ঢাকা, বুধবার 5 September 2018, ২১ ভাদ্র ১৪২৫, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার বিচার করতে কারাগারেই বসবে আদালত

স্টাফ রিপোর্টার : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার এখন অনুষ্ঠিত হবে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। মামলার আসামী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অপর মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে এই কারাগারে বন্দী আছেন। আজ বুধবার এখানেই আদালত বসে মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘নিরাপত্তার কারণে’ এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এ সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে বলছেন, এটি হলে তা হবে আইনের পরিপন্থী।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থ দণ্ডাদেশ দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫। বয়স ও সামাজিক মর্যাদার কথা বিবেচনা করে আদালত তাঁকে এই দণ্ডাদেশ দেন। এরপর থেকে খালেদা জিয়া নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাটি পুরান ঢাকার আলীয়া মাদ্রাসার মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান ওই মাঠে স্থাপিত বিশেষ এজলাসে মামলাটির শুনানি নিচ্ছিলেন। দুর্নীতির এই মামলায় আজ বুধবার আদালতে শুনানির দিন ধার্য রয়েছে; তার আগের দিন এজলাস স্থানান্তরের প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো।
আইন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মাহবুবার রহমান সরকার স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এজলাস স্থানান্তরের বিষয় বলা হয়েছে, এস.আর. ও নম্বর ২৬১-আইন/২০১৮-বিশেষ জজ আদালত নম্বর-৫, ঢাকায় বিচারাধীন বিশেষ মামলা নম্বর ১৮/২০১৭ যাহা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের টাকা আত্মসাত সংক্রান্ত, যাহার বিচার কার্যক্রম ঢাকা মহানগরের বকশি বাজার এলাকায় সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ও সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন মাঠে নির্মিত অস্থায়ী আদালত ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। বর্ণিত মামলার বিচার কার্যক্রম চলার সময়ে এলাকাটি জনাকীর্ণ থাকে বিধায় নিরাপত্তাজনিত কারণে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর, ১৮৯৮ এর সেকশন ৯ এর ২ উপধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার বিশেষ জজ আদালত নম্বর-৫, ঢাকায় বিচারাধীন বিশেষ মামলা নম্বর ১৮/২০১৭ এর বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য ঢাকা মহানগরের ১২৫ নাজিমুদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের কক্ষ নম্বর ৭ কে অস্থায়ী আদালত হিসেবে ঘোষণা করিল। সেই সঙ্গে এই নির্দেশ দিল যে বিশেষ জজ আদালত নম্বর ৫, ঢাকায় বিচারাধীন বিশেষ মামলা নম্বর ১৮/২০১৭ এর বিচার কার্যক্রম সেই কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের কক্ষ নম্বর ৭-এর অস্থায়ী আদালতে অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে গতকাল কারাগারের সামনেই দুদকের কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়ার মামলাটা গত ফেব্রুয়ারি থেকে ছয় মাস হয়ে গেল কোনো কার্যক্রম করতে পারছি না। জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় খালেদা জিয়া উপস্থিত হচ্ছেন না। এ কারণে আমরা বলেছি, খালেদা জিয়া যেখানে আছেন সেখানেই আদালত বসানো প্রয়োজন।
এক প্রশ্নের জবাবে মোশাররফ হোসেন বলেন, খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ কি না, তা আমি জানি না। যে রেকর্ড আছে সেখানে তিনি গুরুতর অসুস্থ, তা উল্লেখ নেই। আমরা জানি তিনি আসার জন্য অনুপযুক্ত ছিলেন। যেদিন মামলার শুনানির তারিখ ছিল সেদিন ডাক্তার লিখেছিলেন, তিনি ওই দিন চলাচলে অনুপযুক্ত।
আরেক প্রশ্নের জবাবে কাজল বলেন, এটা প্রকাশ্য আদালত। জনগণ ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে, তাঁর আইনজীবীদের উপস্থিতিতে এ মামলার বিচার কার্যক্রম পরিচালনা হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানমতে এ আদালত হচ্ছে।
মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা আদালতকে বারবারই বলেছি, তাঁকে (খালেদা জিয়া) আদালতে আনার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কিন্তু তিনি আদালতে উপস্থিত হননি। আমরা আদালতকে বলেছিলাম, সাক্ষ্য আইন সংশোধন করে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচার করার জন্য। আমরা আদালতে এও বলেছিলাম, এটা একটা পরিত্যক্ত জেলখানা। এখানে অনেক জায়গা আছে। জনগণের উপস্থিতিতে এখানে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
মোশাররফ হোসেন জানান, কারাগারের ভেতরে আদালতের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তিনি নিজে তা দেখে এসেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারাগারের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, এ কারাগারের ভেতর আদালতের অবকাঠামো প্রস্তুত করা হয়েছে। আগে সেটি অফিস ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
কারাগারের ভেতর বিচার অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, খালেদা জিয়ার বিচার কারাগারের ভেতর হবে, তাঁরা এমন খবর জানেন না। কারাগারের ভেতর আদালত করা আইনের পরিপন্থী, এটা হতে পারে না।
খালেদা জিয়ার অপর আইনজীবী আবদুর রেজাক খান বলেন, কারাগার কখনো প্রকাশ্য আদালত বলে বিবেচিত হতে পারে না। সংবিধান অনুযায়ী বিচার হতে হবে প্রকাশ্য আদালতে। সিনিয়র এই আইনজীবী বলেন, তাঁর জানামতে বাংলাদেশে সামরিক আইনে কারাগারের ভেতর কর্নেল তাহেরের বিচার হয়েছিল। আর পাকিস্তান আমলে একজন রাজনীতিকের মামলার বিচার কারাগারের ভেতরের আদালতে হয়েছে।
আজ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার শুনানির তারিখ ধার্য রয়েছে। মামলাটি যুক্তিতর্ক পর্যায়ে শুনানির জন্য রয়েছে।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় মোট আসামী চারজন। খালেদা জিয়া ছাড়া অভিযুক্ত অপর তিন আসামী হলেন খালেদা জিয়ার তৎকালীন রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন মোট ৩২ জন।
২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা করা হয়। মামলার অভিযোগ থেকে জানা গেছে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলাটি দায়ের করে দুদক।
২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক হারুন-অর-রশীদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি দুদকের দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৫-এর বিচারক ড. আখতারুজ্জামান। এ মামলায় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ অন্য আসামীদের ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া অর্থদণ্ডও করা হয়। রায়ের পর খালেদা জিয়া রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা ভোগ করছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ