ঢাকা, মঙ্গলবার 4 September 2018, ২০ ভাদ্র ১৪২৫, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কুয়াশায় ঘেরা একাদশ সংসদ নির্বাচন

রহিমা আক্তার মৌ : সমালোচিত দশম নির্বাচন এর মেয়াদ শেষ পর্যায়ে, বিদায়ী ঘন্টা কড়া নাড়ছে রাজনীতির দরজায়। কি হতে চলছে একাদশ সংসদ নির্বাচনে, নবম নাকি আবারও দশম সংসদ নির্বাচনের পথে হাঁটবে আমাদের প্রতীক্ষিত নির্বাচন। সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই অজানা নানা শঙ্কা ডালপালা মেলছে সাধারণ আমজনতার মনে। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপি কি ক্ষমতাসীনদের সব দাবী মেনে নিয়ে নির্বাচনে আসবে নাকি আবারও নির্বাচন বয়কটের কথা ভাবছে। না কোন মুখে না না কথা বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়াইয়ে শরিক হবেন। এসব না হলে তবে কি বিএনপিসহ সব দলের অংশ গ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে ক্ষমতাসীনরা, নাকি বিদ্যমান সংবিধানে বাতলে দেওয়া পথেই থাকবে। এও শোনা যাচ্ছে বিএনপি এবার নির্বাচনে অংশ না নিলে আর অংশ নিতে পারবে না।
গত ৬ জুলাই ২০১৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি’ শীর্ষক এক গণবক্তৃতার আয়োজন করা হয়। রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট ও জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রিয়াজ। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা যায়। তবে দেখার বিষয় হলো, সরকার এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ওই বক্তব্যকে কতটা গুরুত্ব দেন এবং সংকটকে কতটা উপলব্ধি করেন।
আলী রিয়াজ তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, “অতীতে বাংলাদেশ যত ধরনের রাজনৈতিক সংকট বা অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করেছে, এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার চেয়ে ভিন্ন এবং গভীর। এখন দেশের রাজনীতিতে যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তা আসলে হাইব্রিড রেজিম বা দোআঁশলা ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় দৃশ্যত গণতন্ত্রের কিছু কিছু উপাদান থাকলেও সেগুলো প্রধানত শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। ফলে রাষ্ট্রের নিপীড়ক যন্ত্রগুলো আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে এবং তাদের এক ধরনের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। তিনি আরো বলেন, এক সময় যে প্রাণবন্ত সিভিল সোসাইটি ছিল এখন তার চিহ্ন পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই। গত এক দশকে সিভিল সোসাইটির বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচারণা চালানো হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে নির্বাচনকে জবাবদিহির একমাত্র ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। যেহেতু নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেহেতু আর সব ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা চূর্ণ করে ফেলাই হচ্ছে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার উপায়।”
প্রশ্ন, বিএনপি কি আসছে? ক্ষমতাসীনরা কি মেনে নিবে বিএনপির দাবী? সব দলের অংশ গ্রহণেই কি হচ্ছে একাদশ নির্বাচন?
এসব প্রশ্নের জবাব এখনো অজানা থাকায় নির্বাচনের আকাশ এখনো কুয়াশায় ঘেরা। সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা কোনদিকে যাচ্ছে বলা মুশকিল, কারণ এখন পর্যন্ত এই দুই দল নিজেরা নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধী দলে থেকে মন্ত্রিত্ব পাওয়া জাতীয় পার্টি তো সুযোগে সৎ ব্যবহার করা আর পাওয়ার অপেক্ষায়। তরল পদার্থের মতো যে পাত্রে থাকে সে পাত্রের আকার ধারণ করে। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ একটি টিভি চ্যানেলের অনলাইনের সঙ্গে সাক্ষাতকারে বলেন, বেগম খালেদা জিয়া যে মাপের নেত্রী তার ভাগ্য আদালত কিংবা একটি নির্বাহী আদেশ বা কোনো কলমের খোঁচায় নির্ধারিত হয় না। সেরকম চেষ্টা ওয়ান ইলাভেনের সময়ও দেখা গেছে কিন্তু তারা সফল হননি।
খালেদা জিয়ার মতো নেত্রীকে যখন রাজনৈতিক মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয় তখন বুঝতে হবে যে, বিএনপি বা ২০ দলীয় জোটকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার জন্য সরকারের সবকার্ড শেষ হয়ে গেছে। সরকার বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেই বেগম জিয়াকে জেলে পাঠিয়েছে। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিএনপিই লাভবান হয়েছে। একইসঙ্গে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেয়েছে।”
এমন বক্তব্য শুনলে ভাবতেই হয় কথাগুলো বলেছেন কার পক্ষ হয়ে নাকি নিরপেক্ষ বক্তা হিসাবেই বলে গেলেন। বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি, সহিংসতা ব্যাপক বিস্তারের যে সব ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করছি অতীতে, তা আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছে অনেকেরই। রাজনীতিবিদদের কাছে দেশের চাইতে দল বা ক্ষমতা বড় হয় উঠলে জাতীয় সংকট ক্রমে ঘনীভূত হয়ে ওঠে। এমন অবস্থায় অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেন সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা। দেশে ক্ষমতা প্রেমীদের চেয়ে দেশপ্রেমীদের প্রয়োজন বেশি। হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিশোধ স্পৃহা ও ক্ষমতালিপ্সার কারণে অতীতে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে রাজনীতিবিদদের।
বাংলাদেশের একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে এই শঙ্কা বা অনিশ্চয়তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ধ্বনিত হচ্ছে বিদেশেও। যুক্তরাজ্য তাদের এক বার্ষিক প্রতিবেদনে আগামী নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশে সংঘাতময় পরিস্থিতির আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছে।
আর প্রতিবেশি দেশ ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও ঢাকা সফরে এসে বলেছেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ, তাই ভারতও চায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক।’ একই সঙ্গে তিনিও আগামীতে বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ওপর জোর দিয়ে গেছেন।
জনগণ ক্ষমতাসীনদের মুখে প্রতিনিয়ত শুনছে আইন তার নিজের গতিতে চলে। উনারা আরো বলেন, আইনের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। জনগন সরকারের কথা শুনে কিন্তু কতটা বিশ্বাস করে তা সরকার যেমন জানতে চায় না, জনগন ও বলার পথ পায়না, মাঝ পথে সবই কুয়াশা। বিএনপি নেত্রীকে রাজনৈতিক মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি সম্পূর্ণই রাজনৈতিক। এটা সরকার যেমন জানে, তেমনি জানে বিএনপি জাতীয় পার্টি সহ সব রাজনৈতিক দলের লোকেরা। বলতেই হয় ক্ষমতাসীনদের তৈরি আইনের ঘরেই বন্ধি বিএনপি নেত্রী।
নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট এক ধরনের এই অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের আশঙ্কা সাধারণের। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক ভবিষ্যত্বাণী করা কঠিন। কী হবে, কী হবে না- আগে থেকে চূড়ান্ত করে বলা সম্ভব হয় না। কারণ এখন যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিরাজমান, শেষ বেলায় সে রকম না-ও থাকতে পারে। অপেক্ষার পালা শেষ ঘন্টা অবধি।
লেখক : সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ