ঢাকা, শনিবার 8 September 2018, ২৪ ভাদ্র ১৪২৫, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইউনুছ কুতুবী : শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। নাগরিক মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্ন বস্ত্র বাসস্থান চিকিৎসার সঙ্গে শিক্ষা কোন অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন এবং আলোকিত মানুষ তৈরি করা। তাই বলা যায় জাতির উন্নতি ও প্রগতির অন্যতম বাহন শিক্ষা। শিক্ষা হল জ্ঞানের আলো। এ আলো ছাড়া কোনো আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সম্ভব হয় না, দেশ পৌঁছাতে পারে না তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। তাই দেশের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে নিরক্ষরতা দূর করে স্বাক্ষরতার ব্যাপারটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও প্রগতিকে যে সমস্যা ব্যাহত করছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নিরক্ষরতা। বাংলাদেশের প্রায় সিংহভাগ মানুষই নিরক্ষরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী অজ্ঞানতা কুসংস্কার আর পশ্চাৎপদতার শিকার। এরা প্রগতিবিমুখ। বিজ্ঞানের এ চরম উৎকর্ষের যুগেও এরা অন্ধকারে নিমজ্জমান। পিছিয়ে পড়া এ বিশাল জনগোষ্ঠী স্বাধীন জাতির জন্য মানহানিকর তো বটেই এক বিশাল বোঝাও। এদের নিয়ে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাও অলীক স্বপ্ন। তাই দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নয়নের জন্য দেশের জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীই নিজ ও দেশের উন্নয়নে স্বচেষ্ট হয়। সমাজের রীতিনীতি মেনে চলে সুশৃংখল সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য স্বাক্ষরতার কোনো বিকল্প নেই। এ উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে ১৯৬৫ সালের ৮Ñ১৯ সেপ্টেম্বর ইউনেস্কোর উদ্যোগে ইরানের তেহেরানে বিশ্বের আশিটি দেশের শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষাসচিব ও শিক্ষা পরিকল্পনাবিদদের নিয়ে বিশ্ব স্বাক্ষরতা সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। এ সম্মেলনে প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়। সে বছর ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস ঘোষণা করে। আজকের আধুনিক দুনিয়াতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হলেও সমগ্র দুনিয়ার সকল মানুষ শিক্ষার আলো গ্রহণ করতে পারেনি, এমন কি নিজের পরিচয় লিখতে পারে না লক্ষ লক্ষ মানুষ। মূলত তাদের স্বাক্ষরতা দানের উদ্দেশ্যে ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব স্বাক্ষরতা দিবস ঘোষণা করে ইউনেস্কো।
পূর্বে সাধারণত সকলে নিজের নাম লিখতে পারাকে স্বাক্ষরতা বলে থাকত। ১৯৪০ সালের দিকে লেখা-পড়ার দক্ষতাকে স্বাক্ষরতা সংজ্ঞা চিহ্নিত করে পরবর্তী সময়ে প্রতি দশকে এই সংজ্ঞার রূপ পাল্টাচ্ছে। এক সময়ে কেউ নাম লিখতে পারলে তাকে স্বাক্ষর বলা হত। কিন্তু বর্তমানে স্বাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য অন্তত তিনটি শর্ত মানতে হয়। (১) ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারবে। (২) সহজ ও ছোটবাক্য লিখতে পারবে। (৩) দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসেবনিকেশ করতে পারবে।
সারাবিশ্বে বর্তমানে এই সংজ্ঞাকে ভিত্তি করে স্বাক্ষরতার হিসেবনিকেশ করা হয়। তবে বর্তমানে এটিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক ফোরাম বা কনফারেন্স থেকে স্বাক্ষরতার সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে। যেখানে স্বাক্ষরতা সরাসরি ব্যক্তির জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সম্পর্কিত হবে। যিনি কেবল বর্ণমালার সাথে পরিচিত হয়ে দৈনন্দিন কার্যাবলী সাড়ার জন্য বাজারের তালিকা তৈরি করা, রাস্তার সাইনবোর্ড, বাসার ঠিকানা, চিঠিপত্র পড়া, টেলিফোন-মোবাইল করতে পারা সর্বোপরি নিজের নাম স্বাক্ষর-দস্তখত করতে পারবে এমন জ্ঞানসম্পন্নদের সমাজে স্বাক্ষর বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে স্বাক্ষরতা আন্দোলনের সম্পৃক্ত হওয়ার দীর্ঘদিনের এতিহ্য। এ অঞ্চলে স্বাক্ষরতার সর্বপ্রথম উদ্যোগ গৃহীত হয় ১৯১৮ সালে। খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ ও নবাব আব্দুল লতিফ প্রমুখের প্রচেষ্টায় ১৯৩৪ সালে গড়ে উঠে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র। ১৯৬০ সালে বিএইড কার্যক্রমের আওতায় সফলতায় বয়স্ক শিক্ষার কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয় শত শত দরিদ্র মানুষ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর গণশিক্ষা, তথ্য ও বিভিন্ন আদমশুমারি অনুযায়ী দেশে স্বাক্ষরতার হার ছিল ১৬ শতাংশ। এ পিছিয়ে পড়া বিশাল জনগোষ্ঠীকে স্বাক্ষরতার আওতায় আনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে (৩০,৬১৫) সরকারিকরণ করে। তিনি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে রাষ্ট্রীয় বেতনভুক্ত করেন। এতে করে প্রাথমিক শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। এর সুফল অল্পদিনের মধ্যে সবার দৃষ্টিগোচর হয়। তাই ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরতার হার দাঁড়ায় ২৫.৯ শতাংশ। ১৯৯১ সালে এ হার বেড়ে ৩৫.৩ শতাংশ হয়। তখন প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে ২০০১ সালে ৪৭.৯ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ৪৮.৮ শতাংশ হয়। ২০১০ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী ৫৯.৮২ শতাংশ। এরপর নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যুরো বাস্তবায়ন করেন। ফলে ২০১১ সালে স্বাক্ষরতার হার হয় ৬১ শতাংশ।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকার গঠন করার পর বিভিন্ন উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়, নৈশ বিদ্যালয়, পথশিশু শিক্ষা নিকেতন সৃষ্টি করে স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। শিক্ষার সাথে সাথে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেন এবং মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণের ব্যবস্থা করেন। সর্বোপরি ২০১৩ সালে রেজিস্টার্ড, এনজিও, উপ-আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয়গুলোকে (২৬,২৪৩) শিক্ষক-কর্মচারীসহ সরকারিকরণ করেন। যার সুফল অল্পদিনের মধ্যে দেখা দেয়। ২০১৭ সাল পর্যন্ত বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উদ্যেঅগের ফলে বর্তমানে দেশের স্বাক্ষরতার হার ৭১.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। তারপরও নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা প্রায় তিন কোটিরও বেশি। বর্তমান মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দাবি করেছেন ৯৯ শতাংশের অধিক শিশু স্কুলে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি কত শতাংশ স্কুল ত্যাগ করেছে সেটা বলেনি। তারপরও বলা যায় বাংলাদেশ শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে যথেষ্ট সফল হয়েছে। মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, বর্তমানে দেশের স্বাক্ষর হার ৭২.৩ শতাংশ। তিনি আরও বলেছেন, বর্তমান সরকার শিক্ষার প্রসার এবং নিরক্ষরতামুক্ত ও তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
এতকিছুর পরও আমরা নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারিনি। আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ দেশের সর্বত্র শিক্ষার আলো পৌঁছাতে পারিনি। আর দেশের সব মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছাতে না পারলে আর যাই হোক সঠিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। পৃথিবী যখন প্রতিদিন এগিয়ে যাচ্ছে তখন শত সম্ভাবনা থাকার পরও আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের দেশের জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ নিরক্ষতার বেড়াজালে বন্দি। তারা এখনো নিরক্ষরতার গ্লানি এবং দারিদ্রের দুষ্টচক্রে বন্দি জীবন যাপন করছে। বর্তমান ডিজিটাল পৃথিবীর সামনে বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে অবশ্যই আগামী প্রজন্মকে হতে হবে স্বাক্ষরতা। এ জন্য চাই সবার জন্য শিক্ষা, চাই নিরক্ষরতামুক্ত, শিক্ষিত, আত্মনির্ভরশীল, আধুনিক বাংলাদেশ। এ প্রেক্ষাপটে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বয়স্ক শিক্ষা ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য করা হচ্ছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা, গণ শিক্ষার জন্য গ্রামে গ্রামে খোলা হয়েছে গণশিক্ষা কেন্দ্র।
এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন নিরক্ষরদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি এবং কর্মোদ্যাগ। এক্ষেত্রে যেসব পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। (ক) দেশের সব মানুষকে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করার গতানুগতিক পদ্ধতি ও কৌশলের পাশাপাশি নতুন নতুন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। (খ) যে সব এলাকায় শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাই এবং মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা, মাদ্রাসা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নৈশবিদ্যালয় স্থাপন। (গ) স্বাক্ষরতার কর্মসূচিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা প্রয়োজন। (ঘ) শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে লিফলেট বিতরণ অথবা পোস্টারিং করা। (ঙ) গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা বা বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। (চ) সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার প্রতি অনুপ্রাণিত করা। (ছ) গ্রামের শিক্ষার্থীদের এবং তাদের অভিভাবকদের নিয়ে শিক্ষা সচেতনতামূলক বিভিন্ন সভা সেমিনার করা। (জ) পথশিশুদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা এবং বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা। (ঝ) বেকার এবং নিরক্ষর যুবকদের নিয়ে কারিগরি শিক্ষা এবং কর্মশালার আয়োজন করা। (ঞ) নিরক্ষরতার নেতিবাচক দিক সম্পর্কে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে অবহিত করা। গণমুখী প্রচারের জাগিয়ে তোলা। (ট) তরুণ এবং ছাত্রসমাজকে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়া। (ঠ) সর্বোপরি নিরক্ষরতা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা সামনে রেখে সরকারি ও বেসরকারিভাবে পদক্ষেপ নেয়া।
আমাদের যারা শিক্ষিত সমাজ আছি, তারা নিজ পরিবার থেকে শুরু করে সারাদেশে শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শুধু নিজে শিক্ষিত হলে চলবে না। শিক্ষার মহান শিখা ছড়িয়ে দিতে হবে দেশের আনাচে-কানাচে। আমরা যদি বাংলাদেশকে সুন্দর, সমৃদ্ধ, কল্যাণকর রাষ্ট্র তৈরি করতে চাই, তাহলে অবশ্যই স্বাক্ষরতা দিবসকে সামনে রেখে নিরক্ষরকে স্বাক্ষর জ্ঞানে গড়ে তুলতে হবে। তখনই আমরা আশা করতে পারি দেশ থেকে আগামী দিনে নিরক্ষরতা চলে গিয়ে শতভাগ স্বাক্ষরতার দিকে এগিয়ে যাবে। আসুন, আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আলোকিত সমাজ গড়ি স্বাক্ষরতা অর্জন করি, দক্ষ হয়ে জীবন গড়ি।
-লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও ইতিহাসবিদ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ