ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 September 2018, ২২ ভাদ্র ১৪২৫, ২৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে ফ্যাসিস্ট সরকারের সকল কূটকৌশল বানচাল হবে

গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত ইভিএম বর্জন জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক জোট শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

* আজ ফ্যাসিস্ট সরকার গণতন্ত্রের ওপর হামলা করেছে - মির্জা ফখরুল
* বর্তমান স্বৈরাচার সরকারকে হঠাতে আমরা ঐক্যবদ্ধ -ড. কামাল
* দেশে এক ব্যক্তি, এক দলীয় শাসন চলছে   -বি চৌধুরী
* বাংলার জনগণ ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ মানবে না - আ স ম রব
* এই সরকার চোর। এই সরকারকে জনগণকে আর চায় না - মান্না
স্টাফ রিপোর্টার: রাজনীতির এক মঞ্চে উঠে একসঙ্গে আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের ‘পতন ঘটাতে চান’ ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে ফ্যাসিস্ট সরকারের সকল কূটকৌশল ভেস্তে যাবে বলে বললেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল, বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে গতকাল বুধবার বিকেলে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত ‘ইভিএম বর্জন জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক জোট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানোর তাগিদ দেন তারা। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন গণফোরাম সভাপতি ও যুক্তফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন, বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সভাপতি সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম প্রমুখ।
কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনায় বসার সম্ভাবনা সরকারের পক্ষ থেকে নাকচ করে দেওয়া হলেও ফের সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, আমরা বারবার অনুরোধ করেছি, আসুন দাম্ভিকতা-আত্মম্ভরিতা পরিত্যাগ করে জনগণের জন্য, মানুষের জন্য কথা বলুন, সংলাপ করুন। কথা বলে একটা রাস্তা বের করুন, যেন দেশে একটা সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে’ উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে ধ্বংস হতে দিতে পারি না। দেশ ও জাতির প্রয়োজনে ন্যূনতম কর্মসূচির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হই। দেশকে বাঁচাতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি।
ফখরুল বলেন, ‘বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আটকে রাখার জন্য জেলখানায় আদালত বসানো হয়েছে। সরকার আইনের লঙ্ঘন করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে এরকম কোনো নজির নেই। তিনি বলেন, ‘যেখানে আদালত করা হয়েছে, সেটি ছোট একটি রুম। অন্ধকার। হুইল চেয়ার নিয়ে এসেছেন। বেগম জিয়া বলেছেন, এখানে তিনি আর যাবেন না।’
কারাগারে আদালত বসিয়ে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার বিচার করার বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, এটা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ব্রিটিশ আমলে স্বদেশী আন্দোলনের সময় দেশের জন্য যারা সংগ্রাম-লড়াই করেছিল, তাদের এ ধরনের ক্যামেরা ট্রায়ালে বিচার করা হয়েছিল। আমরা ১৯৭১ সালে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যামেরা ট্রায়াল করে হত্যা করা হয়েছে। আজকে স্বাধীনতার ৪৮ বছরের পর ক্যামেরা ট্রায়ালের আদালতে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার বিচার করা হচ্ছে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজ ফ্যাসিস্ট সরকার গণতন্ত্রের ওপর হামলা করেছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে ভৌতিক মামলা করেছে। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে পাকিস্তানের নির্মমতা দেখেছি। বর্তমান সরকার কি এখন কম নির্যাতন করছে? আসুন, আমরা দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি। বেগম জিয়াসহ সব রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নির্বাচনের আগে মুক্তি দিতে হবে। নির্বাচনের সময় জনগণের নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে বলেন ফখরুল।
অনুষ্ঠানে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ গড়তে, অতীতে স্বৈরাচার সরকার হঠাতে জনগণের ঐক্য হয়েছিল। আজও সেইরকম একটি বৃহত্তর ঐক্য হতে যাচ্ছে, বর্তমান স্বৈরাচার সরকারকে হঠাৎ। অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করুন। জনগণ দেশের মালিক। সংবিধানেও সে কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চাই না। দেশের জনগণ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনে ব্যবস্থা করতেই হবে। জনগণের দাবি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।’
ড. কামাল বলেন, ‘সামনে আমাদের অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। স্বৈরাচার সরকারের পতনের জন্য আমরা অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছিলাম। সমাজ থেকে অন্যায়কে মুক্ত করতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সংবিধান ও মূল্যবোধের স্বপক্ষে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হই। তিনি বলেন, ‘আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যারা আমাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে চায়, তাদের চিহ্নিত করবেন।’
বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘আজ দেশ সংকটের মধ্যে আছে। দেশে এক ব্যক্তি, এক দলীয় শাসন চলছে। দেশের উন্নয়ন করছেন, ভালো কথা। আমরাও উন্নয়ন চাই। উন্নয়নের নামে গণতন্ত্রকে ধাক্কা দেবেন, তা হবে না। জনগণ আর সহ্য করবে না। গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র চালাবেন, তা বাংলার মানুষ মেনে নেবে না। হাতুড়ি দিয়ে, বন্দুক দিয়ে জনগণের ওপর হামলা করবেন আর জনগণ সহ্য করবে, তা ভাববেন না। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ছড়াকার আখ্যায়িত করে বলেন, ছড়া লিখুন, বলুন অসুবিধা নেই। গণতন্ত্রকে ঠিক রাখুন, জনগণের দাবি মেনে নিন।
বি. চৌধুরীর বলেন, মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শিখুন। প্রতিহিংসা পরিহার করুন। আমরা রাজপথে আছি দেশে শ্রদ্ধার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে। প্রতহিংসার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। হাতুড়ির রাজনীতি জনগণ চায় না। জনগণ আগামী নির্বাচনে এর দাঁতভাঙা জবাব দেবে। তিনি বলেন, এই সরকারের পতনের জন্য আমরা সারাদেশ সফর করব, জনগণের কাছে যাব।
সাবেক রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া নির্বাচন কমিশন কোনোরকম ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করার ঘোষণা আসতে পারে না। এতেই প্রমাণ হয়, নির্বাচন কমিশন সরকারের ইশারায় চলে। এই নির্বাচন কমিশন বিকলাঙ্গ। বি চৌধুরী বলেন, ‘হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ তার উন্নয়ন কর্মকা- দেখিয়ে কিছু করতে পারেনি। আপনার উন্নয়নের কথা বলে সবকিছু ধামাচাপা দিতে পারবেন না।’
এ সরকারকে জনগণ ‘চায় না’ এই সরকারকে বিদায় করতে হবে উল্লেখ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘আসুন, এক মঞ্চে উঠে এই স্বৈরাচার সরকারকে বিদায় করি। ‘সংবিধানের প্রতি শেখ হাসিনার শ্রদ্ধা থাকলে খালেদা জিয়ার মামলার কার্যক্রম জেলখানায় হতো না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিহিংসার আচরণ করছেন।’
রব বলেন, ‘ইভিএম ব্যবহার করে এ দেশে ভোট হবে না। বাংলার জনগণ ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ মানবে না। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ১০০ বছরের পরিকল্পনা করছেন। আমার প্রশ্ন, আপনি কত বছর বাঁচবেন? আমাদের এবং জনগণকে বোকা বানাবেন না। এ সরকার ১৬ কোটি মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই সরকারের আমলে অনেক মামলা হয়েছে, যা পাকিস্তান আমলেও হয়নি। তিনি বলেন, বেগম জিয়ার বিচার কাজ জেলখানায় হতে দেওয়া হবে না।
রব বলেন, ‘আমরা সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাই। আওয়ামী লীগের ভরাডুবি করতে চাই।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘এই সরকার চোর। এই সরকারকে জনগণকে আর চায় না। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাতে হবে। ‘এ সরকার চোর। শেয়ার বাজার, বনজঙ্গল, পানি, পাথর, কয়লা, জমি সব খেয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমি কাঁদি। হ্যাঁ, আমি কাঁদি, প্রধানমন্ত্রীকে দেখে কাঁদি। আওয়ামী লীগকে দেখে কাঁদি। আর আমি যদি লিখি, তাহলে চোর বলে লিখতে হবে। লিখতে গেলে শেষ করা যাবে না।’
মান্না আরও বলেন, ‘এ সরকারকে জনগণ চায় না। জনগণ বোঝে, কাকে কীভাবে শায়েস্তা করতে হয়। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সিলেটে ত্রাস করেছে, খুলনায় করেছে, রাজশাহীতে করেছে। সিলেটে ত্রাস করেও জিততে পারেনি। জনগণ জবাব দিয়েছে। ‘ইভিএম-এর জন্য যে এলসি খোলা হয়েছে, টাকা কই? হিসাব নেওয়া হবে। সরকারের পতন ঘটাতে হবে। আমরা সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই। সুষ্ঠু, অবাধ নিরপেক্ষা নির্বাচন চাই। এই দাবিতে রাজপথে নামব।’ আমাদের আন্দোলনের মুখে সরকারকে মাথা নত করতে হবে বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমার দেশের প্রধানমন্ত্রীর যে ক্ষমতা আছে, সে ক্ষমতা মোঘল সম্রাটেরও ছিল না। আমরা এত বড় ক্ষমতাবান প্রধানমন্ত্রী চাই না। ভারসাম্যের সরকার চাই। চিন্তা করেন, সাবেক তিন বারের প্রধানমন্ত্রীকে জেলখানার মধ্যে আদালত গঠন করে বিচারকাজ করছেন। বেগম জিয়াকে মুক্ত করে আনতে হবে।’ বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সভাপতি সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, আজকে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করছেন। সুষ্ঠু-অবাধ নির্বাচন দিতে কেন এত ভয় পান। জনগণের ওপর কেন এতো অনাস্থা। কারণ একটাই, আপনারা আপনাদের জায়গা থেকে সরে গেছেন। আপনারা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছেন। অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করাই বাঙালির বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো কিছু অসম্ভব নয়, যদি ঐক্যবদ্ধ হই। জাতীয় স্বার্থে সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘হাজার নেতাকর্মীকে জেলে আটক রাখা হয়েছে। সরকার একটি পাতানো নির্বাচন করার জন্য এই নিপীড়ন নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। আমি আশা করি, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে ফ্যাসিস্ট সরকারের সকল কূটকৌশল ভেস্তে যাবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোনো সরকার যদি জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হয়, সে সরকার জনগণের জন্য কাজ করবে। জনগণ দ্বারা নির্বাচিত না হলে সে সরকার কখনও জনগণের জন্য কাজ করতে পারে না। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘৫ জানুয়ারি নির্বাচন সংবিধান রক্ষার জন্য। পরে তিনি মিড-টাইম (মধ্যমেয়াদি) নির্বাচন দেবেন। কিন্তু তিনি তার কথা থেকে সরে গেছেন। তিনি বলেন, ‘দেশ এখন মহাসংকটে। এ থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করা দরকার।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ