ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 September 2018, ২২ ভাদ্র ১৪২৫, ২৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশব্যাপী বিরোধী নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় বাসায় তল্লাশি

# বিরোধীদের এভাবে কোণঠাসা করে রাখা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে বড় বাধা
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: চলতি বছরের শেষের দিকেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার কথা। সে হিসেবে আর মাত্র তিন বাস বাকি। নির্বাচনের অন্যতম সৌন্দর্য হলো সবাই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ পাবে। নির্বাচনী মাঠ সবার জন্য সমান হবে। কিন্তু এসবের ধারেকাছেও নেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারা মুখে নির্বাচনের কথা বলে দেশব্যাপী বিরোধী নেতাকর্মীদের ধরপাকড় চালাচ্ছে। চলছে গণহারে গ্রেফতার। বিএনপির অভিযোগ গত কয়েকদিনেই পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঈদের পর থেকে সেই হিসেব দেড় হাজার ছাড়েিয় যাবে বলে দলটি জানায়। জানা গেছে, দলের মধ্যম সারি থেকে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অনেকেই এখন ঘরছাড়া।  বিএনপি বলছে, আন্দোলন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতেই সরকার দেশব্যাপী এ ধরপাকড় চালাচ্ছে। এ কারণে গ্রেফতার অভিযানের পাশাপাশি পুরনো মামলাগুলো সচল করা হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, যাদের আটক করা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০-দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা যাতে রাস্তায় নামতে না পারেন সেজন্য আগেভাগেই সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন দলীয় পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, গত সাড়ে ৯ বছরে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৬০ হাজার। এসব মামলায় আসামীর সংখ্যা ২০ লাখ। ইতোমধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার নেতাকর্মী জেল খেটেছেন। তিনি বলেন, বিএনপির ৩ হাজার নেতাকর্মীকে এই সময়ে খুন করা হয়েছে। গুম করা হয়েছে ৭২৮ জনকে। গুম হওয়া কিছু নেতাকর্মীর লাশ পাওয়া গেলেও অধিকাংশেরই কোনো হদিস নেই। বিএনপির তথ্য অনুযায়ী, বেগম খালেদা জিয়ার কারাদ-ের পর গ্রেফতার করা হয়েছে ১০ হাজার নেতাকর্মীকে।
 বেগম খালেদা জিয়া ছাড়াও সিনিয়র নেতাদের মধ্যে প্রায় দুই ডজন নেতা কারাগারে রয়েছেন কিংবা দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এদের মধ্যে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ ভারতে, ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ড. ওসমান ফারুক যুক্তরাষ্ট্রে, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ বিদেশে, আব্দুস সালাম পিন্টু জেলে, উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালু সৌদি আরবে, যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী জেলে, আন্তর্জাতিক সম্পাদক এহছানুল হক মিলন যুক্তরাষ্ট্রে, নাসির উদ্দিন অসীম লন্ডনে, সহসাংগঠনিক সম্পাদক নান্নু জেলে, নির্বাহী কমিটির সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর জেলে, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এম এ কাইয়ুম মালয়েশিয়ায়, মহানগর দক্ষিণের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক হাবিবুর রশীদ হাবিব জেলে এবং যুবদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু কারাগারে রয়েছেন।
সূত্র জানায়, সারা দেশে বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন মামলাও হচ্ছে। আবার পুরনো মামলাগুলো সচল করেও কাউকে কাউকে গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। এর মধ্যে দলের কারাবন্দী চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেই ৩৫টি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে সাজার রায় দেয়া হয়েছে। লন্ডন অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর বড় অংশই মানহানির মামলা। দুর্নীতির এক মামলায় তাকে সাত বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ও দোরগোড়ায়। প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা বলছেন, গ্রেনেড হামলা মামলার সাথে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান সরাসরি জড়িত।  দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে ৮৬টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধে ১৪, ড. খন্দকার  মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে ২০, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১০টি করে, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার বিরুদ্ধে ৩৬, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে অন্তত অর্ধশত করে মামলা রয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, পহেলা সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশে বিএনপি যে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে তাতেই নেতা-কর্মীদের ওপর নতুন করে মামলা ও গ্রেফতারের খড়গ নেমে আসে। এখন শুনছি পুরনো মামলাগুলোও সচল করা হচ্ছে। আবার নিত্যনতুন মামলা করা হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনকে ব্যাহত করতেই সরকার আতঙ্কিত হয়ে এ কাজ করছে।
পুলিশের সদর দফতরের উপ-মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) রুহুল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, কারও বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা থাকলে পুলিশ তার কর্তব্য করতে বাধ্য। এর বাইরে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারও বাড়িতে হানা দিচ্ছে বা কাউকে গ্রেফতার করছে এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি যখন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে তখনই সরকার গ্রেফতার বাণিজ্য শুরু করেছে। সরকার চায় না বিএনপি নির্বাচনে আসুক। কারণ, বিএনপি নির্বাচনে এলে সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী-এমপিই জামানত হারাবে। তবে মামলা-হামলা বা গ্রেফতার যাই হোক বিএনপি পিছপা হবে না। আন্দোলনের মাধ্যমে বেগম জিয়াকে মুক্ত করে নির্বাচনে যাবে বিএনপি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, গত কয়েক দিনে বিএনপির মধ্যম সারির নেতাদের বাসায় দফায় দফায় পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। নেতাকে না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে দুর্ব্যবহার করছে। অনেককেই নাজেহালও করা হচ্ছে। এর মধ্যে দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেলের বাসায় দুই দফায় অভিযান চালায় পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। অবশ্য ১ সেপ্টেম্বর নয়াপল্টনে জনসভায় হঠাৎ দেখা মেলে তার। জনসভায় বক্তব্য দিয়ে আবারও আড়ালে চলে যান বিএনপির এই নেতা। এ ছাড়া বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, সহ-স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদল সভাপতি রাজিব আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসানসহ অনেক নেতার বাসায় অভিযান চালানো হয়। এ কারণে মধ্যম সারি থেকে শুরু করে ঢাকা মহানগরের তৃণমূলের নেতারাও এখন আত্মগোপনে চলে গেছেন।
ধরপাকড় প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশব্যাপী আবারও নতুন করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে অথবা নিজেরাই নাশকতার মতো ঘটনা ঘটিয়ে বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নামে মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে। ঈদের পর থেকে এ পর্যন্ত সহ¯্রাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নতুন মামলা হয়েছে কয়েক হাজার। সরকার মূলত আতঙ্কে ভুগছে। বিএনপি জানায়, বিএনপির কেন্দ্রীয় বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ, তার ছেলে তানভীর আহমেদ রবিন, আনোয়ার হোসেন মজুমদার, আবু নাসের ফকির, জাফর আহমেদ, বাবুল তালুকদার, সুমন আহমেদ, রাকি সরদারসহ ৬০-৬৫ জনের নামে নতুন করে নাশকতার মামলা করা হয়েছে। একইভাবে শ্যামপুর থানায় ৯৮ জন, ডেমরা থানায় ১০৫ জন, ওয়ারী থানায় ২২৫ জন, সূত্রাপুর থানায় ১৩ জন, যাত্রাবাড়ী থানায় ৯৯ জন এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। বিএনপি বলছে, ককটেল বা অন্যান্য বিস্ফোরক বস্তু দেখিয়েও বিএনপি নেতাদের নামে নতুন করে মামলা দেওয়া হচ্ছে।
সারা দেশে সাম্প্রতিক সময় নতুন মামলার চিত্র তুলে ধরে বিএনপি জানায়, বগুড়ায় জেলা যুবদলের সভাপতি সিপার আল বখতিয়ারসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক ও জীবন বিপন্ন চেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের করে। এ ছাড়া যুবদল নেতা সোহাগ, সজীব, শৈবাল, প্রবাল, রাহী, টফিন, মামুনসহ অজ্ঞাত ২৫ জনের বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে আরেকটি মামলা দায়ের করে। শাহজাহানপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল বাশারসহ ৩৩ জনের নামে মামলা দায়ের করে পুলিশ। বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট সদর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার, শ্রমিক দল নেতা মনিরুল সরদার, জামাল শেখ, যুবদল নেতা মো. মোদাচ্ছের মেম্বারকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ ছাড়া দলীয় পোস্টার লাগানোর অপরাধে শতাধিক নেতা-কর্মী ঘরছাড়া। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদসহ চারজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। পৌর বিএনপির হাজী আমিনুল ইসলাম আমিনসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়। এ ছাড়া হালুয়াঘাট উপজেলায় ৪৫ জন এবং ধোবাউড়ায় ৪৩ জন, তারাকান্দা ঈশ্বরগঞ্জ, গৌরীপুর, শেরপুর, জামালপুরের মাদারগঞ্জ ও ইসলামপুরে ৫০ জনের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ছাড়া ময়মনসিংহ জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি লিটন আকন্দ, ছাত্রদল সভাপতি রোকনুজ্জামান রোকনসহ ১৫৫ জনের বিরুদ্ধে নাশকতামূলক মামলা দায়ের করা হয়। নেত্রকোনা জেলায় ১৫৭ জন, নড়াইলে ৩৫ জন, নওগাঁয় ৪০০ জন, ঝিনাইদহে ১০১ জন, নারায়ণগঞ্জে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমুর আলম খন্দকার, বিএনপি নেতা কাজী মনির ও মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দীপুসহ ৫৭ জন এবং সুনামগঞ্জের তাহেরপুরে ৪ শতাশিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নওগাঁর আত্রাই উপজেলা বিএনপির চার শতাধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ।
বিএনপি জানায়, গত কয়েকদিন পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক খাইরুল ইসলাম সজিবসহ ১৪ জন, নাটোর বড়াইগ্রাম পৌর বিএনপি সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল মজিদ সরকার, বড়াইগ্রাম উপজেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক সরকার, ছাত্রদলের সভাপতি শাহাদত হোসেন শামীমসহ ৮ জন,  কুষ্টিয়া জেলাধীন মিরপুর উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মোঃ রহমত আলী রব্বান সহ মোট ২৭ জন, নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার চন্দনবাড়ী ইউনিয়ন সভাপতি ইকবাল আহমেদ, কাঁচিকাটা ইউনিয়ন বিএনপি’র সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ মুক্তারসহ ১৩ জন,  বগুড়া  সদর উপজেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও গোকুল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ স¤ক্সাদক আইযুব খান, খুলনা জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ৩০ জন,  কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল বারীসহ৫০ জনের অধিক, রাজশাহী চারঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান  আবু সাঈদ চান ও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউনুছ আলী তালুকদারসহ ১৬ জন, ভোলা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ ট্রুম্যান, বনানী থানা শ্রমিক দলের সভাপতি আবদুল কাদেরসহ ৮ জন, কুষ্টিয়া জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব, কমিশনার মহিউদ্দিন মিলনসহ ৫৮ জন,  চট্রগ্রাম উত্তর জেলাধীন বারোইহাট পৌর বিএনপির আহবায়ক দিদারুল আলম মিয়াজী, মিরের সরাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক কাজী নিজাম উদ্দিন, সাবেক চেয়ারম্যান মুসা মিয়াসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন একদিকে নির্বাচনের কথা বলছে। অন্যদিকে নির্বাচনের মাত্র তিনমাস আগেও সঙ্কুচিত করে রাখা হয়েছে বিরোধীদের সভা-সমাবেশের অধিকার। চলছে সারাদেশে ধরপাকড়। নির্বাচনী প্রচারণা তো দূরের কথা, মামলার কারণে এই আদালত, এই কারাগারÑ এভাবে দিন কাটছে লাখো নেতা-কর্মীর। এছাড়া বিরোধীদের ঘরোয়া সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নির্বাচনী বছরে একটি বড় দলকে এমনভাবে কোণঠাসা করে রাখা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে বড় বাধা। তাদের মতে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একটি বিতর্কিত নির্বাচনের প্রেক্ষিত থাকার পরেও একাদশ নির্বাচন নিয়ে সরকারি দলের মধ্যে কট্টর অবস্থার পরিবর্তন না হওয়া অশনি সঙ্কেত। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একাদশ সংসদ নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করার কথা বলেছে নির্বাচন কমিশন। অথচ নির্বাচন প্রস্তুতির এই সময়ে রাজনীতির মাঠ দারুণভাবে অসমান্তরাল। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা তুমূল শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা এক বছর আগে থেকেই নির্বাচনী সমাবেশ করছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরাও রয়েছেন নির্বাচনী মাঠে। ঠিক বিপরীত চিত্র বিএনপিতে।
একাধিক সূত্র বলেছে, ২০-দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযানের সিদ্ধান্ত ঈদের আগেই হয়ে গেছে। সেই সিদ্ধান্ত মতেই এই অভিযান চলছে।  তালিকা ধরে ধরে এই গ্রেফতার অভিযান চলবে। যারা আগামী নির্বাচনে নূন্যতম ভ’মিকাও রাখতে পারবে বলে মনে হবে তাকেই গ্রেফতার করা হবে। এরই মধ্যে অনেকের ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া শুরু করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
পিরোজপুরের এক যুবদল নেতা জানান, তিনি পাঁচ বছর ধরেই ঢাকায় অবস্থান করছেন। তার বিরুদ্ধে মোট ১৪টি মামলা রয়েছে। কয়েকবার গ্রেফতারও হয়েছেন। এখন গ্রেফতার এড়ানোর জন্যই ঢাকায় অবস্থান করছেন। দেখা যায় গ্রেফতার হলেই একের পর এক পেন্ডিং মামলার আসামী হতে হয়। ওই নেতা জানান, সম্প্রতি পুলিশ আবার তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেয়া শুরু করেছে। এমনকি, ঢাকার ঠিকানা খুঁজে বের করারও চেষ্টা চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। যে কারণে আজ এখানে কাল ওখানে অবস্থান করতে হচ্ছে। ওই যুবদল নেতা বলেন, খুবই মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি। একের পর এক মামলায় তার পরিবারও এখন দিশেহারা। ঢাকার কামরাঙ্গিরচরের এক বিএনপি নেতা বলেন, গত কয়েক মাস তিনি একটু ঝামেলামুক্ত ছিলেন। পুলিশ তেমন খোঁজাখুঁজি করেনি। এখন আবার খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। বাড়ির সামনে সাদা পোশাকের লোকজনের ঘোরাঘুরি বেড়েছে। আশপাশের মানুষের কাছে তার সম্পর্কে জানতে চাইছে।
বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে নতুন মামলা হচ্ছে। অনেকে বছরের পর বছর এলাকায় যেতে পারছেন না। বাড়িঘরে অবস্থান করতে পারছেন না। রাজনৈতিক কোনো ঘটনা ঘটলেই তারা এলাকায় না থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। এভাবে অনেকের বিরুদ্ধে ডজনে ডজনে মামলা রয়েছে। এর মধ্যেও জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ সময় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান চলবে এটাই স্বাভাবিক। নেতারা বলেছেন, কর্মসূচি শুরু হলে গ্রেফতার অভিযানও শুরু হবে। অতীতেও তারা দেখেছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট যখনই কোনো কর্মসূচি দিয়েছে, তখনই গ্রেফতার অভিযান শুরু হয়েছে। সদ্যসমাপ্ত কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়ও বিরোধী প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের ব্যাপকহারে গ্রেফতার করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ