ঢাকা, বুধবার 5 September 2018, ২১ ভাদ্র ১৪২৫, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ক্যালিগ্রাফি পরিচয়

মোহাম্মদ আবদুর রহীম : বাংলাদেশে শিল্প হিসেবে ক্যালিগ্রাফি একটি মর্যাদার আসন ইতোমধ্যে অর্জন করেছে। চারুশিল্পী থেকে শুরু করে সৌখিন শিল্পী ও ক্যালিগ্রাফি পছন্দ করেন, সবাই এর প্রতি বিশেষ আগ্রহ ও আকর্ষণ দেখিয়ে থাকেন। অনেকে ক্যালিগ্রাফি শিখতে চান, অবসরে এটা করে আনন্দ পেতে চান। যেহেতু ক্যালিগ্রাফি বলতে বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ আরবি লেখার ঘুরানো-পেচানো দেখতে সুন্দর ছবি বুঝে থাকেন। এটা একদিক দিয়ে বলা যায় তাদের ধারণা কিছুটা সঠিক। কিন্তু যিনি ক্যালিগ্রাফি শিখতে চান বা যারা শেখান, তাদের কাছে ক্যালিগ্রাফির সামগ্রিক কোন পরিচিতি নেই, কেউ আরবি হরফ বা কুরআন-হাদিসের বাণী কিংবা কবিতার ছত্র দিয়ে পেইন্টিং বা ঘুরিয়ে-পেচিয়ে এটা আদল বানাতে পারাটাই ক্যালিগ্রাফি মনে করছেন, কারণ বাংলাদেশের ক্যালিগ্রাফি অঙ্গনে এর একাডেমিক কোন সংজ্ঞা এখনো প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। এমনকি চারুকলার প্রাচ্যকলায়ও এর সন্তোষজনক কোন বক্তব্য পাওয়া যায় না। আমরা কিছু একটা হরফের ছবি বানিয়ে বলছি এটা ক্যালিগ্রাফি। এর মধ্যে হ্যান্ড রাইটিং, টাইপোগ্রাফি, পিক্টোগ্রাফি, নানা রকমের রাইটিংকে নির্দ্বিধায় ক্যালিগ্রাফি বলে চালিয়ে দিচ্ছি। এছাড়া এম্বিগ্রাম, মনোগ্রাম, লেটারিং ইত্যাদিও ক্যালিগ্রাফি হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এ জন্য ক্যালিগ্রাফির একটি প্রামাণ্য সংজ্ঞা ও পরিচিতি এ অঙ্গনের শিল্পী ও অনুরাগীদের কাছে যেমন থাকার প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি জনসাধারণের কাছে এটার সম্যক ধারণা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
বাংলা ভাষায় ক্যালিগ্রাফি বিষয়ক বিভিন্ন লেখায় সংক্ষেপে ক্যালিগ্রাফির সংজ্ঞা ও পরিচয় দেয়া হয়েছে। এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকায় ক্যালিগ্রাফির সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, Calligraphy, the art of beautiful handwriting. The term may derive from the Greek words for “beauty” (kallos) and “to write” (graphein). প্রাথমিক পরিচয় হিসেবে এটা ঠিক আছে। তবে এটাই সম্পূর্ণ সংজ্ঞা ধরা যায় না। বিভিন্ন ভাষার হরফে ক্যালিগ্রাফি হয়ে থাকে। বিশেষত প্রাচীন শিল্পকলা হিসেবে ক্যালিগ্রাফির ওস্তাদ ও গবেষকগণের মতে এর সংজ্ঞা কেমন হতে পারে তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
পাশ্চাত্য গবেষকগণ বলছেন, সুন্দর হাতের লেখা ও অলংকারিক হরফ বিন্যাস থেকে আরো কিছু বিষয় ক্যালিগ্রাফিতে রয়েছে। সুতরাং ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে, Calligraphy is the art of forming beautiful symbols by hand and arranging them well. It’s a set of skills and techniques for positioning and inscribing words so they show integrity, harmony, some sort of ancestry, rhythm and creative fire. ক্যালিগ্রাফি এমন শিল্পকে বলা হয়, যাতে চমৎকার সব প্রতীক হাতের মাধ্যমে রচনা করা ও সেগুলোকে নিখুঁত ও সুন্দর করে সাজানো হয়। এটা শব্দ ও হরফের অবস্থান ও লেখায় দক্ষতা ও কৌশলের এমন সমাহার, যাতে অখন্ডতা, সাদৃশ্য, ক্যালিগ্রাফির ঐতিহ্য, ছন্দ ও সৃজনশীল স্ফুলিঙ্গ প্রকাশ পাবে।
এই সংজ্ঞায় ব্যবহৃত শব্দগুলো নিয়ে একটু আলোচনা করা প্রয়োজন।
এক. সিম্বল বা প্রতীক- এখানে এমন চিহ্নকে বলা হয়, যেটা নির্দিষ্ট ভাষায় নির্দিষ্ট হরফ বা শব্দ অথবা গণিতের চিহ্ন বা সংখ্যার স্পষ্ট অর্থ বহন করে।
দুই. ইন্টেগরিটি বা অখন্ডতা- ক্যালিগ্রাফিতে ব্যবহৃত শব্দ, হরফ, চিহ্ন বা প্রতীকের যুক্তিগ্রাহ্য অনুপাত ও রচনা।
তিন. হারমোনি বা সাদৃশ্য- দৃশ্যমান ভিন্ন ভিন্ন উপাদানগুলোর মধ্যে একটি আনন্দঘন সখ্যতা ও সম্পর্ক এবং এর চারপাশ জুড়ে থাকা জায়গার সাথে সাদৃশ্য থাকা।
চার. এনসেসট্রি বা ক্যালিগ্রাফির ঐতিহ্য- হরফের আকৃতিগত ঐতিহ্য, ক্যালিগ্রাফিতে ব্যবহৃত উপকরণ এবং ব্যবহার পদ্ধতি, করন কৌশল ঐতিহ্যগত হওয়া।
পাঁচ. রিদম বা ছন্দ- ক্যালিগ্রাফিতে প্রয়োগকৃত প্রতীক, হরফ বা শব্দ বা চিহ্নগুলোর মধ্যে রিপিট বা পুণঃ উল্লেখে একটি ছন্দ থাকা, যাতে পুরো শিল্পকর্মটি ছন্দময় মনে হয়।
ছয়. ক্রিয়েটিভ ফায়ার বা সৃজনশীল স্ফুলিঙ্গ- এমনভাবে শিল্পকর্মটি তৈরি করা যেন এটা জীবনের একটা অংশ মনে হয়।
অনেকে মনে করেন, ডেকোরেটিভ বা অলংকার সজ্জিত লেখা কি ক্যালিগ্রাফি নয়! অলঙ্কার সজ্জিত লেখা তখনই ক্যালিগ্রাফি হবে, যখন অলঙ্কার ছাড়াই সেটা দেখতে সুন্দর, মনের ভেতর দাগ কাটে। যেমন- মডেল বা পেশিবহুল বডি বিল্ডার কাপড় ছাড়াই তাদের কাঠামো সুন্দর, তেমনি ক্যালিগ্রাফির হরফের গঠন ও আকৃতি যদি সুন্দর হয়, তবে সেই হরফকে অলঙ্কার শোভিত করলে আরো সুন্দর লাগবে।
প্রশ্ন হতে পারে, সুন্দর হাতের লেখা কি ক্যালিগ্রাফি? সুন্দর হাতের লেখা যদি শিল্পের শর্তগুলো পূরণ করে তাহলে সেটা ক্যালিগ্রাফি, অন্যথায় সেটা শুধুমাত্র হাতের লেখা দেখতে সুন্দর হিসেবে বিবেচিত হবে। কিছু ‘সুন্দর হাতের লেখা’ ক্যালিগ্রাফি হতে পারে, সব ‘সুন্দর হাতের লেখা’ ক্যালিগ্রাফি নয়, কিন্তু প্রতিটি ক্যালিগ্রাফিই অবশ্যই সুন্দর হাতের লেখা হবে। কারণ তাতে শিল্পকলার শর্তগুলো বিদ্যমান থাকে।
তেমনিভাবে লেটারিং বা নির্দিষ্ট ধরণের হরফের বা যে কোন ধাচের হরফের ইচ্ছেমত বিন্যাস ও সাজানোর মাধ্যমে অর্থবোধক কোন জিনিস কি ক্যালিগ্রাফি হিসেবে বিবেচিত হবে। এটা ক্যালিগ্রাফি থেকে বড় ধরণের একটি ব্যাপার। স্পষ্ট করে বললে, এটা যোগাযোগের একটি মাধ্যম। এর ভেতর টাইপোগ্রাফি, সাইনবোর্ড রাইটিং, ব্যানার, ফ্লায়ার, গ্রাফিতি, গ্রাফিক ডিজাইনের মত নানান বিষয় অন্তর্ভূক্ত। লেটারিংয়ে অবশ্যই সুন্দর বিন্যাস ও সাজানোর বিষয় রয়েছে। তবু সেটা ক্যালিগ্রাফি থেকে আলাদা কিছু। যতক্ষণ লেটারিং দিয়ে একটি শিল্পকর্ম না হচ্ছে, ততক্ষণ সেটা শুধুই লেটারিং, ক্যালিগ্রাফি নয়। লেটারিং এবং ক্যালিগ্রাফির উদ্দেশ্য সব সময় আলাদা।
ক্যালিগ্রাফি কি প্রাচীন হরফমালার লেখনী? প্রাচীন ঐতিহাসিক লেখনীর পূনঃলেখন কি ক্যালিগ্রাফি?
সত্য কথা হচ্ছে, ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী লেখনীর প্রতি ক্যালিগ্রাফার অত্যন্ত সচেতন থাকেন, লেখনীর সেই ধারাকে আত্মস্ত করে নিজের লেখনির মধ্যে সৃজনশীল ও নান্দনিক শিল্প আবিস্কারের মাধ্যমে তিনি ক্যালিগ্রাফি করেন।
কোন ফেন্সি হরফের লেখাকে ক্যালিগ্রাফি বলা যাবে? আসলে কোন ধরণের টাইপ ফেসকে ক্যালিগ্রাফি বলা হয় না। সব ধরণের টাইপ ফেস ছাপার কাজে ব্যবহার হয়, এতে কোন প্রাণ থাকে না, ইচ্ছেমত তাতে সৌন্দর্য প্রদান বা হরফের কোন রেখাকে মন মত ব্যবহার করা যায় না।
ক্যালিগ্রাফি নিয়ে চমৎকার মন্তব্য করেছেন গবেষক ব্রাউন, ... calligraphy is a script that exhibits exceptional and often self-conscious artistry and aesthetic quality in design and execution. (M. P. Brown, Understanding Illuminated Manuscripts: A Guide to Technical Terms (London: The British Library, 1994), p. 32
ক্যালিগ্রাফি এমন হাতের লেখা, যাতে ব্যতিক্রমধর্মী এবং আত্ম-উদ্দীপ্ত শিল্পবোধ প্রকাশ করে এবং নকশা ও করনকৌশলে নান্দনিক মান বজায় থাকে।
বিখ্যাত বাহাতী ক্যালিগ্রাফার স্টাডলি ক্যালিগ্রাফি নিয়ে স্বীয় অনুভূতি এভাবে ব্যক্ত করেন, Calligraphy is a skill. This skill involves touch, pressure, hand movement, unity, and that elusive quality we term “beauty.” (V. Studley, Left-Handed Calligraphy (NY: Dover, 1991), p. 8)
ক্যালিগ্রাফি একটি দক্ষতা, এই দক্ষতার সাথে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে স্পর্শ, চাপ, হাতের গতিবিধি, ঐক্য এবং বিউটি অর্থাৎ এমন সৌন্দর্য যা ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।
সুতরাং ক্যালিগ্রাফির সাথে যে শিল্পকলার গভীর সম্পর্ক রয়েছে, সেটা প্রমাণিত। প্রাচ্যকলায় ক্যালিগ্রাফি একটি অবিচ্ছেদ্য বিষয়। আর প্রাচ্য শিল্পের সাথে রয়েছে ষড়ঙ্গ। প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলাসহ চীন-জাপানের শিল্পে ষড়ঙ্গ-এর কথা জানা যায়। ভারতীয় শিল্পে ষড়ঙ্গ আমরা দেখতে পাই বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’ গ্রন্থে, খ্রীস্টপূর্ব পাঁচশ’ বছর আগে রচিত এই  গ্রন্থের একটি স্লোক হচ্ছে,
“রূপভেদাঃপ্রমাণানিভাবলাবণ্যযোজনম্
সাদৃশ্রংবর্ণিকাভঙ্গইতিচিত্রংষড়ঙ্গকম্”
এটি যশোধর পন্ডিত ঐ গ্রন্থের প্রথম অধিকরণের ৩য় অধ্যায়ের টীকায় আলেখ্যের ছয় অঙ্গ নির্দেশ করেন। সেগুলো হচ্ছে- এক. রূপভেদ, দুই. প্রমাণ, তিন. ভাব, চার. লাবণ্যযোজন, পাঁচ. সাদৃশ্য, ছয়. বর্ণিকাভঙ্গ। ভারতীয় শিল্পে চিত্রাঙ্কনকে আলেখ্য বলা হয়, কারণ এসব ছবি কলম দিয়ে আঁকা হয়। তবে ছবি আঁকার কলম আর ক্যালিগ্রাফির কলম আলাদা। আমরা পাল চিত্রমালায় এই দু’ধরণের কলমের ব্যবহার দেখতে পাই।
দ্বাদশ শতকে ক্যালিগ্রাফির মহান উস্তাদ ইয়াকুত আল-মুস্তাসিমী ক্যালিগ্রাফির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, “আল-খত্ হানদাসাহ রুহানিয়া অয়া জহারত বিআলাতিল জিসমানিয়া।” আবু হাইয়ান আত্তাওহিদী তার গ্রন্থে এটা উল্লেখ করেন, এর অর্থ হচ্ছে- Calligraphy is a spiritual geometry that appeared with a physical instrument. আধ্যাত্মিক রেখাঙ্কনকে এজন্য ক্যালিগ্রাফি বলা হয় কারন এটা হৃদয়ের সাথে যেমন সম্পর্কিত, তেমনি শিল্পের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত।
প্রাচীন কাল থেকে এ ঐতিহ্যবাহী ক্যালিগ্রাফি বিশেষ শিক্ষা পদ্ধতি অনুসরন করে আসছে। আরবি-ইংরেজির মত বাংলা ক্যালিগ্রাফি শিক্ষায় নোকতা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর সাথে হরফকে শৈল্পিক মানে উন্নীত করতে সাদৃশ্য পদ্ধতি ও বৃত্ত পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। বাংলা হরফের রেখার গতিবিধি ও দেহ কাঠামোর গঠনকে বিবেচনায় রেখে অনুপাত, সাদৃশ্য, আকার, আকৃতিকে একটি বাংলা ঘরের সাথে তুলনা করা যায়। বাংলা ঘরের সদর-অন্দর-চাল-চুলো সবই চৌকো আর আয়ত স্বভাবের যে শিল্পবোধের অনুভব আমাদেরকে দোলা দিয়ে যায়, বাংলা ক্যালিগ্রাফিতে তা ফুটে ওঠে। প্রসঙ্গত নগরে উৎপন্ন নাগরি বা দেব নাগরিতে তা মেলানো দুরুহ। ১৮শ সালের পর থেকে বরাবরের মত সম্প্রতি খুব সুক্ষ্ম আর সচেতনভাবে বাংলা হরফের আদলকে নাগরিতে বদলানোর অপপ্রয়াস দেখা যায় এবং এক শ্রেণির সাম্প্রদায়িক ও নীচ রুচির লোকদের তা উস্কে দেয়ার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন বাংলা ভূখণ্ডের প্রকৃতি পুজারী তান্ত্রিকদের হাতে বাংলা হরফের পয়দা হলেও এর উন্নয়ন ও সংস্কারে সুলতানী বাংলার মুসলমানদের অশেষ অবদান রয়েছে। সে যুগের পুথির লেখন সৌকর্য আজকের বাংলা হরফের গঠন কাঠামোর পথিকৃৎ হয়ে আছে।
ক্যালিগ্রাফি কলমে হরফ লেখায় নিবের কৌণিক অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা জানি আরবি হরফ ডান দিক থেকে বাম দিকে লিখতে হয়। এজন্য কলমের নিব রাখাটা হরফের সর্বাবস্থায় কৌণিক অবস্থান ডান দিকে ৪৫ ডিগ্রি বরাবর হয়, অনুরূপ বাংলা হরফ বাম থেকে ডানে লেখা হয় বলে এর কৌণিক অবস্থান বাম দিকে ৪৫ ডিগ্রি বরাবর হয়। আরবি, ইংরেজি ও বাংলা হরফকে ক্যালিগ্রাফিতে রুপান্তরের নোকতা পদ্ধতিটিও মুসলমানদের অবদান। তাই হরফের প্রতিটি রেখা, রেখাংশ ও বিন্দুর গঠন ও স্বভাব অনুযায়ী নামকরন ও অবস্থান চিহ্নিত করা এবং ক্যালিগ্রাফি হরফে রূপান্তরের গোপন কৌশল আয়ত্বের মাধ্যমে ক্যালিগ্রাফি করা সহজ হয়। চতুর্থ খলিফা ও ক্যালিগ্রাফির মহান উস্তাদ আলী বিন আবু তালিব রা. ক্যালিগ্রাফি সম্পর্কে বলেন, “আল-খত্ মুখফিউন ফি তালিমিল উস্তাযি ওয়া কওয়ামুহু ফি কাছরাতিল মিশকি ওয় দাওয়ামুহু” অর্থাৎ ক্যালিগ্রাফি হচ্ছে রহস্যময়, উস্তাদের শিক্ষার মাধ্যমে তা উন্মোচিত হয় আর অধিক অনুশীলন এবং লেগে থাকার মাধ্যমে তা আয়ত্বে আসে।
শিল্পকলার যে বিভাগে ক্যালিগ্রাফি চর্চা করা হয়, তার নাম হচ্ছে প্রাচ্যকলা। প্রাচ্যকলা নামের ভেতর আছে এর একান্ত পরিচয়। প্রাচ্য অর্থাৎ এশিয়া অঞ্চলের স্বকিয় শিল্পের নাম প্রাচ্যকলা। প্রাচ্যকলায় দুটি প্রধান হাতিয়ার দিয়ে ক্যালিগ্রাফি শিল্পকর্ম করা হয়, তা হচ্ছে-কলম ও তুলি। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো অর্থাৎ চীন-জাপানে ক্যালিগ্রাফি বা সুডো করা হয় বিশেষ নিয়মে তৈরি তুলি দিয়ে, প্রকৃতি বা নিসর্গ কিংবা যে কোন চিত্রাংকনে ক্যালিগ্রাফি আসে গৌণ হয়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশ-ভারত থেকে এশিয়ার পশ্চিমাংশের দেশগুলোতে কলম দিয়ে ক্যালিগ্রাফি প্রধানত করা হয়। এসব শিল্পকর্মে ক্যালিগ্রাফি মুখ্য হয়। বিশেষ করে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে হরফের কারুকাজ, উপস্থাপন ও আঙ্গিকে কলম চালনাই মুখ্য। বাংলার প্রাচ্যকলায় ক্যালিগ্রাফির উত্তরাধিকার এসেছে মোগল মিনিয়েচারের ঐতিহ্য থেকে, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোগল মিনিয়েচারের আদলে বহু চিত্র এঁকেছেন, ভারতীয় রীতিতে তাঁর আঁকা প্রথম চিত্রাবলি ‘কৃষ্ণলীলা-সংক্রান্ত’। এই রীতি অনুসারী চিত্রশিল্পের তিনি নব জন্মদাতা। ১৮৯৫ সালের দিকে অবনীন্দ্রনাথ প্রথম নিরীক্ষা শুরু করেন। ১৮৯৭ সালে পানি রংয়ে আঁকলেন ‘শুক্লাভিসার’- রাধার ছবি মাঝে রেখে উৎকীর্ন কবি গোবিন্দ দাসের পংক্তিমালা। সেগুলোতে বাংলা ক্যালিগ্রাফি তিনি হুবহু মোগল মিনিয়েচারের নাস্তালিক শৈলির বাংলা রূপে করেছেন। এভাবে বাংলার প্রাচ্যকলায় ক্যালিগ্রাফির ভিন্ন মাত্রা জনপ্রিয় হয়। সেখান থেকে প্রাচ্যকলায় বাংলা ক্যালিগ্রাফি না না ঢং ও রূপবৈচিত্র্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে। ২০১৭ সালে জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারীতে ৩য় জাতীয় প্রাচ্যকলা প্রদর্শনিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্যালিগ্রাফি এসেছে, ওরিয়েন্টাল আর্ট সোসাইটির সেক্রেটারি ও প্রাচ্যকলা বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান ফকিরের এক্রিলিকে করা ক্যালিগ্রাফিটি মোগল মিনিয়েচারের অর্গল ভেঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন ধারায় আত্ম প্রকাশ করেছে, এছাড়া অপরাপর কয়েকজন শিল্পী নিরীক্ষাধর্মী ক্যালিগ্রাফি করে প্রদর্শনির বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধিকে সফল এবং সার্থক করেছেন। প্রদর্শনিতে আরবি হরফের দুটি ক্যালিগ্রাফি বাংলার সুলতানি ঐতিহ্য স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রাচ্যকলায় বাংলার অতীত ঐতিহ্যের শেকড় কত গভীরে প্রোথিত তা এ ক্যালিগ্রাফির উপস্থাপনে ফুটে উঠেছে।
স্বর বর্ণ ও ব্যঞ্জন বর্ণ  মিলে বাংলা হরফ ৪৫টি, ৎ ং ঃ  ঁ চিহ্ন/হরফ ৪টি ১৮শ সালে সংস্কৃত শব্দ বাংলায় ঢুকানোর সুবিধার্থে যোগ করা হয়। এছাড়া ‘ক্ষ’সহ বহু যুক্তাক্ষর রয়েছে, ফলা ও কার যোগে হরফের চেহারা বদলে যায়। সুলতানি বাঙলায় হস্ চিহ্ন দিয়ে যুক্তাক্ষরের কাজ চালানো হত, তাতে হরফের চেহারা বদলানোর ঝামেলা ছিল না। মজার বিষয় হল, বাংলা হরফ আরবি উচ্চারণের সাথে মিল করে মাত্র ১৮টি করা হয় সে সময়। ১৫টি ব্যঞ্জন ও ৩টি স্বর বর্ণ দিয়ে বহু পুথি লেখা হয়েছে। মুসলমান কবি লেখকদের পুথিগুলোতে সে প্রমাণ ভুরি ভুরি রয়েছে। এখানে হরফের আকৃতিগত সাদৃশ্য মিল করে ক্যালিগ্রাফির জন্য ৭টি হরফ নেয়া হয়েছে। একে আমরা ‘দল সারণি’ বলতে পারি। হরফের বৈশিষ্ট্যগত গঠন বিবেচনায় ‘শরিফ’ ও ‘সানি’ ভাগে শৈলিকে ভাগ করা হয়েছে। ক্যালিগ্রাফি শিক্ষার ক্লাসে হাতে কলমে এটা শেখানো হয়। এছাড়া কলমের নিবের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যের জন্য স্ক্রিপ্ট ও পুষ্ট শৈলির ক্যালিগ্রাফি করা হয়।
ক্যালিগ্রাফির কম্পোজিশন বা সাজানো নিয়ে শিল্পী স্বীয় দক্ষতা হরফের গঠন, শৈলি ও বিষয়ের ওপর বিশেষ নজর দিয়ে থাকেন। তবে গোল্ডেন রেসিও কিংবা সমভাগ পদ্ধতি একটি বহুল প্রচলিত নিয়ম। কেউ কেউ হরফের আনুভূমিক বা উল্লম্ব রেখাকে চিত্রপটের বাইরে নিয়ে অসীম ভাবব্যাঞ্জনা এনে থাকেন।
প্রাচ্যকলায় মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ে ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার বহু প্রাচীন বিষয়। আবুল ফজল তার ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে চিত্রকলার যে আলোচনা করেছেন, সেখানে আলেখ্য অঙ্কনের চেয়ে ক্যালিগ্রাফির গুরুত্ব বেশি দিয়েছেন। মিনিয়েচারে ক্যালিগ্রাফি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে ছবিকে গৌণ এবং ক্যালিগ্রাফি মুখ্য হয়েছে। চীন-জাপানের চিত্রে ঠিক এর উল্টোটা দেখা যায়। সেখানে ক্যালিগ্রাফি আসে চিত্রের অনুসঙ্গ হিসেবে।
ক্যালিগ্রাফি শিল্পের অনুসঙ্গ, ভারসাম্য, ঐকতান, হরফের সাথে চিত্রের সম্পর্ক, রঙ-রেখার আশ্চর্য সম্মিলনে রচিত হয়ে থাকে। আধুনিক শিল্পচর্চায় ক্যালিগ্রাফি না না আঙ্গিকে ও ভাবব্যঞ্জনায় উপস্থাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্যালিগ্রাফি অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হোক এ প্রত্যাশা সকলের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ