ঢাকা, শুক্রবার 7 September 2018, ২৩ ভাদ্র ১৪২৫, ২৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শরতের বিকালে

মোহাম্মদ অংকন : বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। বর্ষা হল দ্বিতীয় ঋতু। কয়েকদিন হল বর্ষাকাল শেষ হয়েছে। তাই সবুজ-শ্যামল  প্রকৃতিতে শরৎ ঋতুর দারুণ আমেজ বইছে। নদীর ধারের কাশবনগুলো যেন হাতছানি দিচ্ছে। কী অপরুপ সেসব দেখতে! কী অপূর্ব শরতের দৃশ্য! এবার বর্ষার চিরায়ত সৌন্দর্য সাইবা উপভোগ করতে পারেনাই বলে শরৎকাল শুরু হতে না হতেই সে ঢাকা হতে নানার বাড়ি ছুটে এসেছে। গ্রামের পথপ্রান্তরে পা রাখতেই যেন সাইবা শরতের সৌন্দর্যে বিমোহিত। শরতের আকাশ দেখে যেন তার মন-প্রাণ ভরে উঠেছে।

নানার বাড়িতে কয়েকটা দিন অতিক্রম হতে না হতেই সাইবা তার ছোট মামার কাছে বায়না করে। 

‘মামা, চলো না আমরা একটু নৌকায় ভ্রমণ করি।’ 

বিল-ঝিল-নদীতে এখন পানি মোটামুটি কমই বলা চলে। স্রোত প্রবাহও তেমন নাই। নৌকা নিয়ে পড়ন্ত বিকালে ঘুরে বেড়ানোটা যেন ছোট-বড় সকলের জন্যই বেশ আনন্দদায়ক ও নিরাপদ। তাই সাইবার ছোট মামা মিলন ভাগনির কথায় রাজি হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে আমার শহুরে ভাগনি। আগামীকাল বিকালেই তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবো।’ 

মামার কথা শুনে সাইবা যেন আনন্দে আটখানা হয়ে গেল। 

শরতের বিকালে নৌকা ভ্রমণ করা আর কাশবন দেখা, নদীর ধার দেখা যেন সত্যি অন্যরকম এক অনুভূতির বিষয়। কিন্তু এত অনুভূতি কী দু’চোখে ধরবে? সব কিছু মনে রাখা সম্ভব কী? এমন সব কাল্পনিক বিষয় ভাবতেই সাইবার ছবি আঁকাআঁকির কথা মনে পড়ে যায়। 

‘যাক বাবা, দারুণ একটা বুদ্ধি পাওয়া গেল। আগামীকাল ছোট মামা যখন বৈঠা দিয়ে নৌকা ঠেলবে আর তখন আমি নৌকার মাচালে বসে বসে রং-তুলি দিয়ে শরতে নদী ও নদীর পারের গ্রামের দৃশ্যগুলো আঁকব। ভাগ্যিস, রং-তুলিগুলো সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। আহ! আগামীকাল কতই না মজা হবে!’ 

মামা কথা মত পরের দিন বিকালে সাইবাকে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে পড়ে। ছোট মামা নৌকার বৈঠা ঠেলে আর সাইবা নদীর পানিতে হাত ডুবিয়ে ডুবিয়ে উল্লাস করে। পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যকিরণ সাইবার চোখে এসে পড়ে। গরমের আভাস পেতেই মামা বলে, ‘সাইবা, তুমি ছাতার নিচে এসে বসো। একটু পরই রোদের তেজ কমবে।’ 

সাইবা তার মামার কথা মত একটি লাল ছাতা ফুঁটিয়ে চুপচাপ বসে পরে। বসে বসে ভাবতে থাকে, ‘কোন দৃশ্যের ছবি আঁকা যায়!’ 

 নৌকা চলতে চলতে অনেক দূরই চলে যায়। নদী পেরিয়ে বিলের মাঝে চলে যায়। সাইবা দেখতে পায়, বিলজুড়ে আমন ধান ভাসছে। মাঝে মাঝে শাপলা ফুল ফুটে আছে। কচুরিপানার উপর ব্যাঙাচিগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করছে। অতঃপর এমনই একটি দৃশ্য সাইবা চটপট তার রঙতুলি দিয়ে এঁকে ফেলে। তারপর ছোট মামাকে দেখায়। 

‘মামা, দেখ আমি ছবি এঁকেছি।’ 

মামা তো ভাগনির ছবি আঁকা দেখে প্রশংসায় পঞ্চমুখ করে দেয়। ‘বাহ! চমৎকার হয়েছে।’

তারপর ছোটমামা নৌকা চালিয়ে বিলের পশ্চিমধারে চলে যায়। সেখানে দারুণ দৃশ্য রয়েছে। কয়েকজন কৃষক পানিতে নেমে কাজ করছিল। তাদের দেখে সাইবা তার মামাকে বলে, ‘মামা, তারা পানিতে নেমে আছে কেন?’

 ছোট মামা উত্তর করে, ‘কৃষকেরা ধানের জমি থেকে কচুরিপানা পরিষ্কার করছে। যাতে ধান ভাল হয়। শরৎকাল হল আমন ধানের কাল। এসময় ধানের যতœ নিতে হয়।’

‘ও আচ্ছা, আমি বুঝতে পেরেছি। শরতের পর হেমন্তকাল। আর তখনই কৃষকেরা এ ধান ঘরে তুলবে,  তাই না মামা?

‘হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ সাইবা মামুনি।’

মামার সাথে কথা বলতে বলতে সাইবা আরও কয়েকটি দৃশ্যের ছবি এঁকে ফেলে। ‘মামা, শরতের দৃশ্যের এসব ছবি আমি ঢাকায় নিয়ে আমার বন্ধুদেরকে দেখাবো। ওরা গ্রাম-বাংলার অপূর্ব রুপ আমার ছবিতে দেখতে পাবে।’

‘হ্যাঁ, নিয়ে যাবে’ বলতে বলতে মামা নৌকা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা করে। তখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে আসে। সাইবা আকাশের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় কয়েক ঝাঁক পাখি তার মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। মামাকে প্রশ্ন করে, ‘মামা, এইসব পাখির নাম কি?’

‘এগুলো সাদা বক। শরৎকালে বিলে-ঝিলে এদের চড়তে দেখা যায়। ধানের পোকা-মাকড় ধরে ধরে খায়।’

‘বাহ! কি সুন্দর পাখি। শরৎকালে কত সুন্দর সুন্দর বক পাখি দেখা যায়!’

এক সময় সাইবাদের নৌকা বাড়ির ঘাটে এসে ঠেকে। মামা সাইবাকে নৌকা থেকে নামতে তাগিদ দেয়। সাইবা নামতে নামতে মামাকে বলে, ‘মামা, তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। শরতের বিকালে তুমি আমাকে যে উপহার দিলে তা আমি কখনও ভুলব না। ঢাকায় ফিরে শরৎ যাপনের দিনগুলো খুব মনে পড়বে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ