ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 September 2018, ২২ ভাদ্র ১৪২৫, ২৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভারতীয় দলে নতুন পেসার খলিল

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : সাম্প্রতিক সময়ে খুবই বাজে সময় পার করছে ভারতীয় ক্রিকেট টিম। এ নিয়ে দেশের সাবেক ক্রিকেটাররা সমালোচনায় মুখর। তবে এই মুহূর্তে এশিয়া কাপের দিকে নজর কোহলীদের। সাম্প্রতিক সময়ের বাজে পারফরমেন্স ভুলে তারা সেরাটাই দিতে চান এশিয়া কাপে। সেজন্য দলও সেভাবেই সাজানো হচ্ছে। অনেকদিন ধরেই দলে একজন জহির খানকে খুঁজছিল বিরাটকোহলী। অবশেষে তার খোঁজ পেয়ে গেছেন তারা। নতুন এই পেসারের নাম খলিল আহমেদ।  ভারতের জাতীয় দলে প্রথমবারের মতো ডাক পেয়েছেন খলিল আহমেদ। এশিয়া কাপে ভারতীয় স্কোয়াডে নতুন মুখ বাঁহাতি পেসার খলিল আহমেদ। কে এই খলিল আহমেদ? বাবা ছিলেন কম্পাউন্ডার। ছেলে খেলে বেড়াক, তা চাননি। উঠে আসার রাস্তাটা তাই বন্ধুর ছিল। কিন্তু খলিল আহমেদের ছিল অদম্য মনোবল আর একাগ্রতা। তা পুঁজি করে সেই বন্ধুর রাস্তায় হেঁটেই আজ তিনি ‘মেন ইন ব্লুজ’দের কাতারে। নিশ্চয়ই ভাবছেন, এই খলিল আহমেদ আবার কে? ক্রিকেটার। জন্ম রাজস্থানের প্রত্যন্ত অঞ্চল টোঙ্ক-এ। ক্রিকেটার তৈরির চেয়ে অঞ্চলটা খরমুজ উৎপাদনের জন্যই বেশি পরিচিত। এখানে টেনিস বল দিয়ে খলিলের হাতেখড়ি ক্রিকেটে। স্বপ্ন ছিল বহুদূর যাবেন। বড় ক্রিকেটার হতে হবে। বাদ সাধলেন বাবা। টানাটানির সংসারে কেন এসব ইচ্ছাবিলাস? খলিলের বাবাকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজি করিয়েছিলেন টোঙ্ক ক্রিকেট একাডেমির কোচ ইমতিয়াজ আলী খান। ব্যস, সেই যে পথচলা শুরু, আর চলতে চলতে খলিল এখন ভারতের ওয়ানডে দলে। এশিয়া কাপে রোহিত শর্মা, লোকেশ রাহুলদের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন একই ড্রেসিং রুম। খলিলের এই উত্থানের ইঙ্গিতটা কিন্তু হুট করে নয়। ওয়াসিম আকরামের মতো চাতুরীপূর্ণ বোলিং দিয়ে অনেকেরই মন কেড়েছেন এই বাঁহাতি পেসার। সঙ্গে গতিও সন্তোষজনক। এ বছর সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফিতে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি বোলিং করেছেন ২০ বছর বয়সী এই তরুণ। ভেতরে-বাইরে দুই দিকেই সুইং করাতে পারেন। এই তরুণ অনেকের চোখেই ভারতের পরবর্তী জহির খান।
ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে মাত্র এক মৌসুম ভালোভাবে খেলেই জাতীয় দলে উঠে আসা চাট্টিখানি কথা নয়। খলিল এই অসাধ্য সাধন করেছেন। তাঁর ঝুলিতে মাত্র দুটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা। যদিও টি-টোয়েন্টি আর লিস্ট ‘এ’ খেলার অভিজ্ঞতা আছে ভালোই। তাঁর বোলিংয়ের আরেকটি ধারালো দিক হলো, যেকোনো উইকেটেই অনবরত বুকসমান বাউন্স তুলতে পারেন। এশিয়া কাপে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাটা উইকেটের কথা মাথায় রেখেই তাঁকে স্কোয়াডে ডেকেছে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। ক্যারিয়ারের শুরুতে খলিলের প্রতিভা ছিল সামান্যই। ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে দুই বছর আগে যুব বিশ্বকাপ খেলতে খলিল যখন বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন তাঁর বোলিংয়ে শুধু গতি আর বাউন্স ছিল। ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে ‘অ্যাঙ্গেল’ কাজে লাগিয়ে বল করতেন। সুইংয়ের দেখা মিলেছে গত দুই বছরের সাধনায়, যখন দিল্লি ডেয়ারডেভিলসে জহির খানের অধীনে ছিলেন। ভারতের সাবেক এই পেসার তখন দিল্লির অধিনায়ক। খলিল ফ্র্যাঞ্চাইজি দলটির হয়ে কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলেও জহিরের কাছ থেকে শিখেছেন কীভাবে উইকেটের দুই দিকেই সুইং করানো যায়।
জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর জহিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি খলিল, ‘আগে শুধু জোরে বোলিং করেছি। তেমন কৌশল রপ্ত করতে পারিনি। জহির আমার হাত (ডান হাত) ও কবজি নিয়ে কাজ করেছেন। সিম পজিশন আর গ্রিপও ঠিক করে দিয়েছেন। এখন আমি ডানহাতি ব্যাটসম্যানের ভেতরে বল ঢোকাতে পারি।’ বিজয় হাজারে ট্রফি আর দেওধর ট্রফিতে ভালো করার পর রঞ্জিতে দুই ম্যাচ খেলে দুই উইকেট পেয়েছিলেন খলিল। তবে ভারতের ‘এ’ দলে ডাক পাওয়ার পর ইংল্যান্ড সফরে এবং ‘এ’ দলের চার দেশীয় টুর্নামেন্টে দারুণ বোলিং করেছেন।
 ‘এ’ দলের হয়ে শেষ ৯ ম্যাচে তাঁর উইকেটসংখ্যা ১৫। খলিলের এই বড় মাপের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার মানসিকতার ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়েছেন ‘দ্য ওয়াল’ রাহুল দ্রাবিড়। খলিল ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে থাকতে তাঁর কোচ ছিলেন দ্রাবিড়। তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই খলিলের। তাঁর মুখেই শুনুন সে কথা, ‘কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই। অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলার শুরুতে প্রচুর ভুল করতাম। আত্মবিশ্বাস কম ছিল। দ্রাবিড়ের অধীনে আমি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই। তাঁর সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো মাঠে সব সময় তিনি খেলোয়াড়দের পূর্ণ স্বাধীনতা দেন। নতুন কিছু করতে উৎসাহিত করেন। আমার ক্যারিয়ারে তাঁর প্রভাব অনেক বেশি।’ দ্রাবিড়ের প্রভাবে খলিলের ক্যারিয়ার গড়ে উঠলেও তার আদর্শ কিন্তু জহির খান। ভারতের এই কিংবদন্তি বাঁহাতি পেসারের মতো হতে চান খলিল। আর সাবেক শিষ্যকে নিয়ে জহিরের প্রশংসাপত্র, ‘তাঁর ওপর চোখ রাখুন। ভীষণ প্রতিশ্রুতিশীল বোলার। তবে তাঁকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। ম্যাচ উইনার হওয়ার সব সামর্থ্যই তার আছে।’ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ইঙ্গিত, দলে ডানহাতি পেসার বেশি থাকায় বাঁহাতি পেসার বেছে নিতেই খলিলকে ডাকা হয়েছে। যিনি ডানহাতি ব্যাটসম্যানের ক্ষেত্রে বল ভেতরে ঢোকাতে পারবেন-একসময়কার জহির খান কিংবা ইরফান পাঠানের মতো। এশিয়া কাপে ভালো করতে পারলে খলিল বিশ্বকাপ ভাবনাতেও থাকবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট শুরু করা ছেলেটির সামনে যখন এত স্বপ্নের আনাগোনা, তখন তিনি নিজে কী ভাবছেন?
খলিল রীতিমতো শিহরিত। জাতীয় দলে ডাক পাওয়ায় তাঁর যেন কাঁপুনি উঠেছে! ‘বলতে পারেন এখনো কাঁপছি। বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমি ভারতীয় দলের সদস্য। সব ক্রিকেটারেরই দেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন থাকে। আমার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।’ সত্যি হওয়া এই স্বপ্নকে খলিল কত দূর টেনে নিতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে তার সাম্প্রতিক সমযের পারফরমেন্স বলে দিচ্ছে এশিয়া কাপে নিজের জাত চেনাতে তিনি মোটেও ভুল করবেন না। একইসাথে কোহলীদের চাওয়াটাকেও তিনি পূরণ করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ