ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 September 2018, ২২ ভাদ্র ১৪২৫, ২৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সাফ ফুটবলে এবার শিরোপা জিততে পারবে তো?

মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল : বাংলাদেশের ফুটবলের আশার প্রদীপটা এখন নিভু নিভু করে জ্বলছে। প্রত্যাশা অনুসারে পাওয়া যাচ্ছে না কিছুই। তবুও হারানো দিনে ফিরে যেতে চেষ্টার কোন কমতি থাকছে না। বাংলাদেশের ফুটবলের কাছে ফুটবলারের কাছে সবেধন নীলমনির নাম সাফ ফুটবল। দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ হিসেবে অবিহিত করা হয় এই টুর্ণামেন্টকে। অথচ সেখানেই বাংলাদেশ অচেনা এক দল। নিজেদের মাটিতে দুইবার খেলে মোটে একবরাই শিরোপা নিয়ে উল্লাস করতে পেরেছে। এবার নিয়ে তিনবার স্বাগতিক হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে সাফের আগে একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে শ্রীলংকার কাছে ১-০ গোলে হেরে গেছে আমাদের জাতীয় দল। তাহলে কি এবারো স্বপ্নভঙ্গ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের! যদিও লংকানরা বাংলাদেশের সাথে একই গ্রুপে পড়েনি। শক্তির বিচারেও অনেক পিছিয়ে ছিল পাকির আলীর শীষ্যরা। পুরো ম্যাচে দাপটের সাথে খেলে স্ট্রাইকারদের অমার্জনীয় ব্যর্থতায় ম্যাচটা ড্র করাও সম্ভব হয়নি। গত এক সপ্তাহ ধরে এই ম্যাচের টিকিটের জন্য দৌড়ঝাঁপ করেছেন নীলফামারির র্দশকরা, তাতে করে নিস্ফল হয়েছে তাদের কষ্ট। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য নতুন সাজে জেলার ষ্টেডিয়ামকে সাজানো হলেও অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি। হতাশ হয়েই ২১ হাজার দর্শককে ফিরে যেতে হয়েছে ঘরে। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিলনা। এই ম্যাচ দিয়ে ইংলিশ কোচ জেমি ডে সিনিয়র খেলোয়াড়দের পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন। সেই পরীক্ষায় ফেল মেরেছে লাল সবুজের খেলোয়াড়রা। কারণ ক’দিন আগেই এশিয়ান গেমস ফুটবলে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলে দেশে ফিরেছে দল। সেই দলটি জাতীয় দল নয় অনূর্ধ্ব-২৩ দল। সেখানে সিনিয়র দলের তিনজন খেলার সুযোগ দেয়া হয়েছিল।
সেই দলটি দুর্দান্ত ফুটবল খেলে দেশের মান রেখেছে। অথচ দেশে ফেরার পর সিনিয়র দলটিই কিনা আবারো হতাশ করা শুরু করেছে বাংলাদেশকে। তাহলে কি এখন আর সিনিয়রদের উপর ভরসা রাখার দিন শেষ হয়ে গেছে। জুনিয়রদের নিয়ে কাজ করলে তারাই দেশের সুনাম রক্ষা করতে পারবে কিনা সেই ভাবনাও ভাবা শুরু হয়ে গেছে। এবারের এশিয়ান গেমস ফুটবলে বাংলাদেশ গ্রুপ পর্ব টপকে শেষ ষোল’তে খেলার কৃতিত্ব দেখায়। যা গেমসে লাল-সবুজের ফুটবল ইতিহাসে সেরা সাফল্য। ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ এশিয়াড ফুটবলে নিয়মিত অংশ নিলেও এর আগে কখনো গ্রুপ পর্ব উতরে যেতে পারেনি। এবার শুধু তারা গ্রুপ পর্বই টপকায়নি, শেষ ষোল’তে সমান তালে লড়েছে দু’বার বিশ্বকাপে খেলা উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে। যে দলটি আবার গত এশিয়ান গেমসে রৌপ্য পদক জিতেছে। আসরের ‘বি’ গ্রুপে অবস্থান ছিল বাংলাদেশ দলের। সেখানে শক্তিশালী উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের হার দিয়ে মিশন শুরু করে। দ্বিতীয় ম্যাচে দারুণ খেলে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ গোলে এগিয়ে গিয়েও শেষ মুহুর্তের গোলে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় জামাল ভুইয়ার দলকে। আর শেষ ম্যাচে ইতিহাসই করে ফেলে। কাতারকে ১-০ গোলে হারিয়ে উঠে যায় প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে। এই দলটি আগামী ২০২২ বিশ্বকাপের স্বাগতিক হয়েছে। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আর পেরে উঠেনি বাংলাদেশ। ম্যাচে উত্তর কোরিয়া ৩-১ গোলের জয় পেলে আসর থেকে ছিটকে পড়ে জেমি ডে’র শীষ্যরা।
যদিও দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলায় খুব খারাপ খেলেনি বাংলাদেশ। ম্যাচে হারলেও সমানতাল লড়াই করে গেছে। বড় দলের বিপক্ষে আগে থেকেই ম্যাচ হেরে যাওয়ার যে রেওয়াজ বহু বছর ধরে বাংলাদেশের ফুটবলে রয়েছে সেই ধারা থেকেও বের হওয়া গেছে। বলা যায় সাফ ফুটবলের জন্য আত্ববিশ্বাসের ভরপুর জ্বালানী নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-২৩ দল। বাংলাদেশের এই লড়াকু পারফরম্যান্স নজর কেড়েছে ফুটবলবোদ্ধাদের। বলা যায় বাংলাদেশের নিরাশার ফুটবলে হঠাৎ করেই আশার রোশনাই দেখতে পাওয়া গেছে। এশিয়ান গেমসে পাওয়া এই সাফল্য নতুন করে আশা জাগিয়েছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। এশিয়ান গেমস ফুটবলে বাংলাদেশ এমন একটা সময়ে সাফল্য পেয়েছে যখন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ কড়া নাড়ছে দরজায়। ইন্দোনেশিয়া থেকে বাংলাদেশ ফুটবল দল দেশে ফেরার সপ্তাহ না ঘুরতেই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হয়েছে। দুই টুর্নামেন্টের পার্থক্য একটাই-এশিয়াডে খেলেছে অনূর্ধ্ব-২৩ দল আর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলবে জাতীয় দল। আগামী ৪-১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে সাফের দ্বাদশ আসর। ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে টুর্নামেন্টের সবগুলো খেলা। গ্রুপিং এবং ফিকশ্চার কয়েকমাস আগেই রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাফ থেকে আফগানিস্তান বের হয়ে যাওয়ায় এবারের টুর্নামেন্ট এখন সাত জাতিতে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানের উপর ফিফার নিষেধাজ্ঞা থাকায় গত আসরেও সাত দল খেলেছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। এবারের টুর্নামেন্টে স্বাগতিক বাংলাদেশ খেলবে ‘এ’ গ্রুপে। ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তান হচ্ছে গ্রুপের বাকি দল। অন্যদিকে ‘বি’ গ্রুপে রয়েছে ভারত, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা। ১৫ সেপ্টেম্বর ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে শেষ হবে এবারের আসর।
২০০৯ সালের পর আবারো ঢাকায় ফিরেছে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। আর কাজি সালাহউদ্দিন বাফুফের মতো সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (সাফ) দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বিতীয়বার ঢাকায় এমন আয়োজন। ১২ ম্যাচের এই টুর্নামেন্ট নিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনার কমতি নেই দলগুলোর মধ্যে। আসরে নেপাল ও শ্রীলংকা ছাড়া বাকি পাঁচ দেশেই জাতীয় দলের দায়িত্বে বিদেশি কোচ। ঘরের মাঠে ভালো করতে প্রত্যয়ী স্বাগতিকরা। বিশেষ করে জাকার্তা এশিয়ান গেমসে দ্বিতীয় পর্বে ওঠায় আত্মবিশ্বাসও বেড়ে গেছে ফুটবলারদের। সেই কারণে এবার তরুনদের নিয়েই বেশি ভরসা করতে হচ্ছে। সবার আগে বাংলাদেশে এসেছে শ্রীলংকা। ২ সেপ্টেম্বর নেপাল, ভুটান, ৩ সেপ্টেম্বর ভারত, মালদ্বীপ আসবে। ৪ সেপ্টেম্বর নেপাল-পাকিস্তান ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে দ্বাদশ সাফ, আর ওই দিন রাতেই ভুটানের বিপক্ষে মাঠে নামবেন স্বাগতিকরা। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, অনুশীলন মাঠসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যতটা করার ঠিক ততটাই করেছে আয়োজকরা। তবে সমস্যা ছিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ফ্লাইড লাইট নিয়েও। বাণিজ্যিক বিপণন প্রতিষ্ঠানের চাওয়া মতো ফ্লাডলাইটের আলো ১২০০ লাকসে উন্নীত করতে পারেনি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। তবে কাছাকাছি পৌছে গেছে এর আলো। এ বিষয়ে সাফ সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক হেলাল বলেন, ‘ফ্লাড লাইটের সমস্যা আমাদের বেশ পুরনো। ১২০০ লাকস চাইলেও ১ হাজারের কাছাকাছি আলো পাওয়া যাবে। তাও পুরো মাঠে সমানভাবে আলো পড়বে কিনা সেটা নিয়ে কিছুটা চিন্তায় রয়েছি’।
এছাড়া নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছলি বল ও টিকিট নিয়ে। হংকং থেকে দেড় মাস আগে ১৮০টি বল পাঠানো হলেও আটকে আছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টমসে। একই অবস্থা ঈদের আগে হংকং থেকে পাঠানো টিকিট নিয়েও, সেগুলোও আটকে দিয়েছে বিমানবন্দর কাস্টমস। টিকিটের জন্য নাকি আড়াই লাখ টাকা ট্যাক্স ধরা হয়েছে। এসব দেখার দায়িত্ব নাকি আয়োজক বাফুফের। যদিও পরে টিকিট ও বল ছাড় করাতে পেরেছিল আয়োজকরা। টুর্নামেন্টের জন্য ১০ লাখ ডলার সাফকে দিচ্ছে স্পন্সর প্রতিষ্ঠান লাগাডিয়ার স্পোর্টস। এর মধ্যে প্রাইজমানি ৭৫ হাজার ডলার। গেল আসরের মতো এবারো চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ৫০ হাজার, রানার্সআপ ২৫ হাজার। দুই সেমিফাইনালিস্ট ১০ হাজার ডলার করে পাবে। অন্যদিকে আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশ পাবে সাড়ে ৩ লাখ ডলার, অংশগ্রহনকারী অন্য ছয় দেশ পাবে ২৫ হাজার ডলার করে। সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের গেল তিন আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল বাংলাদেশ। যার শুরটা হয়েলি দিল্লিতে, কাঠমান্ডুর পর কেরালায় একই পরিণতি বরণ করে নিতে হয়েছে মামুনুল-জাহিদরা। দেশের মাটিতে এবার ঘুরে দাঁড়াতে চায় ফুটবলাররা। নতুন কোচ জেমি ডের বিশ্বাস তরুণ এসব ফুটবলাররা পারবে দেশের মাটিতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে নতুন কিছু করে দেখাতে। পরিসংখ্যানের এখানে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছেনা। জাতীয় ফুটবল দলের সর্বশেষ ২০ ম্যাচে তিন জয় আর চার ড্রর বিপরীতে হারের সংখ্যা ১৩। পাঁচ বা পাঁচের অধিক গোলে হার ছয়টি। আছে জর্ডানের বিপক্ষে ০-৮ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার লজ্জা। ম্যাচগুলোতে ৫৫ গোল হজমের বিপরীতে লাল-সবুজরা করতে পেরেছে মাত্র ১৩টি। ২০ ম্যাচের ১৩টিতে কোনো গোল করতে পারেনি বাংলাদেশ। উপরের পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশটির ফুটবল বিপর্যয় বোঝাতে যথেষ্ট।
সাফ শুরুর ইতিহাসটাও বেশ চমৎকার। বেশ কয়েকবার নামই পরিবর্তন করা হয়েছে। ১৯৯৩ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে শুরু হয় সার্ক গোল্ড কাপ। পাকিস্তানের অনুষ্ঠিত প্রথম আসরেই বাজিমাত করে পাকির আলির দেশ শ্রীলঙ্কা। ১৯৯৭ সাল থেকে চ্যাম্পিয়নশিপের নাম বদলে যায়। নতুন নাম হয় ‘সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ’। আফগানিস্তান ২০১৫ সাল পর্যন্ত খেলেছে নিয়মিত। মধ্য এশিয়ান কনফেডারেশনে নাম লিখে সরিয়ে নিয়েছে নিজেদের। দেশটি ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়নও। তবে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ নিজেদের করে নিয়েছে ভারত। আগের ১১ আসরে সর্বোচ্চ সাতবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত (১৯৯৩, ১৯৯৫, ১৯৯৯, ২০০৫, ২০০৯, ২০১১ ও ২০১৫)। একবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ (২০০৩), মালদ্বীপ (২০০৮), শ্রীলঙ্কা (১৯৯৫) ও আফগানিস্তান (২০১৩)। এবার নিয়ে তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করছে বাংলাদেশ। প্রথম ২০০৩ সালে অয়োজক হয়েই শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়নশিপে এখন পর্যন্ত এটাই বাংলাদেশের একমাত্র শিরোপা। ২০০৯ সালেও আয়োজন করেছিল। কিন্তু সেবার সেমিফাইনালের গন্ডি পেরুতে পারেনি। তাই বাংলাদেশের জন্য এবার অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে সাফ ফুটবল টুর্নামেন্টটি। স্বাগতিক হিসেবে ফেবারিটের তালিকায় থাকলেও পরিসংখ্যান রয়েছে বাংলাদেশের ঠিক বিপরিতে। এবার শিরোপা জিততে পারলে বদলে যেতে পারে এদেশের ফুটবলের চেহারা। সেটা করার দায়িত্ব যাদের সেই ফুটবলাররা কতটা করতে পারবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। কারণ এবার পা হড়কালে আবারো পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশের ফুটবল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ