিদেশে পাচার
দেখতে অবিকল চা-পাতার গুড়ার মতো। প্রতিকেজি ১৫ হাজার টাকা দামে বিক্রি হওয়া এই পাতা নিশ্চয়ই চা নয়। এটি দেশে নতুন আমদানি হওয়া এক ধরনের মাদক। আমদানি হওয়া এই মাদক দেশের বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছিল একটি চক্র। এছাড়া নতুন মোড়কে ভরে ‘গ্রিন টি’ হিসেবে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পাচার করে আসছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে উৎপাদন না হয়েও বাংলাদেশি পণ্য হিসেবে ইউরোপ-আমেরিকার দেশে রফতানি হচ্ছে এই মাদক। ইথিওপিয়া থেকে অন্তত চার-পাঁচটি দেশ ঘুরে বাংলাদেশে আসে।
অভিযানের বিষয়ে অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, ২৩ আগস্ট থেকেই আমাদের এই অভিযান শুরু হয়। চালানটি ইথিওপিয়া থেকে সিঙ্গাপুর, দুবাই হয়ে ২৭ আগস্ট ঢাকায় আসার কথা ছিল। ইতিহাদ এয়ারওয়েজের যে ফ্লাইটে করে ২৭ আগস্ট ঢাকায় আসার কথা ছিল সেই ফ্লাইট ঢাকায় এলেও চালানটি আসেনি। চোখ ফাঁকি দিতে চালানটি মালয়েশিয়া, ভারত, পরে আবার সিঙ্গাপুর, দুবাই ঘুরে ৩০ আগস্ট ইতিহাদ এয়ারওয়েজের আরেক ফ্লাইটে করে ঢাকায় আসে।
দেশে এই মাদক নতুন বলে এর বাজার অল্প, মূলত রফতানির উদ্দেশ্যেই এগুলো আমদানি করা হতো। ঢাকায় এনে এক/দেড় কেজি করে নিজস্ব ব্র্যান্ডের চায়ের প্যাকেটে ভরা হতো। এরপর গ্রিন-টি হিসেবে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পাঠাতো নাজিম। এছাড়া চাহিদা অনুযায়ী দেশের বাজারে প্রতিকেজি ১৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করতেন। তিনি এ পর্যন্ত ৪-৫টি চালান দেশে এনেছেন এবং দু’টি চালান বিদেশে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশে আরো বেশ কয়েকজন এ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন ধরা পড়া নাজিম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ