ঢাকা, বুধবার 5 September 2018, ২১ ভাদ্র ১৪২৫, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এবার মরণঘাতী অনলাইন গেম ‘মমো’র ফাঁদ

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : অনলাইনভিত্তিক মরনঘাতি গেম ‘ব্লু- হোয়েল’ বা ‘নীল তিমি’র ঝড় উঠেছিল বিগত ২০১৭ সালে। গোটা একটা বছর এই গেম নিয়ে বিশ্বের সাথে আতংকে ভুগেছিল বাংলাদেশ। বিশেষ করে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তরুণ-তরুণীদের নিয়ে চিন্তায় ছিলেন তাদের অভিভাবকরা। নানা সতর্কতা ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে ব্লু-হোয়েলের আতংক থেকে বের হয়ে এসেছে জাতি। কিন্তু আবার নতুন করে ইন্টারনেট জগতে ঝড় তুলছে মমো বা মনো মায়া গেইম। এই অনলাইন গেইমটিও ব্লু- হোয়েল মতো মরণঘাতী সাইকোলজিক্যাল গেইম বলে বলছেন বিশ্লেষকরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেসেজের মাধ্যমে এ গেম খেলার আমন্ত্রণ দেয়া হয়।
জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অনলাইন গেইম মমো ছড়িয়ে পড়ছে। দক্ষিণ আমেরিকা ও ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশে মমো গেইম খেলে কয়েকজন আত্মহত্যা করেছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মমো গেইমের বিষয়ে বিশ্লেষকরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছেন, এই সাইকোলজিক্যাল ফেনোমেনা গেইম তরুণ প্রজন্মকে পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। অনলাইন এই গেইমটিতে যে লোগো ব্যবহার করা হয়েছে তা দেখতেই ভয়ানক। কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে উঠতে পারে এবং গেমে অংশ নিতে প্রলুব্ধ করতে পারে।
তবে সাইকোলজিক্যাল ফেনোমেনা এই মমো গেইমের বাংলাদেশে প্রসার রোধে ইতি মধ্যেই নড়ে চড়ে বসেছে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট। ওই ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিট এই মমো মায়াকে রুখতে প্রস্তুত। ডার্কওয়েবের মাধ্যমে ছড়াতে পারে কথিত এই গেইম। এসব ডার্কওয়েব লিংকগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে এই গেমসহ তিনটি গেম নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের পক্ষ হতে মমো মায়াকে রুখতে কিছু পরামর্শ দেওয়া হয় নেট ব্যবহারকারীদের জন্য। পরামর্শগুলো হল,.মমোর কথা বলে কিছু শৌখিন বা ভন্ড প্রোগ্রামার রা গুজব ছড়িয়ে জাতিকে ব্যস্ত রাখতে ফেইক মমো বাজারজাত করে ভিন্ন স্বার্থ হাছিলে তারা তৎপর থাকতে পারে সেটা মাথায় রাখতে হবে। অনেক সময় মমো কে পুঁজি করে কেউ নাইজেরিয়ান স্ক্যাম এর মত অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। সেটা পরখ করাটাও জরুরি। কোন ভাবেই মমো নামের কোন আসল বা ফেইক লিংক কে ধপশহড়ষিবফমব করা যাবে না। নইলে সাইকোলজি প্রভাব কে এড়াতে পারবেন না। টিনেজারদের যতদূর সম্ভব নেট তথা ডার্ক ওয়েব থেকে দূরে রাখবেন। সে ক্ষেত্রে অভিভাবক এবং শিক্ষকগণের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কেউ কোনভাবে মমোর আসক্তি তে ডুবে গেলে হইচই না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এর পরামর্শ নিবেন, পাশাপাশি আমাদের কাছে আসবেন,আমরা মনো প্রাযুক্তিক বিষয়ে কাউন্সেলিং করে দিব। আতংকিত হবেন না এবং কোনভাবেই আতংক ছড়াবেন না, তাতে গণমানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলতে পারেন। মমো সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে তথ্য প্রদান ও সেবা গ্রহণে ডিএমপি এর সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন বিভাগের সাথে যোগাযোগ রাখুন।
 ব্লেড দিয়ে হাত কেটে তিমি মাছ আঁকা আর আত্মহত্যার মতো পরিণতির গেম ব্লু- হোয়েল ২০১৭ সালের শুরুর দিকে ভারত-চীনসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই গেমে অনলাইনে একটি কমিউনিটি তৈরি করে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এতে মোট ৫০টি ধাপ থাকে। ধাপগুলো খেলার জন্য ওই কমিউনিটির অ্যাডমিন বা পরিচালক খেলতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ দিয়ে থাকে। প্রতিযোগী সে চ্যালেঞ্জ পূরণ করে তার ছবি আপলোড করে। শুরুতে মোটামুটি সহজ এবং কিছুটা চ্যালেঞ্জিং কাজ দেয়া হয়। যেমন- মধ্যরাতে ভূতের সিনেমা দেখা, খুব সকালে ছাদের কিনারা দিয়ে হাঁটা, ব্লেড দিয়ে হাতে তিমির ছবি আঁকা ইত্যাদি। ধাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কঠিন ও মারাত্মক সব চ্যালেঞ্জ দেয় পরিচালক। যেগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ এবং সর্বশেষ ধাপ হলো আত্মহত্যা করা। অর্থাৎ গেম শেষ করতে হলে প্রতিযোগীকে আত্মহত্যা করতে হবে।
শুরুতে তুলনামূলক সহজ এবং সাহস আছে কিনা- এমন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ায় তরুণ-তরুণীরা আকৃষ্ট হয়। একবার এ খেলায় ঢুকে পড়লে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমনকি খেলার মাঝপথে চলে আসতে চাইলে প্রতিযোগীকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। এছাড়া তার আপনজনদের ক্ষতি করার হুমকিও দেয়া হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কথা হচ্ছে- গেমটি একবার মুঠোফোনে ব্যবহারের পর তা আর ডিলিট করা যায় না।
বাংলাদেশে এই গেম খেলে এমন দুজনকে সনাক্ত করে রিহ্যাবিলিটেশন করা হয়েছে। এর ভয়াবহতার বিষয়টি মাথায় রেখে বাংলাদেশে ব্লু- হোয়েলের সব লিংক বন্ধের নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট।
পারিবারিক সচেতনতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ব্লু-হোয়েল মুক্ত করার সময় নতুন আরেক মরণফাঁদ তৈরি হলো। নতুন এই ফাঁদের নাম ‘মমো চ্যালেঞ্জ সুইসাইড গেম’। এই গেম ছড়িয়ে পড়ছে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপে। মমো’ একটি মেয়ের ছবি। যার দু’টি চোখ কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসছে। তার পা দু’টি পাখির মতো। পায়ের আঙুল ও নখগুলো বড় বড়। মুখ অসম্ভব রকমের চওড়া। মাথা লম্বা। চুল ঘন কালো। দুই কানের পাশ দিয়ে তা অনেক নিচু পর্যন্ত নেমেছে। মাথার ওপরের দিকটা দেখলে মনে হবে, টাক আছে। তারই মাঝে কিছুটা জায়গা ছেড়ে ছেড়ে রয়েছে চুল।
মমোর এই ছবি এঁকেছিলেন জাপানি শিল্পী মিদোরি হায়াশি। তবে শিল্পী হায়াশি কোনোভাবেই এই আত্মহত্যায় প্ররোচণ দেয়া গেমের সঙ্গে জড়িত নন। ২০১৬ সালে টোকিওর ‘ভ্যানিলা গ্যালারি’তে একটি শিল্প প্রদর্শনীর জন্যই ওই ‘মমো’র ছবি এঁকেছিলেন হায়াশি।
নতুন এই গেমের ফাঁদে পড়ে ইতোমধ্যে আর্জেন্টিনার ১২ বছরের এক কিশোরী আত্মহত্যা করেছে।
এ বছর ‘মমো’কে নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়েছে ল্যাটিন আমেরিকায়। তবে হোয়াটসঅ্যাপ- মেসেঞ্জারের মাধ্যমে এর মধ্যেই গেমটি পৌঁছে গেছে এশিয়া, আফ্রিকা আর ইউরোপে। ভারতে অনেকেই এই গেমে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কাছে গিয়েও ফিরে এসেছেন।
তবে এই দুই গেমকে ছাপিয়ে আগস্টের শেষের দিকে গ্র্যানি নামের নতুন গেমটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি ভারতের ময়নাগুড়ির তিন স্কুলছাত্র রাতে হঠাৎ করেই অসংলগ্ন আচরণ শুরু করে। কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করে, আবার কেউ পরিবারের লোকজনকে মারধর করে। এরপর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও মোবাইল ফোন জব্দের পর পুলিশের সাইবার ইউনিট গ্র্যানি গেমের বিষয়ে জানতে পারে।
ভারত পুলিশের সাইবার বিশেষজ্ঞরা তদন্তের পর প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন, গ্র্যানি নামের এই গেমটি মমো বা ব্লু- হোয়েলের মতো লিংক নির্ভর নয়। গেমটি মূলত ভয়ের। এই গেমের বিভিন্ন ধাপে রক্ত, ভূত বিভিন্ন রকম হিংসার ঘটনা রয়েছে।
এছাড়াও যারা ব্লু-হোয়েল ও মমো’র শেষ পর্যন্ত যেতো তারা আত্মহত্যা করতো কিংবা আত্মহত্যা চেষ্টা করতো। তবে গ্র্যানি গেমের মাধ্যমে পরিবারের লোকজনকে মারধর হত্যার মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি করছে ভারতীয় পুলিশ।

নিষিদ্ধ করলো পুলিশ
বাংলাদেশে প্রাণঘাতী ব্লু- হোয়েল, মমো ও গ্র্যানি গেম খেলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ইউনিট। এই তিনটির কোনো একটি গেম খেললে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। জব্দ করা হবে তার মোবাইল ফোনসহ যাবতীয় জিনিসপত্র।
পুলিশের সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) নাজমুল ইসলাম সাইবার ইউনিটের এই নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এই গেমগুলো গেইমার এবং তার পরিবারের জন্য প্রাণঘাতী। গেমগুলো তরুণ সমাজকে হতাশাগ্রস্ত ও মৃত্যুর দিকে ধাবিত করে। এই বিবেচনায় বাংলাদেশে গেমগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সাইবার ক্রাইম ইউনিট। ভারত-পাকিস্তানেও এই ৩টি গেম নিষিদ্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই ৩টি গেমের কোনো একটি খেলছে, এমন কাউকে যদি শনাক্ত করা হয় তাহলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া আমরা দেশবাসীকে অনুরোধ করছি- যদি তাদের আশেপাশের কেউ এই গেমটি খেলে তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে তাদের বিষয়ে তথ্য দিন। তবে বাংলাদেশে প্রাণঘাতী এসব গেমের কোনো লিংক বা গেম খেলছে এমন কাউকে সনাক্ত করা যায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

মোমোর ফাঁদে কলকাতায় আতঙ্ক
মমো নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের পশ্চিমবংগে। গত শুক্রবার দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট ও জলপাইগুড়ির জেলার দুই শিক্ষার্থী অনলাইন এ মরণঘাতী গেম খেলার আমন্ত্রণ পেয়েছেন বলে জানিয়ে পুলিশ। এ গেম খেলার আমন্ত্রণ পাওয়ার পর ওই দুই শিক্ষার্থীই থানায় অভিযোগ জানান। তাদের মধ্যে একজন ছাত্র ও আরেকজন ছাত্রী। পুলিশ তাদের অভিযোগ তদন্ত করে দেখছে বলে জানা গেছে।
 গেম মমো গেমের শিকার হয়ে কার্শিয়াংয়ের ছাত্রের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই ফের দু’জনের কাছে এ মরণঘাতী গেমের অংশ নেওয়ার টোপ আসায় বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। এ ছাড়া কার্শিয়াংয়ের আরও দুই ছাত্রের কাছে এই মৃত্যুফাঁদ এসেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ