ঢাকা, রোববার 9 September 2018, ২৫ ভাদ্র ১৪২৫, ২৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তামা কাঁসার ও পিতলের তৈজসপত্র

মুহাম্মদ নূরে আলম: আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্য পিতল-কাঁসা শিল্প। নিত্য নতুন সিরামিক, মেলামাইন, কাঁচ ইত্যাদির সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ পিতল-কাঁসার ব্যবহার একেবারেই কমিয়ে দিয়েছেন। নিকট অতীতেও পিতল-কাঁসা সামগ্রী গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নিত্য ব্যবহৃত হিসেবে দেখা যেতো। বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়ার সাথে সাথে এসবের ব্যবহারে ভাটা পড়েছে। ঢাকা জেলার বৃহত্তম উপজেলা ধামরাই এলাকা কাঁসা-পিতলের জন্য বিখ্যাত ছিল। ওই সময় শুধু বাংলাদেশ নয়, দেশের বাইরেও ছিল এর প্রচুর চাহিদা।
এছাড়া বিদেশী পর্যটকরা এক সময়ে কাঁসা-পিতলের মধ্যে কারুকাজ খচিত বিভিন্ন দেবদেবী ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যেতো। কিন্তু এই পিতল-কাঁসা শিল্পের ঐতিহ্য আজ নানা সমস্যার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সাথে জড়িত শিল্পী ও ব্যবসায়ীরা বর্তমানে অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছে। তাদের দেখারও কেউ নেই। পিতল-কাঁসা শিল্পে জড়িত শিল্পীরা পৈতৃক পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এই কারুশিল্পী ও ব্যবসায়ীদের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কখনো কোন পদক্ষেপ নেয়নি সরকার।
কাঁসার তৈজসপত্র আমাদের ঐতিহ্য ও বাঙালী সামাজিক জীবনের অন্যতম কালচারের অংশ। প্রায় একদশক আগেও গ্রামগঞ্জে গেলে এসব কাঁসার জিনিসপত্র চোখে পড় তো। বাঙালির গৃহস্থালি ও কৃষ্টির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে তামা, কাঁসা ও পিতলশিল্প। একসময় বিয়ে, খৎনা, জন্মদিন, আকিকা প্রভৃতি অনুষ্ঠানে প্রধান উপহার সামগ্রী ছিল কাঁসার গ্লাস, বাটি, ফুলদানি, চামচ, রেকাব শানকে, গামলা, বেলিবগি, পানদানি, থালা, পিতলের টব, কলসি, বালতি, কড়াই, পানের থালা, ধূপদানি, তামার কলস, হাঁড়ি-পাতিল, পুষ্পপাত্র ইত্যাদি। যেকোনো অনুষ্ঠানেও দেওয়া হতো নাম খোদাই করা এসব কাঁসার । সেসব উপহার স্থান দখল করে নিয়েছে আধুনিক ডিজাইনের চীনামাটি, পাইরেক্স, মেলামাইন, প্লাস্টিক, কাঁচ ও স্টিল। কাঁচামাল কারিগরের অভাবে বাংলা ঐতিহ্য তামা, কাঁসা ও পিতলশিল্প হারিয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে।
এক সময় টাঙ্গাইলের কাঁসা ও পিতলের তৈরি তৈজসপত্রের ব্যাপক চাহিদা ছিল সারা দেশে। দেশের চাহিদা মিটিয়েও কাঁসা ও পিতলের তৈজসপত্র বিদেশে রফতানি হতো। সুদৃশ্য কারুকার্য ও অনুপম গুণগত মানের জন্যই টাঙ্গাইলের কাঁসা ও পিতলের তৈরি তৈজসপত্র এতটা প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল। কাঁসা ও পিতলের অপূর্ব শিল্প কর্মের জন্য ব্রিটিশ সরকার কাঁসা শিল্পীদের মধ্যে নাম করা অনেককেই প্রশংসা ও পদকে ভূষিত করেছেন। এদের মধ্যে প্রয়াত মধুসূদন কর্মকার, গণেশ কর্মকার, বসন্ত কর্মকার, যোগেশ কর্মকার, হারান কর্মকার উল্লেখযোগ্য কাঁসা একটি মিশ্র ধাতব পদার্থ। বাংলায় এ মিশ্র ধাতব শিল্পটি কখন, কোথায় শুরু হয়েছিল, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়না । তবে শিল্প গবেষক ও নৃবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ একে পাহাড়পুর মহাস্থানগড় সভ্যতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চান। এই শিল্পকে রামায়ণ-মহাভারতের যুগের বলেও মনে করেন অনেক অভিজ্ঞ লোকশিল্পী। বংশগত পেশায় কাঁসার শিল্পী প্রয়াত যোগেশ চন্দ্র কর্মকার মনে করতেন, রামায়ণ-মহাভারতের জীবনচর্চায় পূজা-পার্বণে কাঁসার তৈরি ঘটি-বাটি বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহারে তিনি এ ধারণা পোষণ করতেন।
১৫৭৬-১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল শাসনামলে এ দেশে তামা, কাঁসা ও পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। এসব ধাতু দিয়ে তারা ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুক, বন্দুক ও কামান তৈরি করত। ব্রিটিশ শাসনামলে এ শিল্পের প্রসার ঘটে এবং বাংলার ঘরে ঘরে এর ব্যবহার খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আর এ শিল্পের ছোট-বড় বহু কারখানা গড়ে ওঠে।
নৃবিজ্ঞানীদের তথ্যসূত্রে জানা যায়, এ শিল্পের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সে সময়ের রাজা প্রদ্যুৎ কুমার ঠাকুর। তিনি প্রথম এই হস্তশিল্পের সামগ্রী নিজে ব্যবহার করেন এবং বিভিন্ন রাজা-বাদশা থেকে শুরু করে লন্ডনের রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত এ স্বর্ণোজ্জ্বল রাজকীয় নকশার ডিনার সেট উপঢৌকন হিসেবে রাজপরিবারে পাঠিয়েছিলেন।
১৯৪২ সালে লন্ডনের বার্মিংহাম শহরে সারা বিশ্বের হস্তশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সে প্রদর্শনীতে জামালপুরের ইসলামপুরের কাঁসার বাসন দর্শকের বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর ফলে শিল্পী জগৎচন্দ্র কর্মকার তাঁর হাতে গড়া তৈজসপত্রের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ কাঁসাশিল্পী হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন। এতে করে সারা বিশ্বে কাঁসাশিল্পের পরিচিতি লাভ করে এর চাহিদা দিন দিন আরও বেড়ে যায়।
কাঁসার তৈরি নান্দনিক তৈজসপত্র: দেশে কাঁসাশিল্পের অঞ্চল হিসেবে খ্যাত ধামরাই, শিমুলিয়া, টাঙ্গাইলের কাগমারী, বগুড়ার শিববাড়ী, রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও জামালপুরের ইসলামপুর কাঁসাশিল্প গড়ে উঠেছিল।
ঢাকার পার্শ্ববর্তী শহর ধামরাইয়ে এখনো এই কাঁসাশিল্পের কিছুটা অস্তিত্ব রয়েছে। বেশ কয়েকটি পরিবার জড়িত আছে এই কাঁসাশিল্পের সঙ্গে। তারা অবশ্য থালাবাসন তৈরি করে না। তারা কিছু কাঁসার মূর্তি তৈরি করে এবং সেগুলো বাজারজাত করে, যা এখন শুধুই শো পিস হিসেবে আমরা ঘরে ব্যবহার করে থাকি। কাঁসাশিল্পী মলয় বণিক জানালেন, তাঁদের পৈতৃক ব্যবসা ছিল কাঁসাশিল্পের। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সেসব ব্যবসা এখন বন্ধ। তাঁরা শুধু ঘরের শোপিস হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এমন কিছু কাঁসার জিনিসপত্র তৈরি করে বাজারজাত করে থাকেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বাপ-দাদারা এ শিল্পের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু এখন কাঁসাশিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে। আমরা নামে মাত্র কিছু শোপিস তৈরি, অর্থাৎ কাঁসার মূর্তি এবং নানা ধরনের শো পিস তৈরি করছি।’ সরকারি সাহায্য প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, কাঁসাশিল্পের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরা কোনো ঋণ পান না বা সরকার এই খাতে কোনো ভর্তুকি বা অন্য কোনো সহযোগিতাও দেয় না। যে কারণে খুব কম সময়ের মধ্যে এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী এই কাঁসাশিল্পের বিলুপ্তি ঘটবে। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় দরিয়াবাদ গ্রামে কারুকার্যম-িত শতভাগ হাতে তৈরি নান্দনিক কাঁসার শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছিল সেই আদি যুগ থেকে। কিন্তু বর্তমানে বাড়ছে তামার দাম। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে টিনঙ্গটের দাম। এক কেজি টিনঙ্গটের দাম ২০০ টাকা থেকে বেড়ে পাঁচ হাজার টাকা হয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এ ছাড়া এ টিনঙ্গট বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যা একমাত্র মালয়েশিয়ায় পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি উদ্যোগের অভাবে তা চাহিদামতো আমদানি করা হচ্ছে না। এ ছাড়া শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্তদের সহজ শর্তে ব্যাংকঋণও দেওয়া হচ্ছে না।
ইসলামপুরের কাঁসা শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র কর্মকার জানান, তাঁদের বংশগত ঐতিহ্য এবং পেশাগত দিক থেকে এই কারুশিল্পটি ধরে রেখেছেন। আগে কপার বা তামা এবং টিনঙ্গটের মূল্য কম ছিল। তাই পণ্য তৈরির খরচ এখনকার চেয়ে তুলনামূলক কম পড়ত। কিন্তু এখন তাঁদের বাজারজাত ২০০ টাকা কেজির টিনঙ্গট চার হাজার ৫০০ টাকা কেজিতে কিনতে হয়। এ কারণে আট গ্রাম তামা এক হাজার ২০০ টাকা এবং ২০০ গ্রাম টিনঙ্গট প্রায় এক হাজার ১০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ক্রেতারা উচ্চমূল্যে এখন আর এ পণ্য কিনতে চান না। এতে করে কারিগর বা শিল্পীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হয় না। অনেকেই বাঁচার তাগিদে এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন।
একসময় টাঙ্গাইলের কাঁসা, তামা ও পিতলশিল্প বিশ্ববিখ্যাত ছিল। টাঙ্গাইলের কাগমারিতে তৈরি ‘কাগমারি কলস’ নামে বিখ্যাত একটি পণ্যের চাহিদা ছিল দেশজুড়ে। এসব শিল্পের অন্যান্য পণ্যের মধ্যে ছিল পূজার ঘট, ঘণ্টা, তাম্রকু-, জাহাজের ঘণ্টা, গামলা, প্রদীপ গাছা, পিতলের মূর্তি, সংগীতের যন্ত্রপাতি, সন্দেশ পেয়ালা, বেলিবগি, টেডিগ্লাস, রাজভোগ, রাধাকান্তী, হাতঘণ্টা, স্কুলের ঘণ্টা, চাদরে ঘটি, গিনি গ্লাস, বেলেশ্বরী ইত্যাদি। বর্তমানে ঢাকা জেলার ধামরাই, জামালপুর, ইসলামপুর, নবাবগঞ্জ ও বিক্রমপুরের ঘোড়দৌড় বাজার, টাঙ্গাইল জেলার কাগমারি, বাঘিল, মগড়া ও বল্লায় বেশকিছু ক্ষুদ্র ও বড় কারখানা রয়েছে। এ শিল্পটিও কি মসলিন শিল্পের মতো বিলীন হয়ে যাবে কালের গর্ভে? নাকি পরবর্তী প্রজন্মকে আমরাও দিতে পারব একটি একান্ত আপন অনুভূতি? জন্মদিনে প্রিয়জন একটি কাঁসার গ্লাস কিংবা ফুলদানিতে নাম খোদাই করা উপহার দিলে সেটি সে আনকোরা আবেগে সযতেœ রাখবে নিজের কাছে। ব্যবহারের সময় মনে পড়বে সেই উপহারের কথা। আনমনে, আপনমনে কেউ কেউ তাকিয়ে ভাববে খোদাই করা নিজের নামে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ