ঢাকা, শনিবার 8 September 2018, ২৪ ভাদ্র ১৪২৫, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সীমাহীন বৈষম্যে ক্ষুব্ধ বেসরকারি শিক্ষকসমাজ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষাক্ষেত্রে

সাইদুল হাসান সেলিম : শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা শুধুমাত্র সুবিন্যস্ত বাক্য গাঁথার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে প্রকৃত পক্ষে তাদের সামাজিক মর্যাদা দেয়া না হলে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তে শিক্ষকদের সম্মান মর্যাদা সবার ওপরে স্থান দেয়া হয়। শিক্ষকরা জাতি গড়ার কারিগর, জাতির সুর্য সন্তান। কোনও জাতির আদব কায়দা, সততা, মানবিকতা, মূল্যবোধ দেশপ্রেম তার উপর ভিত্তি করে ঐ দেশের শিক্ষার মান ও শিক্ষকদের মূল্যায়ন। জাপানে শিক্ষকদের উচ্চ আদালতে সম্মানের সঙ্গে চেয়ারে বসার অনুমতি আছে। পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার করে ঠকানো হচ্ছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান বঞ্চনা বৈষম্য -এটা মানবিক কারণেই মেনে নেয়া  যায় না। পিয়নের চেয়ে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা কম, এটাই বাস্তবতা এবং জাতীয় লজ্জাহীনতার পরিচয়ই বহন করে বৈকি।
প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষা এস এস সি, এইচ এস সি এবং স্নাতক পর্যায়ের পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে ৯৭% বেসরকারি শিক্ষকরা যত্নের সাথে গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকে। তারা শিক্ষকতার পাশাপাশি আদমশুমারি, ভোটার গণনা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসসমূহ পালন, ক্যাচম্যান্ট এরিয়া নির্ধারণ, স্থানীয়, পৌর, সিটি কর্পোরেশন ও জাতীয় নির্বাচনে নির্ভরশীলতার সাথে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। বেসরকারি শিক্ষকগণ দেশের শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করছেন- এ সত্যিটা সবার জানা থাকা প্রয়োজন।
স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়েও, বহুধা বিভক্ত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ৩% সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বল্প ব্যয়ে পড়াশোনা করছে পুঁজিপতি ধনিক শ্রেণির সন্তানেরা। অবশিষ্ট ৯৭% বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে, সুবিধাবঞ্চিত, নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর সন্তানেরা। যাদের সামর্থ্য সীমিত অথচ শিক্ষা ব্যয় অনেকেরই সামর্থের বাইরে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসেবেই প্রাথমিক হতে উচ্চ শিক্ষা স্তরে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে ৬৩% শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে। এই শিক্ষা বঞ্চিত ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে? এরাই পরবর্তীতে সামাজে নানাবিধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ঝরে পড়া রোধের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন ছিল। আমলারা নিজেদের জীবনমানের উন্নয়নে এতটাই আগ্রহী যে, মানসম্মত শিক্ষা ও সার্বজনীন শিক্ষার বিষয়ে তাদের ভাবনা চিন্তা করার সময় কোথায়?
 দেশের স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪০% শিশুরা পিতা মাতার কাজে সহায়তা করে, এরাও শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত।  মাদকের প্রভাব সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে, দেখার যেন কেউ নেই। নানাবিধ অন্যায় অপরাধে জড়িয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে  যুবসমাজ। শিক্ষা বঞ্চিত ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাই সামাজে নানাবিধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। শিক্ষার দায়িত্ব সরকার নিয়ে, বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষা বঞ্চিত ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূল শ্রোতধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষার ব্যয় কমাতে পারে একমাত্র জাতীয়করণের মাধ্যমেই। চলতি বছরেই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করছে ২ কোটির বেশী শিক্ষার্থীরা। অথচ সরকারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে বেতন-ভাতা এবং সুযোগ সুবিধার বিশাল পার্থক্য। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। লক্ষ্য অর্জন করতে হলে, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা জরুরি।
লৌহদ- যেমনটি পাথরে বিদ্ধ করা যায় না, তেমনি কঠিন হৃদয়েও সদুপদেশ প্রবেশ করানো যায় না। আজকে হয়তোবা আমাদের মতামত, আলোচনা, সমালোচনাকে প্রশাসন যন্ত্র গুরুত্ব দিচ্ছে না, কিন্তু এমন সময় আসবে আমাদের যৌক্তিক দাবিকে উপেক্ষা করা অসম্ভব হবে।
সংসদে অনুমোদিত জাতীয় শিক্ষানীতির নীতিবাক্যগুলো শুধুমাত্র কালো কালির আঁচড়েই আছে, বাস্তবায়নে নেই। যখনই আমাদের শিক্ষায় কোন সমস্যা মহামারী আকার ধারণ করে, সেটা ক্যানসারে রূপান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত, কেউই গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে না। মূলত আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা নিয়ে সরকার শিক্ষানুরাগী, শিক্ষাবিদ কারোরই তেমন কোনও গরজ নেই। এসি রুমে বসে, বিদেশ সফর করে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশি উন্নত শিক্ষার কৌশল আমদানি করে, দেশীয় শিক্ষার মানোন্নয়ন অসম্ভব। বিদেশ সফর না করে, মাথায় গামছা পরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর মানুষের বাস্তবতা এবং শিক্ষকদের জীবনযাত্রা মূল্যায়ন করুন। শিক্ষার লক্ষ্য উদ্দেশ্য পূরণে প্রয়োজন গুণগত, যুগোপযোগী, মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি। কেবল মাত্র তা হলেই  সরকারের দেশকে এগিয়ে নেয়ার উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য দূরীকরণের একমাত্র পন্থা হচ্ছে, এমপিওভুক্ত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে অথবা ২/৩টি ধাপে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে জাতীয়করণ করা। দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যজনিত কারণে শিক্ষকদের মাঝে যে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, এতে শিক্ষার মানের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ভিত্তিতে গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখা প্রয়োজন।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মানের ত্রুটি বিচ্যুতি নিয়ে ইতিমধ্যেই দেশব্যাপী বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষক সংগঠনগুলোও বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে সোচ্চার রয়েছে প্রতিনিয়ত। বাস্তবতা হলো আমলারা বলেছেন, সরকার না বললে আমরা কি করতে পারি অন্যদিকে সরকার বলছে, এই সব সুযোগে সুবিধা তো বেসরকারি শিক্ষকরা বিধি মোতাবেকই পাওয়ার কথা। তা হলে শুভংকরের ফাঁকিটা কোথায়? সমস্যা হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। মন্ত্রী এমপিদের সদিচ্ছা থাকলেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দূর্নীতি একটুও কমেনি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও নিজ দায়িত্ব পালনে বিশ্বস্ত না হলে যত ভাল উদ্যোগ গ্রহণ করুকনা কেন, সুফল পাওয়া অসম্ভব। আমলাদের দুর্নীতিগ্রস্ত মানসিকতা ঠিকই অনৈতিক পন্থা খুঁজে বের করবেই। আমলাদের অর্থবিত্ত আর ক্ষমতার আকাশ ছোঁয়া আকাক্সক্ষা সকল অনর্থের মূল। অথচ জাতির সবচেয়ে মেধাবী এই শ্রেণিটির কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি।
সরকারি বেসরকারি বৈষম্য সৃষ্টিতে আমলাদের কৌশলী উপাখ্যান:
১। বেসরকারি শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা  ২০০x৫= ১ হাজার ও ১০০x৫= ৫০০ অবমাননাকর কৌশলী ৫গুণ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিলেন?
২। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত বৈশাখী ভাতা শিক্ষকরা না পাওয়ার মূলে?
৩। বিগত তিন বছর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বেসরকারি শিক্ষকরা না পাওয়ার কুশিলব?
৪। বেসরকারি শিক্ষকদের অপমান জনক ২৫% উৎসব ভাতা নির্ধারনের মূল হোতা?
৫। চাকরি জীবনে একটি ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রেখেছেন?
৬। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল বন্ধ রাখার কৃতিত্ব?
৭। জনবল কাঠামোতে ৮ বছরের পরিবর্তে ১০ বছর এবং ১২ বছরের পরিবর্তে ১৬ বছর টাইমস্কেল নির্ধারণ  নীতিমালা?
৮। শিক্ষকদের বদলীর বিরোধিতায় ?
৯। ৫:২ অনুপাতে সহকারী অধ্যাপকের বিধান কাদের?
১০। এমপিওভূক্ত শিক্ষা জাতীয়করণের সুক্ষ্ম  বিরোধীতাকারি কারা?
১১। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে মানদ-ের ভিত্তিতে জাতীয়করণের ঘোষণা কার্যকারিতা স্থগিত কেন?
১২। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর মাধ্যমিক স্তরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা ফলাফল কি?
শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে জাতীয় উন্নয়নে সর্বাধিক অবদান রাখার পরও  সমাজে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। শিক্ষকরা আজ পারিবারিক সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় সকলের কাছে অবহেলা অমর্যাদার পাত্র। বৈষম্যের কারণে শিক্ষকদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ আর হতাশা। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে আমাদের শিক্ষার মানের উপর। পরিশেষ বক্তব্য, সকল নাগরিকের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই একযোগে এমপিওভূক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা দিতে হবে। জাতীয়করণের মাধ্যমে বৈষম্য দূরীকরণের ফলে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যপক মানোন্নয়ন হবে বলে বিশ্বাস করি। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হলে-
** প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন। শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।
** সরকারের হাতে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকবে।
** বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করা হবে।
** মেধাবীরা শিক্ষকতায় আকৃষ্ট হবে।
** কোচিং, প্রাইভেট, নোট গাইড বন্ধ করা সম্ভব হবে।
*”  শিক্ষকদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
** সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুণগত শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
** প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে এতে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে।
** পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন সহজতর হবে।
** মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
**  বৈষম্য বিলোপে শিক্ষকরা আন্তরিক ভাবে দায়িত্ব কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হবে।
** ঝরে পড়া রোধ করা সম্ভব হবে।
** সমাজে বিদ্যমান অন্যায় অপরাধ, ইভটিজিং,
মাদকাসক্তি ও বিশৃঙ্খলা অনেকাংশেই কমবে।
** বাল্যবিবাহ রোধে সহায়ক হবে।
সর্বোপরি শিক্ষাক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সরকার ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অতএব সকল সমস্যার সমাধানে এমপিওভূক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণই যুগান্তকারী ও যুক্তিযুক্ত পদক্ষেপ হবে বলে বিশ্বাস করি।
-সভাপতি, বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারি ফোরাম, ঢাকা বাংলাদেশ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ