ঢাকা, শুক্রবার 7 September 2018, ২৩ ভাদ্র ১৪২৫, ২৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সরকারি দলের প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় ঋণ আদায়ে সফলতা নেই ব্যাংকগুলোর

 

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: পরিবহণ ও যোগাযোগ খাতে চরম নৈরাজ্যের পাশাপাশি বেড়েছে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ। ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করতে পরিবহণ খাতের মালিকরা নানা রকম কৌশল ও প্রভাব খাটাচ্ছেন। যাত্রীদের জিম্মি করে মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া আদায়, সিটিং সার্ভিসের নামে বাণিজ্য করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলেও ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধ করছেন না পরিবহণ ব্যবসায়ীরা। ফলে দিন দিন বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। গত এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে দুই হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে এখাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহণ খাতে সরকারি দলের প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় ঋণ আদায়ে সফলতা দেখাতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

জানা গেছে, দেশের পরিবহণ খাত সরকারি দলের কব্জায়। রাজধানীর অধিকাংশ পরিবহণের মালিক সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারি দলের অনেক নেতা প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক ঋণ নিয়ে রাতারাতি পরিবহণ মালিক বনে গেছেন। এখন ব্যাংক ঋণ পরিশোধে অনিহা দেখাচ্ছেন এ সব পরিবহণ মালিকরা। 

সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিবহণ খাতে দেয়া ঋণ আদায়ে রয়েছে ধীরগতি। পরিবহন মালিকদের কাছে পাওনা চেয়েও সুবিধা করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। ব্যাংক ঋণ পরিশোধ না করতে বিভিন্ন রকম কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে তারা। ফলে এখাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ঋণ পরিশোধ না করা সত্ত্বেও নতুন করে ঋণ পেতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সুপারিশ নিয়ে ব্যাংকগুলোতে হাজির হচ্ছেন এসব পরিবহণ মালিকরা। তাদের ঋণ দিতে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে ফোন দিয়ে ঋণ দেয়ার জন্য বলা হচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলো একপ্রকার বাধ্য হয়ে তাদেরকে ঋণ দিচ্ছেন। 

নাম না বলার শর্তে কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, পরিবহণ খাতের ঋণ নিয়ে আমরা উভয় সঙ্কটে রয়েছি। আমরা চায় না তাদের ঋণ দিতে। কিন্তু তাদের ঋণ দেয়ার জন্য এমন জায়গা থেকে সুপারিশ আসে যে বাধ্য হয়ে খেলাপি থাকা সত্ত্বেও তাদের ঋণ দিতে হচ্ছে। এ কারণে পরিবহণ খাতে ঋণ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ উভয়ই বাড়ছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবহন খাত। বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের ব্যাংকের শাখা থেকে একটি পরিবহন সংস্থার মালিক ১৪০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু পরিশোধ করছেন না ঠিকমতো। ওই সংস্থার কাছে এখনো ব্যাংকের পাওনা ৮৪ কোটি টাকা। টাকা চাইলে নানা টালবাহানা করেন তিনি। টাকা চাইতে গেলেও আমাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবহন খাতে সরকারি দলের প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় ঋণ আদায়ে সফলতা নেই ব্যাংকগুলোর। জোর দিয়ে ঋণের টাকা চাইতে পারছেন না আবার অর্থ আদায়ে মামলা করতেও ভয় পাচ্ছে ব্যাংকগুলো। ফলে একদিকে যেমন ঋণ আদায় হচ্ছে না। অন্যদিকে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল শেষে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে খেলপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, এই খাতে ২০১৬ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে একবছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে দুই হাজার একশ’ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। তবে, অবলোপন হওয়া প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ যোগ করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হবে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। এতে সার্বিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ফের দুই অঙ্কের ঘর অতিক্রম করেছে। গত মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে মোট বিতরণ করা ঋণের ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বর্তমানে পরিবহণ খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের হারের থেকেও পরিবহণ খাতে খেলাপি ঋণের হার বেশি। খেলাপি ঋণের প্রায় ১৬ শতাংশই পরিবহন খাতের। আর ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ১০ শতাংশ রয়েছে পরিবহণ খাতে, যার ৮০ শতাংশই খেলাপি। তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে ব্যাংকগুলো পরিবহন খাতের মালিকদের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। 

সূত্র জানায়, রাজধানীর বাসমালিক ও চালকদের নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারি দল আওয়ামী লীগের হাতে। দলটির মন্ত্রী, সাংসদ, নেতা ও তাঁদের আত্মীয়রাই এখন এই খাতের মূল নিয়ন্ত্রক। প্রভাবশালী রাজনীতিকেরা পরিবহনের মালিক কিংবা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে থাকায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ফিটনেসবিহীন, রংচটা, অনুমোদনহীন পরিবহনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। ক্ষমতার ছায়ায় থাকা চালকেরাও হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। ফলে সড়কে অকাতরে প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের।

নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খান সারা দেশের পরিবহন শ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। তাঁর ভাই হাফিজুর রহমানের মালিকানাধীন কনক পরিবহন ঢাকার তিনটি পথে চলে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নাগরিকেরা প্রতিবাদ করলে পাল্টা হিসেবে শ্রমিকদের মাঠে নামিয়ে দেন মালিক-শ্রমিকনেতারা। শাজাহান খানের পর এ খাতের বড় নিয়ন্ত্রক ঢাকা সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ। তিনি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণ শাখার সহ-সভাপতিও। সরকারদলীয় সাংসদ পঙ্কজ নাথ ঢাকা ও এর আশপাশে পাঁচটি রুটে এই কোম্পানির অধীনে ২৪০টি বাস চলাচলের অনুমতি দিয়েছে পরিবহণ কমিটি। এছাড়া সাবেক দুই সংসদ সদস্য শাহিদা তারেখ ও আশরাফুন্নেছা মোশাররফ পরিবহণ ব্যবসায় যুক্ত। এর বাইরে সংসদ সদস্যদের পরিবারের সদস্য, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সরকার-সমর্থক কাউন্সিলরসহ ২০ থেকে ২৫ জনের বাস ব্যবসা আছে। মন্ত্রী, সাংসদ, নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির বেশির ভাগই বাস কোম্পানির মালিক হয়েছেন ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। 

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলোর সতর্ক হয়ে পরিবহণ খাতে অর্থায়ন করা উচিত। কারণ পরিবহণ মালিকরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।  তাই অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়েই তাদের ঋণ দেয়। যাচাই করার সুযোগ থাকে না।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ না হওয়া, সুশাসনের ঘাটতি, উচ্চ পর্যায়ের সিন্ডিকেটসহ নানা জটিলতায় পরিবহণ খাতের কাছে মানুষ জিম্মি। পরিবহণ মালিক-শ্রমিকসহ সরকারের দায়িত্বশীলদের অঙ্গিকার ছাড়া এখাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না। পরিবহণ খাত যে নৈরাজ্যের বড় উদাহরণ তার আরেকটি প্রমাণ খেলাপি ঋণের এই চিত্র। এখানে ব্যাংকগুলোও জড়িয়ে পড়ছে। একটি বড় ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এটি ভেঙে দিতে হবে। ব্যাংকগুলোর উচিত হবে নিয়মকানুন মেনে পরিবহণ খাতে অর্থায়ন করা। 

পরিবহণ খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিবহণ খাতের সব ব্যবসায়ী খারাপ নন। অনেকেই ঠিকমতো ঋণ পরিশোধ করছেন। অনেকে সেটি করেন না। সব ধরনের ব্যবসায়ী রয়েছেন পরিবহণ খাতে।

উল্লেখ্য অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৪ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ