ঢাকা, রোববার 9 September 2018, ২৫ ভাদ্র ১৪২৫, ২৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গণতন্ত্র ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে আন্দোলনে নামতে হবে

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে দি ঢাকা ফোরাম আয়োজিত উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসন শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন -সংগ্রাম

* সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ৫২, ৬৯ ও ৭১-এর মতো আন্দোলন করতে হবে --- এম. হাফিজ উদ্দিন
* ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতা না ছাড়ার নির্বাচন জাতিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে --- ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন
* ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে --- ড. সালেহ উদ্দিন
* দেশে বিচারহীনতা, দুর্নীতি ও ভোগের সংস্কৃতি চলছে ---- আলী ইমাম মজুমদার
* বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ মানুষ এখন আর বিশ্বাস করে না ---- আবু আহমেদ
স্টাফ রিপোর্টার: ‘উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্টজনরা বলেছেন, দেশে উন্নয়নের যে কথা বলা হচ্ছে তা বাস্তবসম্মত নয়। প্রচারণার উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে অগ্রগতি দেখালেও মানুষের ব্যক্তি জীবনে তার প্রভাব পড়েনি। বরং দিনকে দিন ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বেড়েছে। তাছাড়া গণতন্ত্র বাদ দিয়ে শুধু উন্নয়ন হলে তা যেকোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে। বক্তারা টেকসই গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে আন্দোলনে নামারও পরামর্শ দেন। বক্তারা বলেন, দেশে বিচারহীনতা, দুর্নীতি ও ভোগের সংস্কৃতি চলছে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ’৫২, ’৬৯ ও ’৭১-এর মতো আন্দোলন করতে হবে। কেননা ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতা না ছাড়ার নির্বাচন জাতিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে। তারা বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ মানুষ এখন আর বিশ্বাস করে না। আমরা ভাঙ্গা সেতুর উপর দাঁড়িয়ে আছি। এ সেতু যেকোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে।
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে দি ঢাকা ফোরাম আয়োজিত ‘উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্টজনেরা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও দি ঢাকা ফোরামের চেয়ারম্যান ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বৈঠকে বক্তব্য রাখেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সুজন সভাপতি এম. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক উপদেষ্টা ও নিউ নেশন পত্রিকার সম্পাদক ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন, সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ ড. রাশেদ তিতুমীর, ড. মাহমুদুর রহমান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক ড. ম. ইনামুল হক. ঢাবির সাবেক অধ্যাপক শামসুল হক, ঢাবি সহকারী অধ্যাপক ড. রাফিয়া রহমান, সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ফিনান্সিয়াল এক্সসিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ট্রেড হাব লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, দি ঢাকা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সাবেক রাষ্ট্রদূত এম সিরাজুল ইসলাম, এফ এ শামীম আহমেদ, ইফতেখারুল করিম, মাসুদ আজিজ, প্রফেসর ডা. এম মাজহারুল হক প্রমুখ।
এম. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। এক দলের নেত্রী সারাদেশ ঘুরে ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। আর বিরোধীদলের নেতারা তা করতে পারছেন না। তিনি দেশবাসীকে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ‘৫২, ৬৯ ও ৭১’ সালের মত আন্দোলন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা বাঙ্গালিরা এক সময় খ্বুই প্রতিবাদী ছিলাম। সে সময় শুধু আন্দোলন নয়, সশস্ত্র আন্দোলন হয়েছিল। এখন সেই সাহস গেল কোথায়?
সুজন সভাপতি বলেন, আগে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করার বিধান ছিল। এখন আইন করে সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না। তারা এখন ইভিএম প্রকল্প হাতে নিয়ে আছে। প্রকল্প পাস হওয়ার আগেই একটি প্রতিষ্ঠানকে ইভিএম কিনতে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যারা ইতোমধ্যে এলসিও খুলে ফেলেছে। কাজের অর্ডার পাবার আগেই কিভাবে এলসি খোলা হল তা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, ইসির উচিত সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা। সবাই যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে সে ব্যবস্থা করা। না হলে তাদের চলে যাওয়া উচিত।
সুজন সভাপতি বলেন, দেশের সর্বত্র এখন বিশৃংখলা চলছে। ব্যাংকে চরম নৈরাজ্য চলছে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ ও সৎ নেই। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার, প্রশাসনসহ একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্য দিয়ে সব প্রতিষ্ঠান চলছে। সবকিছু রাজনৈতিকভাবে দেখা হচ্ছে। চাকরির জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনে গিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে সে কোন দল করে, কোন দলকে ভোট দেয় ইত্যাদি। উন্নয়নের মহাসড়কে ওঠার দাবি করা হচ্ছে। অথচ সাধারণ মানুষের জীবনমানে কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেন, ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতা না ছাড়ার নির্বাচন জাতিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে। মনে রাখতে হবে, অবাধ নির্বাচনের দাবি, জাতীয় দাবি এটা কোনো দল বিশেষের দাবি নয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের নির্বাচন সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত। ভোট চুরির প্রয়োজনে যারা শাগণতন্ত্র ভেঙ্গেছে তাদরেকেই সমাধান দিতে হবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ব্যাংকিং খাতে এখন সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে। ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। এখন এই খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সুশাসনের অভাব। অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বলতে কিছু নেই। ব্যাংকিং খাতের জন্য যেসব নীতিমালা, আইনকানুন, আন্তর্জাতিক রীতি আছে সেগুলো সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা না থাকলেও অনিশ্চয়তা আছে। কী হবে, না হবে। কী ধরনের সরকার হবে। দেশে সুশাসনের অভাব চলছে, স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা নেই। কেউ অন্যায় করলে শাস্তি হয় না। সবচেয়ে মারাত্মক হল ‘রুল অব ল’ নেই। আইন আছে কিন্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। রাজনীতির আসল জিনিসটা যে খালি ভোট দিলে হয়ে গেল তা নয়। সুশাসন ছাড়া কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি আরো বলেন, দেশে রাজনীতির চর্চা জনগনের স্বার্থে হচ্ছে না। রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সুস্থ রাজনীতি চর্চার অভাব প্রকট। জনগণকে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পৃক্ত না করার প্রবণতাও বেশি। এতে জনগনের অনেক সমস্যার সমাধান হয় না। সবচেয়ে বড় বিষয় সমস্যাগুলোর সমাধান না করে বরং তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয় এবং এর দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতা বিদ্যমান।
মূল প্রবন্ধে ড. সালেহ উদ্দিন বলেন, উন্নয়নকে সুশাসন ও গণতন্ত্র থেকে আলাদা করে দেখা ঠিক নয়। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। গণতন্ত্র ছাড়াও বিশ্বের কিছু দেশে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সে উন্নয়ন টেকসই ও সমতা ভিত্তিক নয়। সেখানে শুধু বস্তুনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও ভোগবাদের প্রসার হয়েছে। মূল্যবোধ, ব্যক্তি স্বাধীনতা এগুলোর প্রাধান্য দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ওই পথে চলুক, আমরা সেটা চাই না। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন দুটিই পাশাপাশি চলতে হবে। আপনি শুধু উন্নয়ন নিশ্চিত করলেন আর গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে গেলেন তাহলে স্থায়ী, টেকসই, সমতাভিত্তিক ও অর্থবহ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। ড. সালেহ আরো বলেন,  দেশে উন্নয়নের বিভিন্ন সূচক বাড়লেও তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌছাচ্ছে না। দিন দিন ধনী দরিদ্রের ফারাক বাড়ছে। এই অসম উন্নয়ন গ্রহণযোগ্য নয়।
আলী ইমাম মজুমদার বলেন, দেশে বিচারহীনতা, দুর্নীতি ও ভোগের সংস্কৃতি চলছে। মানুষের আয় বৈষম্য বেড়েছে। মধ্যবৃত্তরা ক্রমান্বয়ে দরিদ্র হচ্ছে। দুর্নীতির মাধ্যমে সিস্টেম করে জনগণের পকেট কেটে কিছু লোক ও প্রতিষ্ঠানকে বড়লোক করা হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ ঘুরে দাঁড়াবেই।
আবু আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ মানুষ এখন আর বিশ্বাস করে না। কাগজে কলমে দেশের বিভিন্ন সূচকের ঊর্ধ্বগতি দেখানো হলেও বাস্তব জীবনে তা দেখা যায় না। জনগণের টাকা কিছু লোকের পকেটে চলে যাচ্ছে। এসব টাকা অবৈধ পথে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।
ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, দেশে উন্নয়নের প্রচারণা চলছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কতটুকু উন্নয়ন হয়েছে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। দেশে যে জিডিপি আছে তা মিয়ানমার, পাকিস্তানের চেয়েও কম। তিনি বলেন, জনগণকে বাইরে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশে সুশাসনের অভাব রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আইনের শাসন নেই, সর্বত্র দুর্নীতি আর দুর্নীতি। মানুষ কথা বলতে ভয় পায়। প্রশাসন এখন রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না।
ড. রাশেদ তিতুমীর বলেন, দেশে যে উন্নয়নের প্রচার করা হচ্ছে তা টেকসই নয়। আমরা ভাঙ্গা সেতুর উপর দাঁড়িয়ে আছি। এ সেতু যেকোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে।
ড. ম. ইনামুল হক বলেন, উন্নয়ন নিয়ে অনেক ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছে। কিন্তু দূষণ নিয়ে কোন কথা নেই। বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়ছে। মানুষের ঘাড়ে ঋণের বোঝা বাড়ছে। ব্যাংকে লুটপাট চলছে। কোথাও সুশাসন নেই। তিনি বলেন, যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য এত আন্দোলন এক মুহূর্তে তা উড়িয়ে দেয়া হলো। জনগণের মত না নিয়ে বাদ দিয়ে দেয়া হল। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যে ক্ষমতা পায় তিনি আর ছাড়েন না। আসলে তিনি নিজেই ক্ষমতা ছাড়তে চাচ্ছেন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ