ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 September 2018, ২২ ভাদ্র ১৪২৫, ২৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কাবাডি’র শত বছর ও গ্রামবাংলার ঐতিহ্য

নুরুল আমিন মিন্টু : ‘কাবাডি’। এর আরেক নাম ‘হা-ডু-ডু’। বাংলাদেশের জাতীয় খেলা। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলার এ খেলা স্বীকৃতি পেলেও গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এ ঐতিহ্যবাহি খেলা। এক সময় আবহমান গ্রামবাংলায় এ খেলার ধুম ছিল। বিশেষ করে শীত ও গ্রীষ্মকালে। পাড়ায় পাড়ায় প্রতিযোগীতা হতো। খোলা মাঠে, ধানকাটা বিলে ও বাড়ির আঙ্গিনায় চাঁদ রাতে এ খেলার আসর বসতো জমজমাট। জোছনা রাতে গ্রামের বৌ-ঝিয়েরাও এ খেলায় মেতে থাকতেন। কিন্তু কালপরিক্রমায়  জনপ্রিয় এ খেলা এখন প্রায় বিলুপ্ত। নীরবে চলে গেল  কাবাডির শত বার্ষিকী!  কেউ স্মরণ করেনি বাংলাদেশের জাতীয় খেলা কাবাডি’কে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতবর্ষে ১৯১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় কাবাডি খেলা। শত বছরের ব্যবধানে এ কাবাডি এখন অতীত, আর্কাভ এর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নতুন প্রজম্মের ছেলেমেয়েদের কাছে ‘কাবাডি’ বা ‘হা-ডু-ডু’ পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনেক শিশু-কিশোর এই খেলার নিয়মই জানে না। এমনকি অনেকে হয়তো জানে না এ খেলার নামও। তারা শুধু জানে ‘কাবাডি’ আমাদের জাতীয় খেলা! এটি কোন পদ্ধতিতে, কোন কৌশলে, কোন মাফকাঠিতে খেলতে হয় তাও জানে না আধুনিক ভাবধারায় যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বেড়ে ওঠা শিশুরা। পারিবারিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামাজীকরণের অভাবে এ যুগের ছেলেমেয়েরা তাদের দেশীয় সংস্কৃতির চাইতে বিদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়েই মাতামাতি করে বেশি। আর এ প্রভাবে দেশিয় অন্যন্য সংস্কৃতির ঐতিহ্যর বিলুপ্তির তালিকায় নাম লিখিয়েছে এ খেলাটিও। ক্রিকেট, ফুটবল, বাসকেট বলের কাছে এখন প্রায় হারিয়ে  যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের  জনপ্রিয় এ খেলা। ১৯২৩ সালে কলকাতা ও তৎকালীন পূর্ব বাংলায় হা-ডু-ডু খেলার প্রচলন হয়। এতে সমগ্র বাংলার তরুণদের মধ্যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা জেগে উঠে। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি ব্রিটিশ সরকার। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ রাজের এক আদেশ বলে কাবাডি খেলা ভারতবর্ষে নিষিদ্ধ করা হয়। বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন তৎকালীন বাংলার জাতীয়তাবাদী নেতারা। শুধুমাত্র বাংলার প্রাণের এ হা-ডু-ডু খেলাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। এক পর্যায়ে বাংলার জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার। মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৩১ সালে এ খেলার ওপর থেকে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। শুরু হয় সারা বাংলায় আনন্দ ও উল্লাস। ভারতে ১৯৩৮ সালে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক এসোসিয়েশনে অন্তর্ভুক্ত ছিল এ খেলা।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদারদের পরাজিত করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের একক একটি রাষ্ট্র হিসেবে পরিপূর্ণতা লাভ করে বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার ঐতিহাসিক হা-ডু-ডু খেলাটিকে বাংলাদেশের জাতীয় খেলাতে উন্নীত করেন। তখন থেকেই হা-ডু-ডু খেলা কাবাডি নামকরণ হয়ে আমাদের জাতীয় জীবনে পথ চলা শুরু করে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশন গঠিত হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রথম আন্তর্জাতিক কাবাডি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতীয় দল বাংলাদেশে এসে ঢাকা, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, যশোর, ফরিদপুর ও কুমিল্লা জেলার দলগুলোর সঙ্গে খেলায় অংশ নেয়। ১৯৭৮ সালে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং বার্মার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এশিয়ান কাবাডি ফেডারেশন গঠন করা হয়। তবে ১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কলকাতায় এশিয়ান কাবাডি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভারত চ্যাম্পিয়ন এবং বাংলাদেশ রানার্সআপ হয়। ১৯৯০ সালে প্রথমবারের মতো বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে অন্তর্ভুক্ত হয় কাবাডি। এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রৌপ্য পদক গ্রহণ করে বাংলাদেশ। ২০০৪ সালের প্রথম বিশ্বকাপ আসরেও বাংলাদেশ তৃতীয় হয়েছিল। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয়স্থান লাভ করেছিল বংলাদেশ। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত কাবাডি বিশ্বকাপে পাঁচটি ম্যাচ জেতার পরও সেমিফাইনাল পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ দল। কাবাডি খেলায় বিশ্বে এক সময় বাংলাদেশই ছিল শ্রেষ্ঠ শক্তিধর দেশ। কিন্তু সামান্য সময়ের ব্যবধানে কাবাডি খেলায় এই শ্রেষ্ঠত্ব তুলে নিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশ ইরান, পাকিস্তান, জাপানের কাছেও অনেক সময় আমাদের দল হেরেছে। কাবাডি একটি দলীয় খেলা যেখানে খরচ বলতে কিছু নেই। উন্মুক্ত মাঠে, ইনডোরে, স্কুলে, কলেজে, বাড়ির আঙিনায় কাবাডির আয়োজন করা যায়। তবে কাবাডি কোর্টের স্বীকৃত মাপ ধরা হয় ছেলেদের ১৩ মি. গুণন ১০ মিটার এবং মেয়েদের ১২ মি. গুণন ৮ মিটার। কাবাডি খেলায় দুটি দল অংশ নিতে পারে। প্রতি দলে ১২ জন করে। তবে মাঠে ৭ জনের বেশি নামতে পারে না। বাকি ৫ জন অতিরিক্ত থাকে। খেলা চলার সময় ৩ জন খেলোয়াড় পরিবর্তন হতে পারে। খেলার সময় ২০ মিনিট করে মোট ৪০ মিনিটে খেলা হয়। মাঝখানে ৫ মিনিটের বিরতি আছে। একজন রেফারি ও দুজন আম্পায়ার খেলা পরিচালনা করেন। এ খেলায় সফলতার পূর্বশর্ত শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা, পেশির ক্ষিপ্রতা, ফুসফুসের শক্তি ও সহনশীলতা, দ্রুত চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রয়োগের সামর্থ্য; সর্বোপরি প্রতিপক্ষের কৌশল ও প্রতিটি মনোভাব অনুধাবনের যোগ্যতা। খেলা শুরু হলে একপক্ষ দম রেখে হাডুডু কিংবা কাবাডি.......কাবাডি বলতে বলতে ডাক দিতে থাকে এবং মধ্যরেখা পার হয়ে বিপক্ষের কাউকে ছুঁয়ে দম থাকা অবস্থায় দ্রুত নিজ পক্ষে চলে আসতে চেষ্টা করে। যদি কাউকে ছুঁয়ে আসতে পারে তবে সে ‘মরা’ বলে গণ্য হয়। আবার আক্রমণকারী যদি বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের হাতে ধরা পড়ে, তবে সেও মরা বলে গণ্য হয়। যদি মরা দলের কেউ প্রতিপক্ষের কাউকে ছুঁয়ে আসতে পারে তবে মরা পুনরায় বেঁচে যায়। এভাবেই জমতে থাকে খেলা।
কোন পক্ষ তার বিপক্ষের প্রত্যেক খেলোয়াড়কে আউট করার সুবাদে একটি করে পয়েন্ট লাভ করে। বিপক্ষ দলের সব খেলোয়াড়কে আউট করতে পারলে লোনা বাবদ অতিরিক্ত ২ পয়েন্ট পায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যে দল বেশি পয়েন্ট অর্জন করবে খেলায় সেই দল জয়ী হয়। বিশ্বের সর্বপ্রাচীন ও সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা কাবাডি বা হা-ডু-ডু। বর্তমানে এ খেলা জাপান, কোরিয়া, চায়না, কানাডা, ব্রিটেনসহ আফ্রিকার অনেক দেশেও নিয়মিত হয়। আমাদের কাবাডি একেক দেশে একেক নামে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানে কাবাডি কিন্তু নেপালে ডুডু, শ্রীলঙ্কায় গুডু-গুডু, থাইল্যান্ডে থিকাব ও মালয়েশিয়ায় ছি-গুডু-গুডু নামেই বেশি পরিচিত। এ খেলা থাইল্যান্ডে উৎসবের অংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় বিচ কাবাডির জনপ্রিয়তা অত্যন্ত বেশি। উদাসীনতা ও ব্যর্থতার পরিচয় না দিয়ে হারতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ খেলাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং বাংলাদেশকে বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনে পরিচিতি করে তুলতে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়  কাবাডি বা হা-ডু-ডু’র প্রচলন করতে হবে। নতুন প্রজম্মকে কাবাডিকে পরিচয় করে দিতে এর ঐতিহ্য ও গুরুত্ব গণমাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। এতে  পুনরায় বাংলার জাতীয় ‘কাবাডি’ স্বকীয়তা ফিরে পাবে এ প্রত্যাশা  গণমানুষের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ