ঢাকা, শুক্রবার 7 September 2018, ২৩ ভাদ্র ১৪২৫, ২৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

২শ বছরের পুরনো বাজারের ২ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন

কে এম মকবুল হোসাইন, শরীয়তপুর : নড়িয়ায় অব্যাহত পদ্মার ভাঙ্গনে গত কয়েক দিনে ২শ বছরের পুরনো মূলফৎগঞ্জ বাজারের ২ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গন ঝুঁকিতে পড়েছে পুরনো এ বাজারের আরো ৮ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যে কোন মুহূর্তে বিলীন হয়ে যেতে পারে নড়িয়া উপজলার এক মাত্র ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ও বাজার সংলগ্ন লস্কর বাড়ী জামে মসজিদ। কোন কাজেই আসেনি সরকারের অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে তীরে ফালানো জিও ব্যাগ। প্রতিদিনই বিলাশবহুল বাড়ীঘরসহ শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাওয়ায় পদ্মার পারে চলছে কান্না আর আহাজারী। রাক্ষুসী পদ্মার হিং¯্র থাবায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে হাজার হাজার পরিবারে জীবন সংসার। এক সময়ের প্রভাশালীরা এসে দাঁড়িয়েছে ভূমিহীনদের কাতারে। অনেকেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, আমাদের আর কিছুই রইলো না। ছেলে মেয়েদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। সরকারী হিসাব অনুযায়ী এ বছর নড়িয়া উপজেলার প্রায় ৪ হাজার পরিবারের বাড়ী ঘর ফসলী জমি বিলীন হয়েছে। ভাঙ্গন কবলিতরা একটু মাথা গোজার ঠাঁই খুঁজতে দিশেহারা হয়ে ছুটছে। পদ্মার তীরবর্তী লোকজনের চোখে কোন ঘুম নেই। তারা দিন রাত তাদের সর্বশেষ সম্বল ঘর-বাড়ী, দোকান-পাট সড়িয়ে নিতে প্রানপন চেস্টা করলেও চোখের সামনেই বিলীন হচ্ছে সব কিছু। এলাকাবাসীর দাবী ভাঙ্গন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এখনো নড়িয়া বাজার, ঐতিহ্যবাহী মূলফৎগঞ্জ মাদরাসা কমপ্লেক্স রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

ভাঙ্গন কবলিত এলাকাবসী জানান, এ বছর বর্ষা মৌসুম থেকে পদ্মা ভাংতে ভাংতে দক্ষিণে এক কিলো মিটার চলে এসেছে। গত ২ দিন ধরে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে ২শ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মূলফৎগঞ্জ বাজারের উত্তর পাশ। ইতোমধ্যে এই বাজারে অবস্থিত নুর হোসেন দেওয়ান ও ইমাম হোসেন দেওয়ানদের তিন তালা ৪টি ভবনসহ দুই শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একেকটি ভবন ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ সময় শত শত লোকজন শুধু আল্লাহ আল্লাহ বলে চিৎকার দিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনগুলো চোখের সামনেই বিলীন হলেও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছেন অসহায় ভাঙ্গন পিড়িত ক্ষতিগ্রস্থরা। ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্তরা জানায়, এলাকার সর্বস্বহারা মানুষগুলো দিন রাত করে একটু মাথা গুজার ঠাঁই খুঁজলেও তেমন কোন সুযোগ সুবিধা পায়নি সরকারের পক্ষ থেকে। তারা বর্ষার আগেই চেয়েছিল সরকারী কোন সাহায্য নয় পদ্মার দক্ষিণ তীরে নড়িয়া উপজেলা শহর এবং পুরনো এ মূলফৎগঞ্জ বাজারটি রক্ষায় স্থায়ী বেরিবাঁধ। এ ভয়াবহ ভাঙ্গন রোধে সরকার পদ্মা নদীর দক্ষিন (ডান) তীর রক্ষা বাধ প্রকল্প গ্রহন করে। এরপর গত ২ জানুয়ারী তীর রক্ষা বাধ নির্মাণের জন্য ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে তা একনেকের বৈঠকে পাস করে। বর্ষার আগে এ সব এলাকার হাজার হাজার মানুষ স্থাীয় বেরিবাঁধের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দাবী জানিয়ে আসছিল। কিন্তু অজানা কারণে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়নি। বর্ষার শুরু থেকে অব্যাহত ভাঙ্গন শুরু হলে ৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে কিছু জিও ব্যাগ ফেলে নদীর গতি পরিবর্তনের চেষ্টা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্ত প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং কাজ ধীর গতিতে হওয়ায় ভাঙ্গন রোধে কোন কাজেই আসেনি সরকারে এ অতিরিক্ত বরাদ্দ। রক্ষা করা যায়নি ঐতিহ্যবাহি এ বাজারসহ মসজিদ, মাদরাসা, বিলাশবহুল বহুতল ভবনসহ হাজার হাজার পরিবারের ঘরবাড়ী। এ এলাকার অনেক বিত্তবান লোকজন সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে গেছে। তাদের মাথা গোজার ঠাঁই পর্যন্ত নেই। 

বর্তমানে মারাত্মক ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে মুলফৎগঞ্জ বাজারের আরো ৮ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নড়িয়া বাজার, নড়িয়া উপজেলার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ও মূলফৎগঞ্জ মাদরাসা কমপ্লেক্স বাজারের পূর্ব পার্শ্বের লস্কর বাড়ী জামে মসজিদসহ আশপাশের আরো অনেক স্থাপনা।

ইতো মধ্যে হাসপাতালের মালামাল সরিয়ে অন্যত্র নেয়া হয়েছে এবং হাসপাতালের রোগীদের পাশের একটি ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শরীয়তপুর পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুদের খুঁটি সরিয়ে নেয়ায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে বাজার, হাসপাতালসহ আশপাশের এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ। 

এলাকাবাসীর দাবী ভাঙ্গন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এখনো নড়িয়া বাজার, মূলফৎগঞ্জ মাদরাসা কমপ্লেক্সসহ অনেক সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। অন্যথায় অচিরেই হারিয়ে যাবে আরো বহু স্থাপনা। এর আগে নড়িয়া-সুরেশ্বর সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ মক্তবসহ নড়িয়ার ওয়াপদা বাজার, বাশতলা বাজার, চরজুজিরা, সাধুর বাজার, পৌর এলাকার শুভগ্রাম, পাচগাঁও মূলফৎগঞ্জ বাজার সংলগ্ন এলাকার প্রায় ৪ হাজার বেশী পরিবারের ঘর বাড়ী নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ঈমাম হোসেন দেওয়ান বলেন, গত ২ মাসে পদ্মার ভাঙ্গনে প্রায় ৪ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। কোন জনপ্রতিনিধি সহ সরকারী কর্মকর্তারা কোন রকম সাহায্য সহযোগিতা করেনি। এলাকায় মহা দুর্যোগ চলছে। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমাদের ছেলে মেয়েদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। আমরা এখন ভুমিহীনদের কাতারে চলে এসেছি। এতে আমাদের দুঃখ নেই। এখনো যদি সরকার দ্রুতগতিতে পদ্মার দক্ষিন তীর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে তাহলে আরো হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘরবাড়ী রক্ষা করা সম্ভব হতো।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, পদ্মা নদী নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অতি কাছে চলে আসায় হাসপতালের মালামাল জেলা প্রশাসক মহোদয় এবং সিভিল সার্জনের নির্দেশ ক্রমে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। রোগিদের জন্য হাসপাতাল ভবনের দক্ষিন পার্শ্বের আবাসিক দু’টি ভববনে ভর্তি কার্যক্রম এবং জররুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতোপূর্বে প্রায় আড়াই হাজার ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। খুব শিঘ্রই ৩শ ৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ২ বান্ডেল করে টিন ও নগদ ৬ হাজার করে টাকা বিতরণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ