ঢাকা, শুক্রবার 7 September 2018, ২৩ ভাদ্র ১৪২৫, ২৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজধানীর রাস্তায় লেগুনা বন্ধের ঘোষণায় জটিলতা

# ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যের ভিত্তি জানে না বিআরটিএ

স্টাফ রিপোর্টার: রাজধানীতে লেগুনা বা হিউম্যান হলার বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া। তবে পরিবহনটি বন্ধের বিষয়ে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। পূর্বঘোষণা ছাড়াই বন্ধের আদেশ মানতে নারাজ মালিক পক্ষ। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিআরটিএ অনুমোদিত এ পরিবহনটি কোনও কর্মপরিকল্পনা ছাড়াই হঠাৎ করে বন্ধে করে দেয়া আইনসিদ্ধ হবে না। অপরদিকে বিআরটিএ বলছে, ডিএমপি কমিশনার কিসের ভিত্তিতে এমন ঘোষণা দিয়েছেন তা তারা জানেন না। 

গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর মিন্টু রোডে ডিএমপির গণমাধ্যম কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া জানান, রাজধানীর সড়কে লেগুনা বা হিউম্যান হলার চলতে পারবে না, মহানগরীতে কোনও লেগুনা চলতে দেওয়া হবে না। ডিএমপির এমন ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো-রিকশা অটোটেম্পু পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রেজাউল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরে চলাচলরত লেগুনা (হিউম্যান হলার) কোনও ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই বন্ধের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারের ফরমান জারি আইনসঙ্গত নয়। এই গাড়ি শুধু যাত্রী পরিবহনই করে না, ঢাকা শহরসহ দেশের প্রতিটি থানায় রাষ্ট্রীয় কাজেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পুলিশ রিকুইজিশন দিয়ে প্রতিটি থানায় কমপক্ষে একটি করে যানবাহন নিয়ে থাকে। তাই মাথা ব্যথা হলে মাথা কাটা নীতি পরিহার করে বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, পরিবেশ দুষণের কারণে ২০০২ সালে তিন চাকা অটো-টেম্পু ঢাকা মহানগর থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পরিবেশ বান্ধব লেগুনা (হিউম্যান হলার) চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় পাঁচ হাজার ১৫৬টি হিউম্যান হলারের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। ঢাকা শহরে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি) প্রায় ১৫৯টি রূটে এসব গাড়ি চলাচলের অনুমোদন দিয়েছে।

বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া হুট করে কোনও পরিবহনের রেজিস্ট্রেশন বা রুট পারমিট বাতিল করা যায় না। এ জন্য সব নিয়মকানুন অনুসরণ করে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বৈঠক করেই সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ঘোষণা দিতে হবে।

মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, নগরীতে ১৫৯টি রুটে প্রায় সাড়ে চার হাজার লেগুনা বা হিউম্যান হলারের অনুমোদন রয়ছে। এরমধ্যে ফার্মগেট থেকে মিরপুর-১০, ফার্মগেট থেকে মহাখালী, ফার্মগেট থেকে ঝিগাতলা, ফার্মগেট থেকে নিউমার্কেট, ট্যানারি মোড় থেকে নিউমার্কেট, গাবতলী থেকে বাড্ডা ভায়া মহাখালী-গুলশান- উত্তরা মাস্কট প্লাজা ও দিয়াবাড়ি, গুলিস্তান থেকে মালিবাগ রেলগেট-চিপাহীবাগ-গোড়ান, ডিএসসিসি নগর ভবন থেকে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা অন্যতম। এখন এই রুটগুলোকে ভিআইপি বা প্রধান সড়ক বিবেচনা করা হচ্ছে। যদি তাই করা হয় তাহলে আলোচনার মাধ্যমে এই রুটগুলোর পারমিট পাতিল করে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে রুট পারমিট দেওয়া দেতে পারে। হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলে মালিক ও চালকদের পাশাপাশি বিআরটিএ নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জানতে চাইলে এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম ফারুক বলেন, ‘বিআরটিএ প্রায় সাড়ে চারহাজার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দিয়েছে। যেসব রূটে পরিবহনগুলোর অনুমোদন রয়েছে সেসব রুটেই এগুলো চলাচল করছে। অনুমোদিত গাড়িগুলো যাত্রীসেবা দিয়ে আসছে। কিন্তু কী কারণে হঠাৎ করে লেগুনা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে তা মালিক চালক ও যাত্রীসাধারণের কাছে বোধগম্য নয়।

এই পরিবহন শ্রমিক নেতার দাবি, মহাসড়কে দুর্ঘটনা এবং মহানগরে দুর্ঘটনা একই কারণে হয় না। গাড়ি উচ্ছেদ করলেই দুর্ঘটনা কমে না এটা প্রমাণিত। এই গাড়ির সঙ্গে চালক-মালিক-যাত্রী মিলে লাখ লাখ লোক জড়িত। এদের কথা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জানতে চাইলে বিআরটিএ পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মো. মাহাবুব-ই-রব্বানী বলেন, ডিএমপি কমিশনার কিসের ভিত্তিতে এই ঘোষণা দিয়েছেন তা আমরা জানি না। তিনিই বলতে পারবেন। এমন ঘোষণার বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।

এই কর্মকর্তার কাছে প্রশ্ন ছিল- রেজিস্ট্রেশন ও রুট পারমিটপ্রাপ্ত পরিবহন বন্ধ ঘোষণা করা যায় কিনা বা করলে কোন প্রক্রিয়ায় করতে হবে? জবাবে তিনি বলেন, ডিএমপি কমিশনার কিসের ওপর ভিত্তি করে এমন ঘোষণা দিয়েছেন সেটা আমরা বলতে পারবো না।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আরটিসি কমিটির সদস্য সচিব ও বিআরটিএর উপ-পরিচালক মো. মাসুদ আলম বলেন, এই পরিবহনগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ফিডার রোডে। কিন্তু দেখা গেছে এগুলো এখন প্রধান সড়কে চলে। তাছাড়া আপনারা তো জানেন লেগুনাগুলো লক্কড়-ঝক্কড়। রোড সেফটির জন্য হুমকি স্বরূপ। আর ডিএমপি কমিশনার আরটিসি কমিটির সভাপতি। সে কারণেই ডিএমপি কমিশনার এমন ঘোষণা দিয়েছেন।

অনুমোদিত পরিবহন বন্ধ ঘোষণা করতে কোনও প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হয় কিনা- এই প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি কোনও উত্ত দেননি। তিনি পরিবহনগুলোর নানা ত্রুটি ও রাজধানীর বাস্তবতা তুলে ধরেন।

ঢাকা মহানগর ট্যাক্সিক্যাব মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক ওবায়েদ বলেন, রাজধানী ঢাকার সব পরিবহনের রুট পারমিট সংক্রান্ত আরটিসি কমিটির সভাপতি ডিএমপি কমিশনার। তিনিই এসব পরিবহনের রুট পারমিট দিয়েছেন। রুট পারমিট পাওয়ার পর রেজিস্ট্রেশন দিয়েছে বিআরটিএ। এখন হুট করে এসব পরিবহন চলতে দেওয়া হবে না বললেই তো হবে না। কারণ এই পরিবহনগুলো কেনার জন্য মালিকদের ব্যাংক ঋণ রয়েছে। মালিকরা তো আদালতে গেলে বিষয়টি আটকে যেতে পারে।

তার মতে, এগুলো বন্ধ করতে গেলে কারণ দেখাতে হবে। মালিকদের নোটিশ দিতে হবে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। একটা নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হবে। অথবা সরকারের নির্বাহী আদেশে বন্ধ করতে হবে। অনুমোদিত জিনিস হুট করেই বন্ধ করে দেওয়া যায় না।

ঢাকা জেলা হালকা যানবাহন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মোখলেসুর রহমান বলেন, এই পরিবহনগুলো ফিডার রোডে চলাচল করছে যেসব রোডে কোনও বাস সার্ভিস নেই। তাছাড়া এতে খুবই নি¤œ আয়ের মানুষ চলাচল করে। হঠাৎ করে বন্ধ করে দিলে জটিলতা দেখা দেবে। কারণ যেসব পরিবহনের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে সেগুলো তো কোনও পদ্ধতি অবলম্বন না করে বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। মালিকদের সময় দিতে হবে। এমন কোনও পরিস্থিতি হলে প্রতিকার পাওয়ার জন্য মালিকরা আদালতের স্মরণাপন্নও হতে পারেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ