ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 September 2018, ২২ ভাদ্র ১৪২৫, ২৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ক্রিকেটারদের আচরণই বড় সমস্যা

অরণ্য আলভী তন্ময় : পৃথিবীতে সব পেশার মানুষদের খেয়ালী চরিত্রের কথা শোনা যায়। বিশেষ করে যারা কষ্ট করে বেড়ে ওঠেন তাদের খেয়ালী জীবন নিয়ে একটু বেশি আলোচনা হতে দেখা যায়। এই যেমন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আচার আচরণ নিয়ে এখন একটু বেশিই আলোচনা হচ্ছে। আচরণের সমস্যার একেকজন পড়ছেন একেকরকম বিপদে।
অসাধারণ প্রতিভাবান ফুটবলার জর্জ বেষ্ট বিশ্বকাপ খেলেননি। আর পেলে কিংবা ম্যারাডোনার সমকাতারের ভাবা হয় না তাই এই আইরিশ ফুটবলারকে। ফুটবলার বেস্ট যতটা আলোকিত, তার চেয়েও বেশি সমালোচিত বেহিসেবি জীবনের জন্য। ম্যাচের আগে বান্ধবীদের নিয়ে যে লীলাখেলা করতেন, সেটা আবার ঘটা করে দেখাতেন ক্লাব সঙ্গীদের। বেস্টের মতো হয়তো বেহিসেবি নন সাব্বির রহমান রুম্মান, নাসির হোসেন, তাসকিন আহমেদ, রুবেল হোসেন, শাহাদাত হোসেন রাজীব, আল-আমিন হোসেন, আরাফাত সানি, মোহাম্মদ শহীদরা। কিন্তু যেভাবে তাদের অন্ধকার জীবন প্রকাশিত হচ্ছে দিন দিন, তাতে এমনটা বলাই যায় জর্জ বেস্টের চেয়ে পিছিয়ে নেই তারা। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বে জনপ্রিয়দের তালিকায় সবার উপরে ক্রীড়াবিদরা। জনপ্রিয়তায় সাকিব, মাশরাফিরা যে কারো চেয়ে এগিয়ে যোজন যোজন। এমন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে একের পর এক অপকর্ম করে চলেছেন সাব্বিররা। অপকর্ম করছেন অন্যরাও। কিন্তু আমজনতার স্বপ্নের নায়ক বলেই এন্তার অভিযোগ ক্রিকেটারদের নিয়ে। সাব্বির, নাসিরদের বিরুদ্ধে শুধু দর্শক পেটানোর অভিযোগ নয়, নারী সংস্পর্শ, বউ পেটানো, এমনকি গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। ক্রিকেটারদের বিচার সালিশি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার পথে বিসিবি। ম্যাচ পাতানো, শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল, সাকিব আল হাসানরা। শোধরানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে দ্বিতীয়বার অপকর্ম করে আবারও নিষিদ্ধ হলেন সাব্বির। ১১ টেস্ট, ৫৪ ওয়ানডে ও ৪১টি টোয়েন্টি-২০ ম্যাচ খেলে প্রতিভার প্রমাণ রেখেছেন রাজশাহীর এই তরুণ ক্রিকেটার। প্রতিভাবান হলেও বেহিসেবি জীবনযাপনের জন্য আলোচনার খোড়াক জুগিয়ে গেছেন সবসময়। জানুয়ারিতে জাতীয় লিগ চলাকালীন দর্শক পিটিয়ে নিষিদ্ধ হন প্রথমবার। ২০ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি তখন ৬ মাস নিষিদ্ধ হন সব ধরনের ঘরোয়া ক্রিকেটে। এবার নিষিদ্ধ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে বাজে পারফরম্যান্সের জন্য তাকে ভৎর্সনা করেন দর্শকরা। ক্ষিপ্ত সাব্বির ফেইসবুকে নিজের ভ্যারিফায়েড পেজ থেকে দুই দর্শককে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে সমালোচিত হন। বিসিবির ডিসিপ্লিনারি কমিটির তদন্তের মুখে স্বীকার করেন কৃতকর্ম। শুধু দর্শক পেটানো কিংবা ভয় দেখানোই নয়, নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০১৬ সালে বিপিএল চলাকালীন রাতে হোটেল রুমে মেয়ে অতিথি এনে চুক্তির ৩০ শতাংশ বা ১৩ লাখ টাকা জরিমানা গুনেন। শুধু তাই নয়, পরিচিত এক মডেলের সঙ্গে তার আপত্তিকর সম্পর্কের কথা শোনা যায়। টিমমেট মেহেদী হাসান মিরাজের গায়ে হাত তোলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু সাব্বির কেন, গত ৩/৪ বছরে রুবেল, আল-আমিন, আরাফাত, শাহাদাত, নাসির, শহীদদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ ছিল না। মডেল ও অভিনেত্রী নাজনীন আক্তার হ্যাপীর অভিযোগে জেলও খাটতে হয়েছিল রুবেলের। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে রুবেলের বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক করার অভিযোগ এনেছিলেন হ্যাপী। এই অভিযোগ থেকে রুবেল মুক্তি পান বিশ্বকাপ ক্রিকেটের পরপর। আরেক পেসার আল-আমিনকে শৃঙ্খলা ভঙের জন্য বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মাঝামাঝি সময়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরত পাঠানো হয় দেশে। ২০১৬ সালে বিপিএল চলাকালীন হোটেল কক্ষে নারী অতিথি এনে মূল পারিশ্রমিকের ৫০ শতাংশ জরিমানা গুনতে হয় তাকে। গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলায় পেসার শাহাদাত হোসেন রাজিব সস্ত্রীক পালিয়ে বেড়ান। শহীদের বিপক্ষে তার স্ত্রী মারধরের লিখিত অভিযোগ করেন বিসিবিতে। অভিযুক্ত শহীদ সম্প্রতি বিয়ে করেছেন আরেকটি। বাঁ হাতি স্পিনার আরাফাত সানির বিপক্ষে তার স্ত্রীর পরিচয় দেওয়া নাসরিন সুলতানা তথ্য প্রযুক্তি আইনে অভিযোগ করেন। এই মামলায় বেশ কয়েকদিন জেলাখানায় থাকতে হয়েছিল আরাফাতকে। নাসিরের বিপক্ষে একাধিক সিম ব্যবহার করে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ আলোচনায় এসেছে বারবার। সর্বশেষ এক মডেলের সঙ্গে তার ফোনালাপ বিব্রত করেছে বিসিবিকে। ক্রিকেটারদের এহেন আপত্তিকর অপকর্মে বিরক্ত বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। তিন-চারদিন আগে পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে অভিযুক্ত ক্রিকেটারদের কঠিন শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তারপরও ক্রিকেটাররা কি এসব অপকর্ম থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন নিজেদের? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি করে জড়াচ্ছেন অপকর্মে। আশ্চর্য হলেও সত্যি দলের সিনিয়র ক্রিকেটার মাশরাফি, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহর বিপক্ষে নারীঘটিত কিংবা অন্য কোনো অভিযোগ নেই। সতীর্থ হয়ে খেলছেন একসঙ্গে। অথচ তাদের কাছ থেকে সাব্বির, নাসিররা শিখছেন না কিছুই। আর সর্বশেষ মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত জড়িয়েছেন একই ধরনের ঘটনায়। পাসপোর্ট অনুযায়ী বয়স ২২ বছর। বিয়ে করেছেন ছয় বছর আগে। অর্থাৎ ১৬ বছর বয়সে! মোসাদ্দেক হোসেনের বিপক্ষে বাল্যবিয়ের অভিযোগই তাই আনা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় বয়স কম দেখানোর ব্যাপারটি লুকোছাপার কিছু নয়। আবার মোসাদ্দেকের বিপক্ষে মামলা করা স্ত্রী খালাতো বোন হওয়ায় সেটি যে প্রেমের বিয়ে ছিল, তাও সবার জানা। সেই ‘চাইল্ডহুড লাভ’ এখন এমন পরিণতির সামনে দাঁড়িয়ে! অথচ বাংলাদেশ জাতীয় দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাও তো বিয়ে করেছেন ছোটবেলার প্রেমিকাকে। সেই সুমনা হক সুমিকে নিয়ে সুখের সংসার করছেন এক যুগ ধরে। দম্পতির এক ছেলে, এক মেয়ে। এই তো কিছুদিন আগে মাশরাফির ওয়েস্ট ইন্ডিজ যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে। দলের অন্যদের সঙ্গে যেতে পারেননি সেই কারণে। পরে স্ত্রী খানিকটা সুস্থ হলে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে উড়াল দেন ওয়ানডে অধিনায়ক। তাঁর মতো তামিম ইকবালও বিয়ে করেন ছোটবেলার প্রেমিকাকে। চট্টগ্রাম সানশাইন গ্রামার স্কুল অ্যান্ড কলেজে যখন ‘এ’ লেভেলের ছাত্র তামিম, তখনই প্রথম দেখেন একই স্কুলের ছাত্রী আয়েশা সিদ্দিকাকে। প্রথম দর্শনেই প্রেম! আয়েশার মন ভেজাতে কষ্ট হয়েছে বিস্তর; কিন্তু একবার প্রেম হয়ে যাওয়ার পর তার সফল পরিণতি বিয়ের দিকে ঠিকই নিয়ে গেছেন তামিম। এখন এই দম্পতির সুখের সংসার আলোকিত করে রেখেছে একমাত্র সন্তান। জাতীয় দলের আরেক সিনিয়র ক্রিকেটার মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদের বাল্যপ্রেম নয়। তবে প্রেমের বিয়ে তো বটেই। তাঁর শ্যালিকার সঙ্গে আবার প্রেম হয়ে যায় সতীর্থ মুশফিকুর রহিমের। সেটির পরিণতিও বিয়েতে। এ দুজনের সংসারের অশান্তি হয়েছে বলে তো শোনা যায়নি কখনো। সাকিব আল হাসানের বেলায় বলা যায় একই কথা। ১২-১২-১২ তারিখে বিয়ে করা এই অলরাউন্ডারের স্ত্রী উম্মে আহমেদ বিদেশ সফরগুলোতেও প্রায়শই থাকেন তাঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে। ক্রিকেটের মতো ক্রিকেটের বাইরেও এই পঞ্চপান্ডবের ব্যক্তিগত জীবন যদি অনুসরণ করতেন জুনিয়র ক্রিকেটাররা! সেটি হচ্ছে না বলে ‘ক্রিকেটার’ হিসেবে দায় এসে পড়ছে তাঁদের ওপরও, যা তাঁদের জন্য বিব্রতকর তো বটেই! এদিকে ক্রিকেটারদের শাস্তির পাশাপাশি নজরদারিও চান সাবেক ক্রিকেটাররা। না হয় ক্রিকেট তখন বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম খেলা নয়। ক্রিকেটাররাও নন সবচেয়ে বড় তারকা। কিন্তু তখনো তো ‘ফ্যান’দের সংখ্যা নেহায়েত কম ছিল না। তাদের সঙ্গে আচরণের সীমানাটা ক্রিকেটাররা জানতেন বলে এখনকার মতো কেলেঙ্কারি তখন হয়নি বলে দাবি জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর, ‘এখন ক্রিকেটারদের তরুনরা ফলো করে। আর আমাদের সময়ে ক্রিকেটের এমন জনপ্রিয়তা, এমন রমরমা অবস্থা ছিল না। তবু ভক্ত কি ছিলেন না? ছিলেন। আবার তাঁদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, সে সীমানা জানতেন ক্রিকেটাররা। এখানে তো আর সেটি হচ্ছে না। আবার সময়ের ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হবে। এখন সময় বদলে গেছে। মেয়েরা অনেক বেশি অ্যাডভান্সড। ক্রিকেটারদের এত এত ভক্ত যে তাতে অনেক সময় পারিবারিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়ে।’ মোসাদ্দেক হোসেনের ঘটনায় আবার উত্তপ্ত ক্রিকেটাঙ্গন। ২২ বছরের এই ক্রিকেটার বিয়ে করেছেন ছয় বছর আগে। ১৬ বছর বয়সে বিয়ে? এখানে ক্রিকেট বোর্ডকে ভিন্ন রকম পরামর্শ বাংলাদেশ দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক শফিকুল হক হীরার, ‘এই যেমন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ২৭ বছরের আগে বিয়ে করা যাবে না, এমন নিয়ম রয়েছে। যেসব ক্রিকেটার বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিভুক্ত, তাদের ক্ষেত্রেও এমন নিয়ম করে দেওয়া যায়। কারণ ওই বয়সের আগে পরিণতিবোধ আসে না। ২২-২৪ বছর বয়সে জাতীয় দলে ঢুকে যাবে, এরপর ক্যারিয়ার তৈরি করার ব্যাপার তো থাকে। সংসারের চিন্তা এত আগে মাথায় ঢুকে গেলে চলবে কিভাবে!’ ভীষণ ক্ষুব্ধ শফিকুল হক হীরা জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ফোন রেকর্ড করার পরামর্শও দিয়েছেন বোর্ডকে, ‘যখন সবকিছু নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায় তখন সেটাকে বাগে আনতে অনেককিছুই করতে হয়। এই কাজ করলে সবার গতিবিধি বোর্ডের নজরে থাকবে।’ এসবের বাইরে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ক্রিকেটারদের নৈতিক শিক্ষা। এই শিক্ষার কারণেই বদলে যেতে পারে অনেককিছুই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ