ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 September 2018, ২২ ভাদ্র ১৪২৫, ২৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে---ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে মিয়ানমার সেনারা

৫ সেপ্টেম্বর, বিবিসি, রয়টার্স : মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা পরিচালনাকারী সেনা সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করতে চাপ দেবে যুক্তরাজ্য। গত মঙ্গলবার হাউস অব কমন্সে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনকারীদেরকে ‘অবশ্যই বিচারের আওতায়’ আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদেরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মুখোমুখি করার প্রস্তাব দিতে তিনি জাতিসংঘের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদেরকে আহ্বান জানাবেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে এক প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে।

গত বছরের আগস্টে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রাখাইনে পূর্ব পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওই অভিযানে জাতিগত নিধনযজ্ঞের আলামত পেয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘ মিয়ানমারের মানবাধিকার নিয়ে এক তদন্ত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছে। মিয়ানমার সরকার বারবারই দাবি করে এসেছে যে, নিরাপত্তার স্বার্থে এই অভিযান চালিয়েছে সেনাবাহিনী। কোন নিধনযজ্ঞ চালানো হয়নি। তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রত্যাখ্যানের মাত্রায় তারা হতবাক। সামরিক অভিযানে কখনোই হত্যা, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, শিশু নিপীড়ন ও গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মঙ্গলবার হাউস অব কমন্সে বক্তব্য দেওয়ার সময় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হান্ট বলেন, রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যুক্তরাজ্যকে ‘বিশেষ দায়িত্ব’ নিতে হবে। এ মাসের শেষের দিকে তিনি এ ব্যাপারে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন। পার্লামেন্ট সদস্যদের উদ্দেশ্য করে হান্ট বলেন, ‘যে আকার কিংবা কায়দায় অথবা যে জায়গাতেই জাতিগত নিধন হোক না কেন একে কখনওই বিচারের আওতামুক্ত রাখা উচিত নয়। এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সংগঠনকারীদেরকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সেখানে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, শিশুদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়েছে, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইনে বিধ্বংসী কর্মকা- চালানো হয়েছে ও গণহারে বিতাড়নের ঘটনা ঘটেছে।’

হান্ট জানান, তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘মন্ত্রীদের উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক’ আয়োজনে আগ্রহী। তবে তিনি এ কথাও স্বীকার করেছেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের কথা সুপারিশ করতে চাইলে এক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। আর নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য রাষ্ট্র এতে সমর্থন দেবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক খুব গভীর। মিয়ানমারবিরোদী যেকোনও প্রচেষ্টায় দেশটি ভেটো দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। হান্ট আরও জানান, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ ইস্যুটি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি মিয়ানমার সফরে যেতে চান।

দুই সাংবাদিকের প্রশংসা করা উচিত: মিয়ানমারের আদালত যে রায়ে রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে কারাদ- দিয়েছে, তা বাতিল করে অবিলম্বে তাদের মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স।

মঙ্গলবার এক টুইটে তিনি বলেছেন, ওয়া লোন এবং কিয়াও সো ও মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার যে ঘটনা উদঘাটন করেছেন, সেজন্য তাদের জেল না দিয়ে প্রশংসা করা উচিৎ।

শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যে জরুরি- সে কথাও মিয়ানমার সরকারকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়নের তথ্য সংগ্রহের সময় গ্রেপ্তার রয়টার্সের ওই দুই সাংবাদিককে গত সোমবার ঔপনিবেশিক আমলের রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে সাত বছরের কারাদ- দেয় ইয়াংগনের একটি আদালত।

রাখাইনের সেনা অভিযানের সময় ইনদিন গ্রামে ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করে লাশ পুঁতে ফেলার একটি ঘটনা বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন ওই দুই সাংবাদিক।

বরাবরই নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আসা এই দুই সাংবাদিক মামলার বিচারের সময় আদালতকে বলেছিলেন, গত ১২ ডিসেম্বর ইয়াংগনের এক রেস্তোরাঁয় দাওয়াত দিয়ে নিয়ে দুই পুলিশ সদস্য তাদের হাতে কিছু মোড়ানো কাগজ ধরিয়ে দেন এবং তার পরপরই সেখান থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

পশ্চিমা কূটনীতিবিদের কেউ কেউ এবং অধিকার সংগঠনগুলো দুই সাংবাদিকের এই বিচারকে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়ায় থাকা মিয়ানমারের জন্য একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখছিলেন। সাজার রায় আসার পর থেকেই দুই সাংবাদিকের মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন তারা।  

দুই সাংবাদিকের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা মঙ্গলবার ইয়াংগনে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ওয়া লোন এবং কিয়াও সো নির্দোষ, তাদের মুক্তি দিয়ে স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।  

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হেলি বলেছেন, রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে জেলে পাঠানো হয়েছে সত্য বলার অপরাধে। তাদের মুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র আরও সোচ্চার ভূমিকা নেবে। 

গতবছরের ২৫ অগাস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কয়েক ডজন নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার জবাবে সেনাবাহিনী ওই নির্মম দমন অভিযান শুরু করে। জাতিসংঘ বলছে, সেনাবাহিনীর ওই অভিযানে এ পর্যন্ত দশ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

রাখাইনে সেনাবাহিনীর ওই দমন-পীড়নের মুখে গতবছর অগাস্ট থেকে এ পর্যন্ত সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেখা হচ্ছে দক্ষিণ এ অঞ্চলের সবচেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠা শরণার্থী সঙ্কট হিসেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ