ঢাকা, বুধবার 5 September 2018, ২১ ভাদ্র ১৪২৫, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিজিবি-বিএসএফ শীর্ষ সম্মেলন

গত ১ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফ-এর মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শুরু হয়েছে। এই শীর্ষ সম্মেলন শেষ হবে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর। দুই বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের এ ধরনের বৈঠক বা সম্মেলন সাধারণত বছরে দু’বার অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায়।
উভয় বাহিনীর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিসহ কর্মকর্তাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, চলমান দিল্লি সম্মেলনের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে দুই বাহিনীর মধ্যে সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্ব গভীর করার বিভিন্ন পন্থা ও প্রস্তাব। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে উভয় বহিনীর কর্মকর্তাদের স্ত্রীদের বাংলাদেশ ও ভারত সফর এবং ভারতে বিজিবি কর্মকর্তাদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার আয়োজন। বিজিবির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্কুল শিশু, চিকিৎসক এবং সাংবাদিকদের ভারত সফরের ব্যাপারেও প্রস্তাব করা হয়েছে। উল্লেখ্য, কয়েক বছর ধরেই বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যদের মধ্যে ভলিবল, বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টন এবং হকির মতো বিভিন্ন খেলার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব প্রতিযোগিতাকে উভয় বাহিনী প্রীতি ম্যাচ বা বন্ধুত্বপূর্ণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে চিহ্নিত করছে। এর মাধ্যমে দুই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বন্ধুত্ব অনেক গভীর হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
বিশ্বের সব অঞ্চলেই প্রতিবেশি দুটি রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সাধারণত যেখানে যুদ্ধ বা সংঘাত না হলেও দ্বন্দ্বমূলক বা শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকে সেখানে বিজিবি ও বিএসএফ-এর মধ্যকার যে চমৎকার সম্পর্কের কথা জানানো হয়েছে তা নিশ্চয়ই অনুপ্রাণিত করার মতো। আমরাও সে কারণে দুই মহাপরিচালকসহ বাহিনী দুটির কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাই এবং তাদের ভবিষ্যৎ সকল পরিকল্পনার সাফল্য কামনা করি। প্রসঙ্গক্রমে আমরা অন্য একটি বিশেষ বিষয়েরও উল্লেখ করতে চাই। সেটা সীমান্তে হত্যা সম্পর্কিত। কারণ, সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা বন্ধের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে দিল্লি সম্মেলনে আলোচনা হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। অথচ সীমান্তে বিএসএফ-এর হত্যাকান্ড অনেক আগেই আন্তর্জাতিক একটি আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ‘অধিকার’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি নিরস্ত্র বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে বিএসএফÑ যাদের মধ্যে কুড়িগ্রামের কিশোরী ফেলানীর নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড সারা বিশ্বেই তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছিল। অনেককে অপহরণ করেও নিয়ে গেছে বিএসএফ। চলতি বছর ২০১৮ সালেও বিএসএফ-এর গুলিতে অন্তত তিনজন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছে। বিএসএফ-এর সন্ত্রাসী সৈনিকরা আরো ১১ জনকে আহত করেছে এবং নয়জনকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে।
কিন্তু দিল্লি শীর্ষ সম্মেলনে এসব হত্যাকান্ডের ব্যাপারে যেমন কোনো আলোচনা হয়নি, তেমনি বিএসএফ-এর পক্ষ থেকে হত্যা বন্ধেরও কোনো আশ্বাস দেয়া হয়েছে বলে শোনা যায়নি। শুধু তা-ই নয়, বিএসএফ উল্টো তার সদস্যদের ওপর কথিত বাংলাদেশি দুষ্কৃতকারীদের হামলা বন্ধ করার এবং সীমান্ত এলাকায় ভারতের বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপের সশস্ত্র তৎপরতার বিরুদ্ধে যৌথভাবে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিজিবির প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব পেশ করেছে।
দিল্লিতে অনুষ্ঠানরত বিজিবি ও বিএসএফ-এর সম্মেলনে ঠিক কোন ধরনের বিষয়ে কতগুলো প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় তা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে সত্য, তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রাপ্ত বিভিন্ন রিপোর্টের ভিত্তিতে একথা সম্ভবত বলা যায় যে, অতীতের মতো এবারও ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়েই বিজিবি তেমন সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের ভ্রমণ ও ভারতে উচ্চ শিক্ষালাভের মতো বিষয়গুলোতে অগ্রগতির খবর পাওয়া গেলেও তাই সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো খবর পাওয়া যায়নি। শুধু তা-ই নয়, সীমান্ত হত্যা বন্ধের বিষয়ে বিজিবির কর্মকর্তারা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে রেখেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এসব খবরের পরিপ্রেক্ষিতেই দেশপ্রেমিক পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, বিজিবির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে না বলে সীমান্তে হত্যাকান্ডেরও অবসান ঘটানো যাচ্ছে না। বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কিত ব্যাখ্যাকালে মানবাধিকার সংস্থার নেতারা বলেছেন, ভারতের সঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের হত্যার পরিবর্তে গ্রেফতার ও হস্তান্তরের ব্যাপারে সমঝোতা ও চুক্তি থাকলেও বিএসএফ সেসবের কিছুই মানছে না। বিএসএফ বরং দেখামাত্র গুলি করার নীতিই অনুসরণ করে চলেছে। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে এসেছে হত্যাকান্ডের বিচার না হওয়া। কোনো একজন বাংলাদেশিকে হত্যার বিচার ও শাস্তি হয়নি বলেই বিএসএফ ক্রমাগত আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পেরেছে। সেজন্যই কমার পরিবর্তে সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যাকান্ড আরো বেড়েছে। বিএসএফ শুধু হত্যাই করছে না, অনেক ক্ষেত্রে অপহরণ করেও ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যাচ্ছে।
এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই দেশপ্রেমিক পর্যবেক্ষকদের পাশাপাশি আমরাও মনে করি, বিজিবি সদস্যদের কেবলই ভলিবল ও বাস্কেটবলের মতো প্রীতি ম্যাচে অংশ নেয়ানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত সীমান্তে বিএসএফ-এর হত্যা বন্ধ ও প্রতিহত করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া। এ উদ্দেশ্যে বিজিবি’র লোকবল ও মনোবল বাড়াতে হবে, বিজিবি’র জওয়ানদের হাতে যথেষ্ট পরিমাণে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র তুলে দিতে হবে। সীমান্তে সেনাবাহিনীকেও মোতায়েন করা ও তৎপর রাখা দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার সরকারি পর্যায়ে গুলি ও হত্যা বিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়া। পাশাপাশি সরকারের উচিত কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং ভারতের সঙ্গে সমানে সমান হিসেবে অবস্থান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করা। সব মিলিয়ে এমন আয়োজন নিশ্চিত করা দরকার, যাতে সীমান্তে আর কোনো হত্যাকান্ড এবং অপহরণ না ঘটতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ