ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 September 2018, ২২ ভাদ্র ১৪২৫, ২৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ব্যাংকের প্রতারণা

দেশের ব্যাংক খাত নিয়ে আবারও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, অবৈধ পন্থায় বিদেশে অর্থ পাচার, খোদ মালিকদের অর্থ আত্মসাত এবং সুদের হার কমানোর মতো বিভিন্ন বিষয়ে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ অমান্য করাসহ বহুবার আলোচিত কিছু বিষয়ের পাশাপাশি এবার গ্রাহক তথা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ব্যাংকের প্রতারণা এসেছে আলোচনার প্রধান কারণ হিসেবে। গত মঙ্গলবার দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, দেশি-বিদেশি প্রায় সব ব্যাংকই বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড নিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে ভয়ংকর প্রতারণা করছে। লোভনীয় নানা বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে একবার কোনো গ্রাহক কোনো ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড নিলে এবং সেই কার্ড দিয়ে পণ্য কেনা ও নগদে অর্থ ঋণ নেয়া শুরু করলে তার পক্ষে জীবনে কখনো আর দায়মুক্ত হওয়া সম্ভব হয় না।
ক্রেডিট কার্ডের এক একটি হিসাবের বিপরীতে প্রতি বছর কেবল সার্ভিস চার্জ হিসেবেই দেড় থেকে দু’ হাজার টাকা পর্যন্ত কেটে রাখা হচ্ছে। ব্যাংকগুলো একই সঙ্গে এসএমএস পাঠানো এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং-এর জন্যও বছরে একজন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে ৫৭৫ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত কেটে নিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আপত্তির কারণ হলো, কোনো গ্রাহক এসএমএস পাওয়ার এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং-এর সুবিধা নেয়ার ব্যাপারে রাজি না হলেও তার কাছ থেকে টাকা কাটা হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশি ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ডের সুদ আদায়ের ক্ষেত্রে রীতিমতো চৌর্যবৃত্তি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও কোনো গ্রাহক কখনো তার অ্যাকাউন্ট বা হিসাবের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন না। ব্যাংকগুলো নানা অজুহাতে পাশ কাটিয়ে যায়। অবস্থা এমন হয়েছে যেন শুধু সুদে ও আসলে পাওনার পরিমাণ বাড়ানোই ব্যাংকের কাজ! এর ফলে একবার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার শুরু করলে সুদ আর আসলের ফাঁদে পড়ে আটকে যান গ্রাহকরা।
ভুক্তভোগী অনেক ক্রেডিটকার্ড ব্যবহারকারীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে সুদ আরোপ ও আদায়ের নিয়মকানুনের ব্যাপারে প্রায় সব ক্ষেত্রেই বহু সত্য গোপন রাখা হয়। গ্রাহকরা জানতে পারেন মাসের নির্দিষ্ট তারিখের পর- যখন সুদে-আসলে অবিশ্বাস্য পরিমাণে অর্থ পরিশোধের জন্য তার নামে বিল বা নোটিশ আসে। ব্যাংকের আইন মেনে সময়ে সময়ে টাকা জমা দেয়া সত্ত্বেও ক্রেডিটকার্ড ব্যবহারকরীরা অনেক বেশি টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হন। তারপরও খুব কমসংখ্যক গ্রাহকই নিস্তার পান। পরের মাসে আবারও আগের মতো কিংবা তার চাইতেও বেশি অর্থ তাকে পরিশোধ করতে হয়।
জানা গেছে, কার্ড ইস্যু করার সময় ১৬ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদের কথা বলা হলেও বাস্তবে ব্যাংকগুলো ৩০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করছে। সুদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রায় সব ব্যাংকই শুভংকরের ফাঁকির নীতি-কৌশল অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সুদ নির্ধারণসহ কোনো বিষয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। উল্লেখ্য, গত বছর ২০১৭ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত নীতিমালায় বলা হয়েছিল, কোনো ব্যাংক শতকরা যে হারে বাণিজ্যিক বা ভোক্তা ঋণ দিয়ে থাকে ক্রেডিট কার্ডের সুদের ক্ষেত্রে তার চাইতে পাঁচ শতাংশের বেশি সুদ আরোপ বা আদায় করা যাবে না। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো এমনকি ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য হারেও সুদ আদায় করছে। জানা গেছে, এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে নীতি পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ১৮টি দেশি-বিদেশি ব্যাংককে নোটিশ দিয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যাংকের পক্ষ থেকেই সন্তোষজনক জবাব দেয়া বা পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
এভাবেই ক্রেডিট কার্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাংকগুলো জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভয়ংকর ক্ষতির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। আপত্তির কারণ হলো, ক্ষতির শিকার যাদের বানানো হচ্ছে তাদের অর্থাৎ আমানতকারীদের জমা রাখা অর্থ থেকেই ব্যাংকগুলো বাণিজ্যিক ঋণ দেয়াসহ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। বিশ্বব্যাপী প্রচলিত ব্যাংকিং খাতের এ নিয়মের মূল কথা হলো, সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ থেকে বাণিজ্যিক ঋণ দেয়া ও কার্যক্রম চালানো হবে এবং সে অর্থের বিপরীতে আদায় করা সুদের অর্থ থেকে ব্যাংকগুলো আবার আমানতকারীদের সুদ বা মুনাফা দেবে। দ্বিমুখী এই লেনদেনই বিশ্বের সকল বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম। বাণিজ্যিক ঋণের বিপরীতে সুদ হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ এবং সাধারণ আমানতকারীদের দেয়া সুদ বা মুনাফার মাঝখানে যে অর্থ অবশিষ্ট থাকবে সেটাই একটি ব্যাংকের লাভ বা মুনাফা হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। একই কারণে বাণিজ্যিক ঋণ এবং আমানতের সুদের মধ্যে বেশ পার্থক্য রাখা হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশে বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড এবং বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে চালানো হচ্ছে স্বেচ্ছাচারিতা। সম্ভাব্য সকল পন্থায় আমানতকারীদের ঠকানোর তথা বঞ্চিত করার ভয়ংকর কর্মকান্ড তো চলছেই, একই সঙ্গে বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের জিম্মি করা হচ্ছে সারা জীবনের নামে। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর প্রতারণা ও চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে পদক্ষেপ নেয়া। এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার- যাতে কোনো ব্যাংকের পক্ষেই কোনো গ্রাহককে সুদের গোপন ফাঁদে ফেলে চুক্তির বাইরে বেশি অর্থ আদায় করা সম্ভব না হয়। ক্ষুদে আমানতকারী এবং ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও এমন কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা দরকার, ব্যাংকগুলো যাতে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অজুহাত দেখিয়ে সার্ভিস চার্জ আদায় করতে না পারে। প্রতিটি বিষয়ে ব্যাংকগুলো যাতে ঋণগ্রহণকারী, আমানতকারী এবং ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের আগেই অবহিত করতে বাধ্য হয়- সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা চাই, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নামে কোনো শ্রেণীর গ্রাহককেই যাতে বিপন্ন হতে না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ