ঢাকা, রোববার 18 November 2018, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভুয়া ছবি: মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নজীরবিহীন ক্ষমা প্রার্থনা

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে প্রকাশিত একটি বইয়ে ভুয়া ছবি প্রকাশের ঘটনায় নজীরবিহীনভাবে ক্ষমা চেয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। নৃশংস এ বাহিনীর ক্ষমা চাওয়ার কোনো রেওয়াজ না থাকলেও জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনের ফলে চাপের মুখে থাকায় বাধ্য হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করল বলে ধারণা করা হচ্ছে।  

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মুখপত্র মিয়াওয়াদি ডেইলিতে গতকাল (সোমবার) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, “রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রকাশিত বইয়ে দুইটি ছবি ভুলভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এই ভুলের জন্য পাঠক এবং ওই ছবি দুটির আলোকচিত্রীদের কাছে আমরা আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।”

রোহিঙ্গা সঙ্কটের ‘আসল সত্য’ প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গত জুলাই মাসে ‘মিয়ানমার পলিটিকস অ্যান্ড দ্য টাটমাডো: পার্ট ওয়ান’ নামের বইটি প্রকাশ করে। ১১৭ পৃষ্ঠার ওই বইয়ে গতবছরের আগস্টের পর শুরু হওয়া সামরিক অভিযান নিয়ে সেনাবাহিনীর ভাষ্য তুলে ধরা হয়েছে।

রয়টার্স জানায়, গত জুলাইয়ের প্রকাশিত ১১৭ পৃষ্ঠার ওই বইটিতে ৮০টি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে আটটি ছবি রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে, আর সেই আটটির অন্তত তিনটি ছবিই ইতিহাসের মিথ্যাচার। এর মধ্যে একটি ছবি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার। চিহ্নিত ভুয়া সাদাকালোয় ছাপা তিনটি ছবির মধ্যে একটিতে দেখা যাচ্ছে, একটি কৃষিযন্ত্র দিয়ে নদীতে ভাসমান দুটি মরদেহ পরখ করছেন লুঙ্গি পরিহিত এক ব্যক্তি। ছবিটির ক্যাপশনে রোহিঙ্গাদের অভিযুক্ত করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী লিখেছে : ‘বাঙালিরা স্থানীয় অধিবাসীদের নৃশংসভাবে হত্যা করে’।

ছবি: রয়টার্স

এই ছবিটি যুক্ত করা হয়েছে ১৯৪০ সালে মিয়ানমারে জাতিগত দাঙ্গার ইতিহাস অধ্যায়ে। সেই অধ্যায়ে রোহিঙ্গারা বৌদ্ধদের হত্যা করেছে সেই তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী বোঝাতে ‘বাঙালি’ বলেও উল্লেখ করা হয়।

রয়টার্স তদন্ত সূত্রে ছবিটির মূল উৎস উদ্ধার করে জানায়, প্রকৃত সত্য হচ্ছে, ওই ছবিটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি ছবি, যে যুদ্ধে লাখ লাখ বাঙালিকে হত্যা করা হয়।

আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে মিয়ানমারে ঢুকছে। অথচ ওই ছবিটির মূল সত্য হলো, রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছেড়ে পালাচ্ছে।

চিহ্নিত ভুয়া তিন ছবির মধ্যে অপর ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে ন্যুব্জ শরীরের অনেক মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে কোথাও যাত্রা করেছে। সে ছবিটিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ক্যাপশন লিখেছে, ‘ব্রিটিশ উপনিবেশের আওতায় মিয়ানমারের নিম্নাঞ্চল দখল হওয়ার পর বাঙালিদের সেখানে অনুপ্রবেশ করে’।

মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং

ছবিটিতে পরিকল্পিতভাবেই রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারে ব্রিটিশ আমলে অনুপ্রবেশ করে, তার আগে তারা সেখানে ছিল না এমন তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ রয়টার্স জানিয়েছে, ওই ছবিটি আসলে একটি রঙিন ছবি, যেটিকে সাদাকালো হিসেবে পরিবেশন করা হয়েছে। ছবিটির পেছনের সত্য এই যে, ১৯৯৬ সালে আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় গণহত্যার সময় যখন শরণার্থীরা পালিয়ে যাচ্ছিল, এটি তখন তোলা হয়। পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া মার্থা রিয়াল এটির আলোকচিত্রী, তিনি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদপত্র পিটসবার্গ পোস্ট-গেজেটে কাজ করছিলেন।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে মোট তিনটি ছবি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দুইটি ছবির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। গতকাল তারা মিয়ানমার পলিটিক্স অ্যান্ড তাতম্যাডো বইটিতে ভুল করে প্রকাশিত ছবি দুটোর জন্য ক্ষমা চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে। তবে তারা ছবি দুটোর ক্যাপশন নিয়ে কোনো কথা বলেনি। ছবির ক্যাপশনে যে তথ্য দেয়া হয়েছে সেটা নিয়েই মূলত বিতর্কের শুরু হয়।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “মিয়ানমার যা করেছে অত্যন্ত জঘন্য কাজ করেছে। নিজেরাই নিজেদের সম্মানটা খারাপ করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে নিজেরাই নিজেদের অবস্থান খারাপ করেছে।”-পার্স টুডে

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ