ঢাকা, বুধবার 5 September 2018, ২১ ভাদ্র ১৪২৫, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদক নিয়ন্ত্রণ ও ইসলাম

অধ্যক্ষ ইয়াছিন মজুমদার : বর্তমানে বাংলাদেশে মাদক বিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে। এ অভিযানের স্লোগান হল- “চল যাই যুদ্ধে মাদকের বিরুদ্ধে”। মাদক দ্রব্য মানুষের দৈহিক, মানসিক বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। সে সাথে মাদক গ্রহিতা নেশার টাকা সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। ফলে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হয়। ইসলাম কল্যাণ ও উপকারের ধর্ম এজন্য ইসলাম মাদক ও নেশাদ্রব্য গ্রহণকে হারাম করেছে। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন- হে ঈমানদারগণ নিশ্চয় মদ, জুয়া, পূজার বেদী, লটারি ইত্যাদি ঘৃনীত ও শয়তানের কাজ, তোমরা এ থেকে বিরত থাক তবে সফল হবে (সূরা- মায়িদা, আয়াত- ৯০)। আল্লাহপাক আরো বলেন- তারা আপনাকে মদ-জুয়া সম্পর্কে প্রশ্ন করে আপনি বলুন উভয়টিতে রয়েছে মহাপাপ (সূরা বাকারা, আয়াত- ২১৯)। মাদক বিষয়ে নবী (স.) এর অসংখ্য বাণী রয়েছে। তন্মধ্যে কিছুসংখ্যক উল্লেখ করলাম, তিনি বলেছেন- মাদক গ্রহণকারী জান্নাতে যাবে না (ইবনু মাজাহ)। আমার উম্মতের একদল লোক মদ পান করবে তারা মদকে অন্য পানীয়ের নামে নাম পরিবর্তন করে পান করবে। নেতাদের গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে সম্মান দেখানো হবে। যখন এরূপ হবে তখন ভূমিধস, বানর, শুকুরের মত আকৃতি বিকৃতি হবে (বুখারী- ইবনে মাজাহ)। আল্লাহপাক অঙ্গীকার করেছেন, যে মদ পান করবে তাকে ত্বীনাতুল খাবাল অর্থাৎ জাহান্নামীদের দেহ থেকে নির্গত ঘাম, রক্ত ও পুজ যা জাহান্নামে জমা হবে তা পান করানো হবে (মুসলিম)। নিশ্চয় ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা নবুয়ত ও রহমত দ্বারা শুরু হয়েছে, অতঃপর এটা খেলাফত ও রহমত হিসেবে হবে, অতঃপর অত্যাচারী শাসকের যুগ হবে, অতঃপর কঠোরতা, উশৃঙ্খলতার যুগ হবে, নারী দেহ, মদকে বৈধ মনে করা হবে। তারপরও তারা রিজিকের প্রাচুর্য ও সাহায্য প্রাপ্ত হবে, আল্লাহর সাথে (হিসাবের মাঠে) সাক্ষাৎ হওয়া পর্যন্ত (বায়হাকী)।
হযরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) মদের সাথে সংশ্লিষ্ট দশ ধরনের লোককে অভিসম্পাত করেছেন। তারা হল- মদ প্রস্তুত কারী, পরামর্শ দাতা, পানকারী, বহনকারী, যার জন্য বহন করা হয়, পরিবেশনকারী, বিক্রেতা, মূল্যভোগী, ক্রেতা, যার জন্য ক্রয় করা হয় (তিরমিযী)। মদ পানকারী জান্নাতে যাবে না (ইবনু মাজাহ)। প্রত্যেক নেশা মাদক, প্রত্যেক মাদক হারাম (ইবনু মাজাহ)। তিনি আরো বলেছেন- বেশী পরিমাণ গ্রহণে যাতে নেশা হয় তার অল্প পরিমাণও হারাম (ইবনু মাজাহ)। আল্লাহপাক বলেছেন- তোমরা নিজেদের ধ্বংসের পথে নিবে না (সূরা: আরাফ, আয়াত- ১৫৯)। ধূমপান, তামাক, গুল ইত্যাদি মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, জীবন বিধ্বংসী এবং আসক্তি সৃষ্টি হয়, অর্থের অপচয় হয়, তাই বর্তমানে অধিকাংশ ওলামার মতে এগুলোও হারাম। মদ হারাম হওয়ার সাথে সাথে নবী (স.) সাধারণত যে সকল পাত্রে মদ প্রস্তুত ও পরিবেশন করা হত সেগুলো অন্য কাজের জন্য ব্যবহারও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এবার আমরা দীর্ঘ ব্যবধানের দুটি ঘটনার প্রতি দৃষ্টি দেব। প্রথম ঘটনাটি জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করতে যখন ইসলামের আবির্ভাব হয়, তখন আরব জাতি ছিল মদে আসক্ত, অতিথি আপ্যায়নসহ কোন অনুষ্ঠান মদ পরিবেশন ছাড়া চিন্তাও করা হত না। ঘরে ঘরে বিভিন্ন ধরনের মদ তৈরী করা হত। তার ধারাবাহিকতায় সাহাবায়ে কেরামও (রা.)  মদ পান করতেন। এক অনুষ্ঠানে কিছু সাহাবা মদ পান করছিলেন এক একজন এক এক অবস্থায় ছিলেন। কেউ খাচ্ছিলেন, কেউ ঢালছিলেন, কেউ  ঠোঁটের সাথে গ্লাসটি লাগাচ্ছেন এমন সময় ঘোষণাকারী ঘোষণা করল- মদকে হারাম করে আয়াত নাযিল হয়েছে। অমনি যে যার অবস্থায় থেমে গেলেন। যিনি মুখে নিয়েছেন তিনি কুলির মত করে ফেলে দিলেন এক ঢোকও পান করলেন না। যিনি গ্লাস ঠোঁটে ছুঁইয়েছেন তিনি তা নামিয়ে ফেললেন।  যার যার ঘরে প্রস্তুতকৃত যত মদ ছিল শুধু ঐ একটি ঘোষণার সাথে সাথে স্বেচ্ছায় সব মদ ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হল। মদিনার অলি গলিপথ এমনভাবে ভিজে গেল যেন মদ বৃষ্টি হল। পক্ষান্তরে আমেরিকায়  মদ বৈধ ছিল। মদের ক্ষতি চিন্তা করে ১৯৩৩ সালে ১৮ নং সংশোধনী বাতিল করে মদ নিষিদ্ধ করা হয়। মানুষকে মদের ক্ষতি বোঝানোর জন্য ৯ কোটি পৃষ্ঠার বিভিন্ন প্রচারপত্র বিলি করা হয়। চৌদ্দ বছরে ৬৫ কোটি ডলার প্রচারে ব্যয় হয়। পাঁচ লক্ষ চৌত্রিশ হাজার তিনশত পঁয়ত্রিশ জনকে জেলে বন্দী করা হয়। এক  কোটি ষাট লক্ষ ডলার জরিমানা আদায় করা হয়। চল্লিশ কোটি চল্লিশ লক্ষ ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। বৈধ কারখানাসমূহ বন্ধ করার ফলে গোপন উৎপাদন শুরু হয়। চার হাজার বৈধ বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করা হয়। কিন্তু তার অনেক গুণ অবৈধ বিক্রয় কেন্দ্র সীলগালা করা হয়। উনাশি হাজার চারশত সাইত্রিশজন বিক্রয়কারীকে গ্রেফতার করা হয়। বৈধ থাকতে সরকারীভাবে পরীক্ষা করে মান নিয়ন্ত্রণ করা হত। অবৈধ কারখানায় সে ব্যবস্থা না থাকায় মদ হয়ে উঠল জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে মদকে আবার বৈধ ঘোষণা করে বৈধ কারখানা ও বিক্রয় কেন্দ্রের অনুমতি প্রদান করে।
প্রথম ঘটনায় মুসলমানগণ পরিপূর্ণ ঈমানদার ছিলেন আল্লাহ ও তার রাসুলের বিধান ছিল তাদের নিকট সব কিছুর উপরে। তারা  নৈতিকতার উচ্চস্তরে ছিলেন বিধায় এক ঘোষণায় মদ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় ঘটনায় নৈতিকতার ঘাটতি থাকায় মদ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। আমাদের  দেশে মাদকের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চলছে তা পরিপূর্ণ সফল হতে হলে নৈতিক শিক্ষার প্রতি আরো গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষকে ধর্মভীরু করার জন্য ধর্মীয় শিক্ষার আরো প্রসার ঘটাতে হবে, নচেৎ ঐশীদের মত প্রজন্ম সৃষ্টি হবে। সরকারীভাবে অনুমতিপ্রাপ্ত ফাইভ স্টার হোটেলে, বার, ক্যাবারে মদ বৈধ থাকবে আর সাধারণ জনগণের জন্য অবৈধ থাকবে, এ বৈষম্য বিরাজমান থাকলে মাদক নির্মূলে শতভাগ সফলতা লাভ করা যাবে না।  ইসলাম মাদক দ্রব্য হারাম করেছে তাই মাদককে সকলস্তরে নিষিদ্ধ করতে হবে। মাদক উৎপাদন, বিপণন ও সীমান্ত পথে অবৈধভাবে প্রবেশের পথ বন্ধ করতে হবে।
লেখক: অধ্যক্ষ, ফুলগাঁও ফাযিল ডিগ্রি মাদরাসা, লাকসাম, কুমিল্লা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ