ঢাকা, শনিবার 8 September 2018, ২৪ ভাদ্র ১৪২৫, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অব্যাহত লোকসানের মুখে ইতালিতে জনতা এক্সচেঞ্জ বন্ধের নির্দেশ

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: ২০০২ সালে প্রবাসী বাংলাদেশীদের রেমিটেন্স পাঠানোর লক্ষ্যে ইতালিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানির (এসআরএল) কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত লাভে ছিল প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জনতা এক্সেচেঞ্জের লোকসান শুরু হয়। সরকারের গত ৯ বছরে লোকসানের পরিমাণ প্রায় ২৫ লাখ ইউরো অর্থাৎ বাংলাদেশী টাকায় ২৪ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অব্যাহতভাবে লোকসানে পড়া প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জানা গেছে, ইতালিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের অর্থ দেশে আনার জন্য ২০০২ সালে রোম ও মিলানে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় কোম্পানি ‘জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি এসআরএল’ নামে দুটি শাখা খুলে কার্যক্রম শুরু করে জনতা ব্যাংক। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ ১২ লাখ ৭১ হাজার ২৭০ ইউরো। যা বাংলাদেশী টাকায় ১২ কোটি ৫২ লাখ ২০ হাজার ১৯৩ টাকা। দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ ও বদনাম ঠেকাতে ২০১৪ সালে জনতা এক্সচেঞ্জের লোকসানের ১২ কোটি ৫২ লাখ ২০ হাজার ১৯৩ টাকা পুনঃভরণ করে সরকার। কিন্তু তাতেও লোকসান ঠেকানো যায়নি। প্রতিবছরই ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। লোকসানের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গত তিন বছরেই লোকসানের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৬ ইউরোতে। বর্তমানে প্রতি ইউরোর বিনিময় মূল্য ৯৮ টাকা ৫০ পয়সা। সেই হিসাবে গত তিন বছরে ১১ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ৭২৬ টাকা লোকসান করেছে এক্সচেঞ্জ হাউসটি। এ লোকসানের টাকা আবারও পুনঃভরণ চায় জনতা ব্যাংক। সরকারের অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে টাকা চেয়ে ঠিঠি দেয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ দেয়ার বিপক্ষে মত দিয়ে জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানির ইতালিতে দু’টি শাখার মধ্যে বেশি লোকসানি শাখাকে কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।
জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে সর্বশেষ তিন বছরে (২০১৫-১৭) লোকসান হওয়া প্রায় ১২ লাখ ইউরো পুনঃভরণের আবেদন করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতালিতে কার্যত কোম্পানির দুটি শাখার মধ্যে বেশি লোকসানি শাখাটি বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত লাভজনক অবস্থায় থাকলেও ২০০৯ সাল থেকে লোকসান শুরু হয়। বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৪ সাল পর্যন্ত লোকসান হয় ১২ লাখ ৭১ হাজার ২৭০ ইউরো। ওই সময় জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই অর্থ পুনঃভরণের অনুমোদন দেয়া হয়।
জনতা ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়া ও প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ার কারণে প্রতিবছরই লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে। গত তিন বছরেই প্রাায় ১২ লাখ ইউরো লোকসান হয়েছে। এসব অর্থও পুনঃভরণের অনুমোদন দেয়া হয়। পরে জনতা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ এ অর্থছাড় করার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে অনুমোদন চান। আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত চেয়ে চিঠি দেয়। পরে এ বিষয় বিবেচনা করে সর্বশেষ তিন বছরে লোকসান হওয়া অর্থছাড়ের আবেদন নাকচ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান রোম ও মিলান শাখার মধ্যে যে শাখাটির পরিচালন ব্যয় কম সেটি চালু রেখে অপর শাখাটির কার্যক্রম বন্ধের জন্য জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে পরামর্শ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
সম্প্রতি জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুছ ছালাম আজাদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনূসুর রহমানকে এক চিঠিতে গত তিন বছরের লোকসান বাবদ প্রায় ১২ লাখ ইউরোর সমপরিমাণ অর্থ ইতালিতে পাঠানোর অনুমোদন চেয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখতে দুই বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা দিয়েছেন। যদিও ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের ক্ষতিপূরণের অর্থ পাঠানোর অনুমতি দিচ্ছে না।
আবদুছ ছালাম আজাদ তার চিঠিতে বলেছেন, ২০০২ সালের জানুয়ারিতে এই এক্সচেঞ্জ হাউস ইতালিতে নিবন্ধিত হয়। ওই বছরের জুন থেকে এর কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির রোম ও মিলানে দুটি শাখা রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে দেশে পাঠানোই এ এক্সচেঞ্জ হাউসের মূল কাজ। ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক ছিল। পরে আয়কর বৃদ্ধি, সীমিত নেটওয়ার্ক, নতুন অ্যান্টি মানি লন্ডারিং আইন, রেগুলেটরি ও কমপ্লায়েন্স বাবদ খরচ বৃদ্ধির কারণে ২০০৯ সাল থেকে ক্রমাগত লোকসান দিয়ে আসছে। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১২ লাখ ৭১ হাজার ২৭১ ইউরো লোকসান করেছে। এরপর ২০১৫ সালে ৩ লাখ ২০ হাজার ৭৪৭ ইউরো, ২০১৬ সালে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫৪৮ ইউরো এবং ২০১৭ সালে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৬২১ ইউরো নিট লোকসান হয়েছে। এই তিন বছরে মোট ১১ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৬ ইউরো লোকসান হয়েছে। বর্তমানে প্রতি ইউরোর বিনিময় মূল্য ৯৮ টাকা ৫০ পয়সা। সেই হিসাবে গত তিন বছরে ১১ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ৭২৬ টাকা লোকসান করেছে এক্সচেঞ্জ হাউসটি। এর আগে ছয় বছরে লোকসান ছিল ১২ কোটি ৫২ লাখ ২০ হাজার ১৯৩ টাকা।
জনতা ব্যাংক সরাসরি নগদ অর্থ দিয়ে এই লোকসান মেটাচ্ছে। যাকে বলা হচ্ছে পুনঃভরণ। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত করা লোকসানের পুনঃভরণ ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে। এখন গত তিন বছরের লোকসানের পুনঃভরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ৫২৫তম সভায় গত তিন বছরের লোকসান পুনঃভরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এই প্রতিষ্ঠানটির মূলধন ৬ লাখ ইউরো। কিন্তু গত তিন বছরে লোকসানের পরিমাণ এর দ্বিগুণের কাছাকাছি। ইতালির কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো প্রতিষ্ঠানের এক-তৃতীয়াংশ মূলধন ঘাটতি থাকলে সেটি বন্ধ করে দেয়। ফলে জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি এখন বন্ধের মুখোমুখি। এ অবস্থায় বন্ধ হয়ে গেলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে। এ ছাড়া ইতালিতে এজেন্সি কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করার কথাও বলেছেন তিনি। এজন্য দুই বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছেন তিনি। যার মূল কাজ ইতালিতে এজেন্সি অপারেশন চালু করা। চলতি ২০১৮ সালে ৫টি ও ২০১৯ সালে ৩৫টি এজেন্সি চালু করতে চায় জনতা ব্যাংক। কিন্তু এই এক্সচেঞ্জ হাউসটি রেমিট্যান্স সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য ইতালির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইতালির কাছে এজেন্সি অপারেশন করতে লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করেছিল। তবে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইতালি অনুমোদন দেয়নি। এরপরও রহস্যজনক কারণে ক্ষতিপূরণ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখতে চাচ্ছে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ