ঢাকা, শনিবার 8 September 2018, ২৪ ভাদ্র ১৪২৫, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সড়ক যেন আরও অনিরাপদ!

আজহার মাহমুদ : নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ সড়ক এই স্লোগানে সারা বাংলাদেশ মুখরিত। সকলের একটাই দাবি কিংবা চাওয়া, সেটা হচ্ছে নিরাপদ সড়ক। কিন্তু সেটা আর হলো কই? বরং সড়কের অবস্থা আগের চেয়ে আরো বেশী নোংরা এবং ভয়ংকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে ছাত্ররা আন্দোলন করে চালকদের এই অসুস্থ বিবেকের সুস্থতা আনতে পারেনি সেখানে আর কিভাবে সড়কে শান্তি আসবে তা আমার বোধগম্য নয়। ছাত্রদের আন্দোলনে সরকার প্রতিটি দাবি মেনে নিয়ে সেই দাবি গুলো বাস্তবায়ন করছে প্রায়। কিন্তু এরপরেও দুর্ঘটনা কি বন্ধ হচ্ছে? হচ্ছে না। বরং দুর্ঘটনা নয় হত্যা হচ্ছে সাধারণ যাত্রী। আমরা সচেতন হতে বলছি, কিন্তু কিভাবে সচেতন হতে হবে সেটা বলছি না। কিভাবে সড়কে শান্তি আসবে সেটাও আমরা বলতে পারছি না। সড়কের শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমত চালকদের শান্ত হতে হবে। চালকদের বিবেক যতক্ষণ পর্যন্ত পরিস্কার হচ্ছে না, ততক্ষণ এই মরণ খেলা বন্ধ হবে না। চালকরা চাইলেই এখন মানুষকে তার গাড়ির চাকায় পিষ্ট করে ফেলতে পরছে সহজেই। আমরা যদি গত কয়েকদিন আগের ঘটনা লক্ষ্য করি, চট্টগ্রামের সিটি গেইটের কালিরহাট এলাকায় বাসের ভেতর মারধর করে, হেলাফার এবং তার সহযোগি মিলে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় রনিকে। তারপর রনির শরিরে উপর দিয়ে চালিয়ে যায় ঘাতক বাস। কুষ্টিয়ায় মায়ের কোল থেকে বাসের ধাক্কায় শিশু আফিফা রাস্তায় নির্মম ভাবে পড়ে মৃত্যু বরণ করে। ঢাকার মিরপুরে বাসের ধাক্কায় মোটর সাইকেলে আরোহী পুলিশ সদস্য উত্তম প্রাণ হারায়্। যেখানে পুলিশের প্রাণের নিরাপত্তা নেই সড়কে সেখানে সাধারণ মানুষ আর কতটুকু নিরাপত্তা আশা করবে।
এছাড়াও রংপুরে দুই বাসের সংঘর্ষে নিহত হয়েছে ৬ জন। মিরসরায়ে ট্রেনের ধাক্কায় বাসের ২ যাত্রী নিহত এবং ৩২ যাত্রী আহত। ২৬ আগষ্ট নাটোরে বেপরোয়া বাস এবং লেগুনার সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিলো ১৫ জন। এভাবে রোজ কোনো না কোনো স্থানে মানুষের মৃত্যু হচ্ছেই। সরকারি তথ্যমতে, গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৩৪ হাজার ৯১৮ জনের। যা গড়ে প্রতি বছর মৃত্যু হচ্ছে ৩ হাজার ৪৯১ জন। সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যানে জানা গেছে মাত্র ৫৫৩ দিন অর্থাৎ এক বছরের কম সময়ে ৫ হাজার ১৪ জন মানুষের মৃত্যু হয় সড়কে।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, গত সাড়ে ৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ২০ হাজারের অধিক। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন মৃত্যু বরণ করে সড়ক দুর্ঘটনায়। শুধু তাই নয় মৃত্যুর পাশাপাশি আহত এবং পঙ্গুত্ব বরণ করছে প্রায় ৬৩ হাজার মানুষ। এর দায়ভার কে বা কারা নিবে? তিবুও থামছে না সড়কের এ মরণ খেলা। মরণ খেলা চলছেই। এ মরণ খেলা থামবে না অতি সহজে। যদিনা চালকরা চায়। মানুষের মৃত্যু এটা তাদের কাছে কঠিন কিছু নয়। কারণ তাদের বিবেক এখন মারাত্বক রোগে আক্রান্ত। চালকদের হৃদয় এখন মনুষ্যত্বহীনতায় ভুগছে। তাদের কাছে আছে সব ধরনের শক্তি। আর আছে ধর্মঘটের মতো একটি বড় সুযোগ। তাদের সাথে কিছু করার মতো শক্তি আমাদের নেই। এটা বিশ্বাস করি আমি নিজেও। যাদি তাদের প্রতিহত করতে পারতাম তবে ছাত্র আন্দোলনেই পারতাম। কিন্তু সেটাই হলো না। তবে আর কোনো কিছুতেই তাদের আটকানো যাবে না। তবে এর সাথে গাড়ির মালিকদের যোগ সূত্র নেই বললে ভুল হবে। গাড়ির মালিকদের আশ্রয়ে তারা এমন হত্যাকান্ড করতে সাহস পায়। যদি মালিকদের সচেতন করা যায় তবে সড়কে মানুষ হত্যা বন্ধ করার উপায় রয়েছে। সেটা হলো চালকদের আক্রান্ত বিবেক নিরাময় করতে হবে আমাদের। আর এর জন্য আমার ব্যক্তিগত কিছু পদক্ষেপ রয়েছে।
পদক্ষেপ গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সকল চালকদের প্রশিক্ষণের এর ব্যবস্থা। অনেকে বলছে, রাস্তাঘাট বৃদ্ধি করার কথা, আবার অনেকের মন্তব্যে দেখছি, দেশের জনসংখ্য বৃদ্ধি তাই এ দূর্ঘটনা। কিন্তু আমি মনে করি এগুলো তেমন কোনো জঠিল সমস্যা নয়। এর জন্য সড়কে দুর্ঘটনা হতে হবে এটাও কোনো কারণ হতে পারে না। আমার ঘরে যদি মানুষ বেশী থাকে তবে সেই ঘরে কিভাবে থাকতে হবে সেটা আমাকেই বুদ্ধি করে থাকতে হবে। তার জন্য সাথেসাথে বাড়ির আয়তন বড় করা কখনো সম্ভব নয়। আবার তাই বলে আমি বাড়ির বাইরে থাকবো তাও কিন্তু নয়। সবকিছুই ঠিক থাকবে যদি আমরা ঠিক থাকি। তাই আমার মতে চালকদের উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে এ্ সমস্যা থেকে অতি দ্রুত আমরা মুক্তি পাবো। তাদের প্রশিক্ষণে থাকতে হবে মানবিক শিক্ষাও। প্রশিক্ষণটা শুধু গাড়ি চালানো নয়, সাথে আচরনের প্রশিক্ষণও তাদের দিতে হবে। বাংলাদেশের কোনো চালক প্রশিক্ষণ ছাড়া গাড়ি চালাতে পারবে না। এর জন্য এখন থেকে চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করতে হবে প্রশাসনের। প্রশিক্ষণ শেষে চালকদের দেওয়া হবে একটা চালক আইডি কার্ড। যে কার্ডের একটি কোড নাম্বার থাকবে এবং সেখানে তার পরিচয় সহ যবতীয় সবকিছুই থাকবে চালক সম্পর্কে। এই কার্ড ব্যতিত রাস্তায় কোনো চালক থাকতে পারবে না। এর দ্য়া-দায়িত্ব থাকবে পুলিশের হাতে। শুধু পুলিশ নয় সাধারণ যাত্রীদেরও দায়িত্ব থাকবে এই কার্ড দেখে গাড়িতে উঠা। চালকদের গলায় এই কার্ড ঝুলিয়ে গাড়ি চালাতে হবে। গাড়ির মালিকরা যদি এই কার্ড ব্যতীত কোনো চালকে গাড়ি দেয় তবে তার জন্য গাড়ির মালিক সহ শাস্তি পাবে। জানি এসকল পদক্ষেপ একদিনে সম্ভব না। তবে এখন থেকে কাজ করলে অন্তত আগামী কয়েক বছরের ভেতর হলেও সড়কে শৃংখলা ফিরে আসবে। এমন আইন করা হলে হয়তো সড়কের শৃংখলা এবং সড়কে মানুষ হত্য হবেনা।
চালকের পাশাপাশি হেলফারেরও প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। এবং হেলফারেরও কার্ড থাকা আবশ্যক। এরপর চালক হেলফারদের মাসিক একটি নির্দিষ্ট বেতন করে দিতে। দৈনিক কোনো হিসাব থাকতে পারবে না তাদের। চালকেদর বিশ্রাম দেওয়ার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। এমন সিস্টেম করতে হবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নিল কার্ড পরিধান করা চালকরা গাড়ি চালাবে, দুপর থেকে সন্ধা সবুজ কার্ড, সন্ধা থেকে রাত লাল কার্ড। এভাবে নিয়ম করে ভাগ করে দিতে হবে শুরুতেই তারপর সময়ের চালক সময়ে গাড়ি চালাবে।
দুপুরের চালক রাতে গাড়ি চালালে তার জন্য শাস্তি থাকবে। তবে এসব কিছুর জন্য এক হতে হবে সকলের। এভাবে নিয়ম মতো হলে বাংলার সড়ক হবে সব’চে সুন্দর এবং শৃংখলা পূর্ণ সড়ক। তবে দুঃখের বিষয় আমাদের এই দেশে ঘুষ দিলে সব সম্ভব। টাকা দিয়ে যদি এই কার্ড কিনে একজন অদক্ষ চালক গাড়ি চালায় তখন তার দায়ভার কে নিবে? পুলিশের কাজ রাস্তায় যাথে কার্ড বিহীন কোনো চালক গাড়ি না চালায়, কিন্তু পুলিশ যদি টাকা নিয়ে চালক এবং গাড়ি ছেড়ে দেয় তখন সে দায়ভার কে নেবে? তাই প্রশাসন থেকে শুরু করে পুলিশ এবং সাধারণ মানুষ সকলের সচেতন হতে হবে এবং যার যার দায়িত্ব নিষ্টার সাথে পালন করতে হবে। সেই সাথে সরকারের কাছে অনুরোধ বাংলাদেশের প্রতিটি সড়কে প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ দিন। যদি পুলিশ সংকট দেখা দেয় তবে নতুন করে নিয়োগ দিন। বাংলাদেশে এমনিতেও বেকারের সংখ্যা অধিক। তাই কিছু পুলিশ নিয়োগ দিলে একসাথে অনেক উপকার হবে দেশের। সড়কের প্রতিটি পুলিশের দায়িত্ব থাকবে সড়কে শৃংখলা ঠিক রাখা, সড়কে হত্যা বন্ধ করা। পুলিশ যদি পুলিশের দায়িত্ব পালন করে এবং প্রশাসন যদি তার দায়িত্ব পালন করে তবে সড়কের এই অনিরাপদ আতংক মানুষের মন থেকে চিরদিনের জন্য মুছে যাবে।
-প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও ছড়াকার

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ