ঢাকা, মঙ্গলবার 4 September 2018, ২০ ভাদ্র ১৪২৫, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দৃষ্টিভঙ্গী

সুলতানা সিমু : *** খুব শালীনভাবে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া যে মেয়েটিকে দেখলে শ্রদ্ধাবোধ জাগতো, ২ দিন পর রেপ হওয়ার পর তাকে তুচ্ছ করে গালি দিতেও আমাদের বাধে না। খুব সুন্দর করে অট্টহাসি দিয়ে বলে ফেলি “এতো রাতে বাড়ি ফিরলেতো এমনই হবে, দোষতো শুধু ছেলেদের না। তাই না?? বাহ! এখানেই নির্মমতা জয়ী আর পর্দার আড়ালে আটকা পড়ে একটি মেয়ের অশ্রুসজল দুটি চোখ, যে  সারাদিন ক্লাস শেষে নিজের ছোট্ট ভাইবোনের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটানোর জন্য সন্ধ্যা থেকে অনেক রাত পর্যন্ত টিউশনি করত।
*** পুলিশ কন্সটেবলের বাড়ির পাশে সেদিন একটি টোকাই এসে ছেঁড়া জুতা জোড়া চুরি করেছে বলে ইচ্ছেমত মাইর দিলেন তিনি। আহা! চুরির সাজা দিলেন তিনি। চারপাশের মানুষকে বুঝাতে হবে না কত যোগ্য তিনি?? আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে হাজির হলেন ডিউটিতে। অসহায় মেয়েটি থানায় ৫ম দিনের মতো এসেছিলো মামলা দেয়ার জন্য। ৫ হাজার টাকা নিয়ে আধা ঘন্টা বসিয়ে রেখে বাড়ি চলে যেতে বললেন ওই আইনের বাহক। আর তা দেখে বিবেক যখন হাসে ঠিক তখনই সমাজটা চোখ ঘুরিয়ে বলে, উনিতো ন্যায়বিচারও করেন। দেখোনি ওইদিন টোকাইটাকে কি আচ্ছা মাইর দিলো!!! এখানেই আমাদের জীবনের ব্যর্থতা।
*** সারাক্ষণ লেবুর শরবত  তৈরী করে রাখা আর সন্তানের এতো বেশি রাতজাগা নিয়ে চিন্তিত মাতাও যখন মেয়েটি মেডিকেলে পযধহপব পায় না তখন বলেন, “ব্যর্থ তুমি। কি করলে জীবনে?? কি দিলে আমাদের এতো এতো কষ্ট-এর মূল্য?” এতো কটু কথা আর স্বপ্ন ভঙ্গের পরিতাপ নিয়ে যেই না মেয়েটি গলায় ফাঁস দেয় আমাদের ভদ্র সমাজ বলে ফেলে, “ছিঃ, আত্মহত্যা মহাপাপ।” এখানেই বাস্তবতা ঘোমটা দিয়ে কাঁদে।
*** প্রেম হাফ সেঞ্চুরি করা ছেলেটিও বিয়ের আগে হবুবধূর কেরেক্টার সার্টিফিকেট খুঁজে। ছেলেটিকে যদি প্রশ্ন করা হয় তোমার কেরেক্টার সার্টিফিকেট কই??? ছেলেটার উত্তরের আগেই সমাজ বলে, “আরে সেতো ছেলে!” আমাদের চারিত্রিক শুদ্ধতা এখানেই পংকিলতাময়।
*** গত কয়েকদিন ধরে কালো বলে কি ভাবে বিয়ে দিবে সেই নিয়ে চিন্তিত ভাইটিও দিনশেষে স্বপ্ন দেখে তার হবুবউ হবে হুরের মতো। এখানেই আমাদের চিন্তাশীলতা মুক্ত, স্বাধীন।
*** সারাদিন গার্লস স্কুলের পাশে দাঁড়িয়ে টিজ করা ছেলেটিও বছর শেষে বোনকে সেই স্কুলে ভর্তি হওয়া না হওয়া নিয়ে মায়ের সাথে তর্ক করে। যদি প্রশ্ন করা হয়, কেন দিবেন সেই স্কুলে? ভাইটি হাসি দিয়ে বলে, “আরে বইলেন না ওই স্কুলে আসা যাওয়া রাস্তাটা খুব খারাপ। মেয়েদের খুব সমস্যা হয়। বখাটেরা অনেক টিজ করে। প্রায় মেয়েই কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে। আমি আমার বোনের কান্না সহ্য করতে পারবো না”।
যদি পুনরায় প্রশ্ন করা হয়, “আপনিতো সারাদিন ওই রোডেই থাকেন।” ভাইটি যখন লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করবে তার আগেই সমাজ গলা উঁচিয়ে বলে, “এতো পেছাচ্ছো কেন?? প্রত্যেক ভাইয়েরই দায়িত্ব নিজের বোনের সেইফটি দেওয়া। এখানেই আমাদের ভাইদের দায়িত্বানুভূতি জয়ী।
*** সারাদিন ফোন নিয়ে বিজি মেয়েটি যখন মুখ তুলে তাকায়, সমাজ বলে ফেলে, “তুমি না পর্দা করো?? ইসলামিক মাইন্ডের?? তো সারাদিন ফোন নিয়ে কি করো?? কার সাথে কথা বলো??” কিছু না বলে হাজার মেয়েকে আলো দেখানো ধ্রুবতারাটি যখন মাথা নিচু করে দু’ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন করে তখনই আমাদের সন্দেহপ্রবণতা মিটিমিটি হাসে।
*** খুব অসুস্থ বোনটি যখন তার ভাইয়ের কাঁধে মাথা ফেলে রিক্সা দিয়ে যায়, সারাদিনের ক্লান্ত গৃহ বধূটিও কাপড় রোদে দিতে দিতে রহস্যপূর্ণ চোখে তাকায়। যদি প্রশ্ন করা হয়, “এভাবে কি দেখছে?? ভাইওতো হতে পারে?? বধূ ভাবোদয় হওয়ার আগেই সমাজ বলে, “আহা। ভাই না। ভাইয়ের কাঁধে কেউ এইভাবে মাথা দেয়??” এখানেই আমাদের পারস্পারিক সহমর্মিতা কাঁথা মুড়ি দেয়।
*** কয়েক বছর ধরে চাকরি খোঁজা ছেলেটি যখন সারাদিনের ভাইবা শেষে ক্লান্ত হাতে ফাইলগুলি ছুঁড়ে মারে ঠিক তখনই বাবা এসে বলে, “কিরে কেমন হলো ইন্টার্ভিউটা??” মুখে ক্লান্তির চাপ রেখে বললো, “বাবা কিছু টাকা হলেই হয়ে যাবে।” “টাকা! অসম্ভব। আমি কখনোই ঘুষ দিবোনা।” “বাবা সবাইতো দেয়।” “সবাই অন্যায় করলে তুমিও করবে?? “লজ্জায় যেই না ছেলেটি অনুতপ্ত হতে যাবে সাথে সাথেই সমাজ বলে উঠে, “আজকাল চাকরি সোনার হরিণ। যেভাবেই হোক পেতেই হবে তাকে। তার জন্য না হয় কিছু ঘুষ দিলাম! সমস্যা কোথায়!” এখানেই প্রতিবাদ করার মুখগুলি নির্বাক।
এগুলি নিছক কোন ঘটনাই নয়, আমার আপনার সাথে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া বাস্তবতা এইগুলি। প্রত্যেকটার পেছনে দোষী দৃষ্টিভঙ্গী নামক বাংলা পরিভাষাটি। আমাদের সহজাত প্রবণতাই হয়ে দাঁড়িয়েছে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নামক ব্যাধিটি।
সমাজে এটি মহামারী আকার ধারণ করেছে। এর প্রতিরোধ করার সময় অনেক আগেই শেষ। এখন সময় প্রতিকারের। এই ব্যাধির লক্ষণস্বরূপ আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলি নষ্ট হচ্ছে। যার ফলাফল পারিস্পারিক ভারসাম্যহীন সম্পর্ক, বিশ্বাসহীনতা, সন্দেহপ্রবণতা, রেসিজম, বন্ধুত্বসুলভ আচরণের অভাব, স্বার্থপরতা, অকৃজ্ঞতা, প্রতিবাদী মনোভাব হ্রাস, হীনম্মন্যতা ও সর্বোপরি জাতীয় ঐক্য নষ্ট হচ্ছে, যার সুদূরপ্রসারী ব্যাপ্তি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এর থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় আমাদের আত্মার ব্যাপ্তি। যেদিন থেকে পেরে যেতে শিখবো নির্ভেজাল মানসিকতা গড়া সেদিন থেকে এর ব্যাপকতা একটু একটু  হ্রাস পাবে। আসুন দেখি মহাগ্রন্থ আল-কুরান কি বলে এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা খুব বেশি কু-ধারণা পোষণ থেকে দূরে থাকো। কারণ অনেক কু-ধারণা গুনাহের নামান্তর। অন্যের অবস্থা জানবার জন্য গোয়েন্দাগিরি করো না এবং কারো গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি নিজের মরা ভাইর গোশত খাওয়া পছন্দ করবে?? বরং তোমরা তা ঘৃণা করো। আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী ও দয়াময়। (সূরা হুজুরাত, আয়াত:১২)
কুরআনে উল্লেখিত এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করা গেলেই মূলত এই সংকট থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব। এছাড়া, এর কোন প্রতিষেধক আজও আবিষ্কৃত হয়নি বা হবেও না। চলুন, সর্বোপরি ভাল থাকার লক্ষ্য এ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলি। আর এভাবেই চরিত্র, কর্ম, ভুষণে শুদ্ধতা আনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ