ঢাকা, শুক্রবার 7 September 2018, ২৩ ভাদ্র ১৪২৫, ২৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভবিষ্যতে ভর্তুকি থাকবে না বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ পুরোটাই গ্রাহককে দিতে হবে ---প্রধানমন্ত্রী 

স্টাফ রিপোর্টার: আওয়ামী লীগ সভাপতি ও  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার এখন বিদ্যুতে ভর্তুকি দিলেও ভবিষ্যতে এ সুযোগ আর নাও থাকতে পারে । তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে খরচ, সেই খরচটি এখন আমরা গ্রাহকদের কাছ থেকে নিচ্ছি না। ভবিষ্যতে হয়তো এই সুযোগ থাকবে না। মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি যত হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ পুরোটাই দিতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সপ্তাহ ২০১৮’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সভাপতিত্বে এতেও আরও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম প্রমুখ। বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস বিদ্যুৎ বিভাগে সরকারের সাফল্য ও পরিকল্পনা নিয়ে অনুষ্ঠানে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন এবং খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেনা মোহম্মদ রহমাতুল মুনিম অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে সরকারের বিদ্যুৎ খাতের সাফল্য নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শিত হয়।

প্রতি কিলোওয়াটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রতি কিলোওয়াটে একটা খরচ হয়। আর এই খরচটা বর্তমানে হয় গড়ে। আমরা বিভিন্ন ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদন করে যাচ্ছি। কারণ মানুষকে বিদ্যুৎ দিতে হবে। গড়ে আমাদের প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে ছয় দশমিক ২৫ পয়সা অর্থ্যাৎ ৬ টাকা ২৫ পয়সা। কিন্তু আমরা বিদ্যুৎ বিক্রি করছি মাত্র ৪টা ৮২ পয়সায় (প্রতি কিলোওয়াট)। অর্থাৎ আমরা ভতুর্কি দিচ্ছি।’

এ ব্যাপারে দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কিন্তু ভতুর্কি দিয়ে বিদ্যুৎ দিচ্ছি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে খরচ সেই খরচটা এখন গ্রাহকদের কাছ থেকে নিচ্ছি না। তবে ভবিষ্যতে হয়তো এই সুযোগ থাকবে না।’ এক্ষেত্রে দেশবাসীকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া ও বিদ্যুৎ অপচয় বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে টানা মেয়াদে ক্ষমতাসীন সরকারের দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক বা আঞ্চলিক ভিত্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ আমদানির পদক্ষেপ তুলে ধরেন।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা যত বেশি আমদানি করতে পারি, আমাদের জন্য ভালো। যদি কিছু পয়সা বেশি দিয়েও আমদানি করি, তাতে আমাদের কোনো ক্ষতি নেই। কারণ একটা বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা, সেটাকে রক্ষণাবেক্ষণ করা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ও খরচসাপেক্ষ।’

এ সময় বিমসটেক সামিটে নেপালের সাথে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে চুক্তি হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বিমসটেক সোলার গ্রিড লাইন করে দিচ্ছি। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটা একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

বিমসটেক বিদ্যুৎ গ্রিড লাইন নিয়ে এরই মধ্যে চুক্তি সই করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বিদ্যুৎ গ্রিড লাইনের মাধ্যমে আমরা আমাদের আন্তঃদেশীয় যে বিদ্যুৎ, কে কত বেশি উৎপাদন করতে পারে এবং অন্য দেশ কিভাবে কিনবেÑ এটা আমরা স্পষ্ট করে ফেলেছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ খাতে প্রিপেইড মিটার স্থাপন, অনলাইনভিত্তিক সেবার মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে ১৪ লাখ প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ  সরবরাহ দেশের গ্রামীণ এলাকায় সরবরাহের ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের আর্থস-ামাজিক উন্নতি হচ্ছে। গ্রামের মানুষ এখন বিদ্যুৎ পাচ্ছে, এটাই হচ্ছে মূল কথা।

এছাড়াও এলএনজি টার্মিনালগুলো যেন স্থলভিত্তিক হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কাতার, রোমান থেকে এলএনজি আমদানির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট স্বাবলম্বী হয়েছে দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করি। সরকার গঠন করে মাত্র ১৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেয়েছিলাম। তখন চারদিকে হাহাকার। এ দেশের অধিকাংশ মানুষের ঘরে আলো ছিল না। সেই অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করবার জন্য সর্বপ্রথম আইন করে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করি এবং এই খাতকে উন্মুক্ত করে দেই। আমরা মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বিদ্যুতের উৎপাদন ১৬শ মেগাওয়াট থেকে চার হাজার তিনশ মেগাওয়াটে উন্নীত করতে সক্ষম হই।

গত ৯ বছরে মোট ২৪ হাজার তিনশ ৫১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য চুক্তি সই করা হয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এই সময়ে প্রায় মোট ১২ হাজার দুইশ ৫০মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে এবং ১০১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র  প্রকল্প অতিরিক্ত চালু করেছি। ২০০৯ সালের আগে যেখানে একশ বছরের বেশি সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল মাত্র ২৭টি, সেখানে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট, ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে আমরা প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছি। ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ সুবিধা প্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭ শতাংশ। বতর্মানে তা ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এখন ৯০ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করেছি। প্রতি মাসে ৩ থেকে ৫ লাখ গ্রাহক সংযোগের ফলে এখন মোট গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটিতে পৌঁছেছে।

বর্তমানে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক জ্বালানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে পূরণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত নতুন ৪টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। গ্যাসের গড় উৎপাদন দৈনিক ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দৈনিক ২ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। ৮৬২ কিলোমিটার নতুন গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে।

২০০৯-২০১৮ সময়ে ৩৩টি নতুন গ্যাস স্ট্রাকচার চিহ্নিতকরণ, ১৪টি অনুসন্ধান কূপ ও ৫৭টি উন্নয়ন কূপ খনন এবং ৪৪টি কূপের ওয়ার্কওভার কাজ তার সরকার সম্পাদন করেছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল কয়লা খনি বড়পুকুরিয়া থেকে বর্তমানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি লংওয়াল টপ কোল কেভিং (এলটিসিসি) পদ্ধতিতে গড়ে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টন উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে।

 দেশে গ্যাসের মজুদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গৃহস্থালি জ্বালানির চাহিদা পূরণে এলপিজির উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে ৫৬টি প্রতিষ্ঠানকে এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমতি প্রদান করায় এলপিজি সিলিন্ডারের দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

বিদ্যুৎ খাতে প্রিপেইড মিটার স্থাপন এবং অনলাইনভিত্তিক সেবা প্রদান করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, পায়রা বন্দর এবং মহেশখালিতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি এবং স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি নেপালের কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত বিমসটেক সম্মেলনে বিদ্যুৎ খাত নিয়ে আলোচনা করেছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন,আমরা একটা বিমসটেক সোলার গ্রিড লাইন করে দিচ্ছি। এই আন্তঃদেশীয় গ্রিডলাইনের মাধ্যমে কে কত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, তা থেকে বাংলাদেশ কিনবে, এটা আমরা স্পষ্ট করে ফেলেছি। আঞ্চলিক সহযোগিতার যুগান্তকারী পদক্ষেপটা আমরা ইতিমধ্যেই গ্রহণ করেছি।

‘অনির্বাণ আগামী’ প্রতিপাদ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের সাফল্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদানে এই জ্বালানি সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে।

জ্বালানি সপ্তাহের অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের বিতর্ক প্রতিযোগিতা, জ্বালানিবিষয়ক সেরা প্রতিবেদনের জন্য সাংবাদিক ও দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরস্কার প্রদান এবং গৃহস্থালি, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী গ্রাহকদের সম্মাননা দেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ