ঢাকা, শনিবার 8 September 2018, ২৪ ভাদ্র ১৪২৫, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কয়রায় সরকারি সেবার অভাবেই ক্লিনিক ব্যবসা জমজমাট

খুলনা অফিস : খুলনার কয়রা উপজেলা সদর থেকে ২০/২৫ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন। আবার উপজেলা সদরের উত্তরের ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অর্থাৎ ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েই একটি উপজেলার বাসিন্দাদের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিতে হয়। পক্ষান্তরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতেও রয়েছে ব্যাপক জনবল সংকট। শুধুমাত্র চিকিৎসক সংকটই আছে ২২ জন। যেখানে থাকার কথা ২৯জন। পদায়ন করা হলেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকরাও যেতে নারাজ লবণাক্ততাসহ যাতায়াত ব্যবস্থার দুরাবস্থার কারণে। সব মিলিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই খুলনার একেবারে দক্ষিণের সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলায় গড়ে উঠেছে একাধিক নাম সর্বস্ব এমনকি অবৈধ প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে স্থানীয় মানুষগুলো প্রতিনিয়তই নাজেহাল হচ্ছেন। প্রায়ই রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে ওইসব নাম সর্বস্ব ক্লিনিকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়রা উপজেলা সদর থেকে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান তথা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দূরে থাকায় এ উপজেলার লোকদের প্রায়ই অপচিকিৎসকার শিকার হতে হয়। উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের জোরশিং গ্রামের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক মিলন হোসেন বলেন, সেখানকার লোকজন চিকিৎসা সেবার জন্য লঞ্চ বা বাসযোগে খুলনার দিকে চলে যেতে বাধ্য হয়। এজন্য উপজেলা সদরে সরকারিভাবে একটি হাসপাতাল নির্মাণ দীর্ঘদিনের দাবি। এজন্য থানা সংলগ্ন এলাকায় জায়গাও দেখা হয়েছে। ১০ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। আর ওই হাসপাতাল নির্মাণের পর এর নাম নির্ধারণ নিয়েও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। কয়রা হাসপাতাল নাম দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হলেও বেসরকারিভাবেই সেখানে আগে থেকেই গড়ে উঠেছে কয়রা হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। সে ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত সরকারি হাসপাতালটির নামকরণও ওই বেসরকারি হাসপাতালটির জন্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশংকা রয়েছে।
কয়রার পাঁচটি ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের মধ্যে সবচেয়ে ‘মানসম্মত’ বলে দাবিদার ‘কয়রা হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার’। ওই ক্লিনিকটি পরিদর্শনকালেও পাওয়া যায়নি কোন চিকিৎসক ও নার্সকে। ক্লিনিকটির মালিককে পাওয়া যায় দোতলার একটি রুমে লুঙ্গি পরা অবস্থায়। রাতে ক্লিনিকের নির্দিষ্ট নাম্বারে ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি আবাসিক মেডিকেল অফিসারকে। একজন নারী নিজেকে ডিপ্লোমাধারী নার্স হিসেবে পরিচয় দিলেও দুপুরে ক্লিনিকটির মালিক নিজেই জানান, তিনি সবে বিজ্ঞাপন দিয়ে ডিপ্লোমাধারী নার্স নিয়োগের প্রস্তুতি নিয়েছেন। এভাবেই নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির মধ্য দিয়ে চলছে কয়রা উপজেলার চিকিৎসা ব্যবস্থা।
সরেজমিন জানা যায়, কয়রা মেইন রোডের আবহাওয়া অফিসের বিপরীত দিকের একটি নির্মাণনাধীন ভবনে কয়রা হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের সাইনবোর্ড দেখে তার দোতলায় গিয়ে একটি রুমে পাওয়া যায় মো. আলমগীর হোসেন নামের একজন ব্যক্তিকে। নিজেকে তিনি একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনিই ওই ক্লিনিকটির মালিক। দীর্ঘ সময় কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি নিজেকে উপজেলা ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতিও পরিচয় দেন। যদিও তিনি অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার ক্লিনিকটি যতটা মান সম্মত অন্য কোন ক্লিনিকেরই সেটি নেই। আর সেই কথিত ‘মান সম্মত’ ক্লিনিকটির অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে দেখা যায় বিকেলে পশ্চিমের জানালা দিয়ে রোদ পড়ে। একটি ওটি টেবিল পুরাতন। সেখানকার কোন ক্লিনিকেই এনেসথেসিয়ার (অজ্ঞান করার) জন্য নির্দিষ্ট কোন ডাক্তার নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাতক্ষীরার একজন ডাক্তারের নাম ব্যবহার করে তিনি অনুমোদন নিয়েছেন। খুলনার স্বাস্থ্য বিভাগের দেয়া তালিকায় জেলার নয়টি উপজেলায় যে ২৯টি লাইসেন্সবিহীন ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের নাম রয়েছে তার ২০ নম্বরে রয়েছে ওই প্রতিষ্ঠানটির নাম। আবার স্বাস্থ্য বিভাগের তালিকায় ক্লিনিক হিসেবে সেটির রেজিষ্টেশন ‘আছে’ উল্লেখ করা হলেও তালিকায় অন্য ৪০টি ক্লিনিকের রেজিষ্ট্রেশন নম্বরের ন্যায় রেজি: নম্বর উল্লেখ নেই কয়রা হসপিটাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের। যদিও ওই ক্লিনিকের নিজস্ব ভিজিটিং কার্ডে উল্লেখ রয়েছে রেজি: নম্বর-১০৬৭৪। ক্লিনিক মালিক মো. আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, তার ডায়াগষ্টিক সেন্টারে শুধুমাত্র এক্স-রে ছাড়া প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। সেখান থেকে প্রতিনিয়ত দেয়া হচ্ছে ডায়াগনষ্টিক রিপোর্টও। ডাক্তারের স্বাক্ষর থাকলেও এজন্য কোনো দক্ষ টেকনিশিয়ান নেই বলেও পরিদর্শনকালে দেখা যায়।
আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসেবে ডা. কিশোরী মোহন বিশ্বাসের নাম ও তার জন্য একটি রুম থাকলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মালিক বলেন, তিনি মধ্যাহ্ন ভোজে গেছেন। রাত ১০টায় ক্লিনিকের নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে আরএমওকে চাইলে বলা হয়, তিনি সকাল নয়টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত অফিস করেন। গতরাতে কথা বলার সময় সেখানে ছিলেন না কোন ডিউটি ডাক্তারও।
এর আগে অন্যান্য ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারগুলো পরিদর্শনকালে দেখা যায় এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান অবস্থিত দোতলার উপরে। যার নিচতলায় দোকান বা হোটেল রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান দেখা যায় টিনসেডে। সেখানে রোগী দেখছেন একজন এলএমএফপি। যদিও রোগীদের দেয়া প্রেসক্রিপশনে ওই ব্যক্তি নিজেকে ডাক্তার উল্লেখ করেছেন।
খুলনার সিভিল সার্জন ডা. এএসএম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নানা অনিয়মের কারণে কয়রার চারটি ক্লিনিকই চিঠি দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কয়রা হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার সম্পর্কে তিনি বলেন, সেটিও পরিদর্শনকালে ব্যাপক অনিয়ম লক্ষ্য করা যায়। যে কারণে তাকে শোকজ করা হয়েছে। আর শোকজের পরই ওই ক্লিনিক মালিক সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন।
কয়রা হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছর ১৪ অক্টোবর উপজেলার মঠবাড়ী গ্রামের দুলাল চন্দ্রের স্ত্রী বিথীকা রানী (২০) নামে এক প্রসূতি অপচিকিৎসায় মারা যান এ হাসপাতালে। তার প্রসব বেদনা উঠলে সেখানে নেয়ার পর কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক সিজার করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে তড়িঘড়ি করে রোগীকে বিদায় দেয়া হয়। রোগীর আত্মীয় স্বজন তাকে পরে পাইকগাছা হাসপাতালের দিকে নেয়ার পথে রোগীর মৃত্যু হয়। পরে অপচিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর প্রতিবাদে স্থানীয় লোকজন প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। বিচার চেয়ে প্রসূতির স্বামী খুলনা সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং কয়রা থানার অফিসার ইনচার্য বরাবর পৃথক পৃথক লিখিত অভিযোগও করেন।
বিষয়টি নিয়ে তদন্তও করেন খুলনার সিভিল সার্জন আ. রাজ্জাক। এ বিষয়ে তিনি বলেন, তদন্ত করে রোগী যে যথাযথ চিকিৎসা পায়নি সেটি নিশ্চিত হওয়া গেলেও যেহেতু রোগীটির মৃত্যু হয়েছে বাইরে সেহেতু ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল বলেও তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ