ঢাকা, সোমবার 10 September 2018, ২৬ ভাদ্র ১৪২৫, ২৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে লক্ষাধিক মামলা

স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপি নেতাকর্মীরা লক্ষাধিক মামলায় জর্জরিত দাবি করে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন, বিভিন্নভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী দলকে দমনের কৌশল অবলম্বন করেছে সরকার। তিনি বলেন, সরকার পাগলের মতো বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে। এমনকি পবিত্র হজ্ব পালনের জন্য সৌদি আরব থাকাকালীনও কয়েক জনের নামে মামলা দেয়া হচ্ছে। এমন কি মৃত ব্যক্তির নামেও মামলা দিচ্ছে তারা। এটা কোনো ধরনের মামলা? গতকাল রোববার দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
রিজভী বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জীবন নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীসহ দেশবাসী চরম উৎকণ্ঠায় আছেন। বেগম জিয়া এতটাই অসুস্থ যে, তার বাম হাত ও পা প্রায় অবশ হয়ে যাচ্ছে। চলাফেরা দূরের কথা, তিনি উঠে দাঁড়াতেও পারছেন না। সাংবাদিকরা তার এই অবস্থা স্বচক্ষে দেখে সংবাদ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, শনিবার আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ ও কারা কর্তৃপক্ষ একই সুরে বলেছেন বেগম জিয়া ততটা অসুস্থ নন। তারা বলেছেন বেগম জিয়া আগেও যেসব রোগে ভুগতেন এখনও সেসব রোগেই ভুগছেন।
বিএনপির এই সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব বলেন, বেগম জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে হানিফ ও কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নিষ্ঠুর রসিকতা। তাকে পরিকল্পিতভাবে নিঃশেষ করে দিতেই আওয়ামী সরকার চিকিৎসা না দিয়ে অমানবিক পথ বেছে নিয়েছে।
রিজভী বলেন, ব্যক্তিগত চিকিৎসক, মেডিকেল বোর্ডের সদস্য এবং সর্বশেষে আইনজীবীরা বেগম জিয়াকে বাঁচাতে অবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতাল অথবা বেসরকারি কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার জন্য জোর দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এখনও সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
তিনি বলেন, কারাগারে খালেদা জিয়ার কোনো চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। তার জীবন হুমকির মুখে থাকবে, আর দেশবাসী চেয়ে চেয়ে দেখবেন তা হবে না। কাল বিলম্ব না করে তাকে ইউনাইটেড বা অন্য কোনো বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। বেগম জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে টালবাহানার পরিণতি ভাল হবে না।
রিজভী বলেন, অভুক্ত রেখে, বিনা চিকিৎসায় ভোগাতে বেগম জিয়াকে কারাবন্দী রেখেছেন শেখ হাসিনা। কারাবন্দী বেগম জিয়ার ভাগ্য আদালতের ওপর নয়, নির্ভর করে শেখ হাসিনার মর্জির ওপর। বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, বাংলাদেশ নামক ‘পুলিশী রাষ্ট্রটি’ এখন শাসিত হচ্ছে এমন এক ব্যক্তির দ্বারা, যার ক্রোধানলে দেশের গণতন্ত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দেশজুড়ে এখন চলছে গায়েবি মামলার হিড়িক। মৃত ব্যক্তিকেও এখন ককটেল ছুঁড়ে মারতে দেখছে পুলিশ।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গণবিচ্ছিন্ন হতে হতে জনগণের কাছ থেকে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে মন্তব্য করে রিজভী বলেন, সেজন্য একমাত্র পুলিশই আওয়ামী সরকারের ‘লোকাল গার্ডিয়ান’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশের শাসনভার শেখ হাসিনা একচেটিয়াভাবে ধরে রাখার জন্য ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই চালিয়ে এসেছেন মানুষ গুম, নরহত্যা, বিনা বিচারে আটক ও ক্রসফায়ার। শেখ হাসিনা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়েই দেশের নিয়ন্ত্রণ মজবুত রাখতে চাচ্ছেন। দেশজুড়ে চলছে এখন গায়েবী মামলার ছড়াছড়ি। মৃত ব্যক্তিকেও এখন ককটেল ছুঁড়ে মারতে দেখছে পুলিশ। সরকার কী অদ্ভুত বাহিনীতে পরিণত  করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে।
দেশব্যাপী সরকারের তা-বের চিত্র তুলে ধওে রিজভী বলেন, গত ৭ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীতে বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) আলতাফ হোসেন চৌধুরী নিজ বাড়িতে অবস্থান করার সময় যুবলীগ-ছাত্রলীগের ক্যাডার’রা কয়েক দফা তার বাসায় হামলা চালায়। পুলিশের উপস্থিতিতে এই হামলা চালানো হয়। জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের বেশ কয়েখজন নেতাকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এছাড়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান, জেলা যুবদলের সভাপতি মনিরুল ইসলাম লিটন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মশিউর রহমান মিলন, জেলা ছাত্রদল সভাপতি উজ্জলসহ ১৯ জন নেতাকর্মীর নামে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ এবং অজ্ঞাত ৩০ জনকে আসামী করে আরও একটি মামলা দায়ের করেছে। তাছাড়া আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বাড়ীতে মিটিং করার সময় জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কাজী আলমগীরের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ, যুবলীগের ক্যাডার বারবার হামলা চালায়।
এছাড়া গত ৬ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল জেলা যুবদলের আহবায়ক আশরাফ পাহলী’র বাসায় পুলিশ হানা দিয়ে তছনছ করে এবং বাসার সামনে কয়েক রাউন্ড গুলী চালায়। পুলিশ কর্তৃক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কদমতলী থানা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ১৯৬ জন নেতাকর্মীর নামে গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, কদমতলী থানাধীন বিএনপি নেতা মো: মুনসুর আলী গত ২৭ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে মৃত্যবরণ করলেও তাকেও এই মামলায় আসামী করা হয়েছে। এছাড়া এ বছর পবিত্র হজ্ব পালনের জন্য উক্ত থানাধীন বিএনপি নেতা আসলাম মোল্লা, ফারুক হোসেন এবং আব্দুল হাই মক্কা নগরীতে অবস্থান করলেও রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করার অসৎ উদ্দেশ্যে তাদেরকেও এই মামলায় আসামী করা হয়েছে। যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুল আলম নীরবসহ ১২৭ জনের বিরুদ্ধে শনিবার২টি মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। দারুসসালাম থানার যুগ্ম সম্পাদক মোঃ রঞ্জু, রুপনগর থানার সহ-সভাপতি মোঃ হাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন থানায় ১২ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এছাড়া বাড্ডা, দারুসসালাম, মিরপুর, শাহআলী, রুপনগর, পল্লবী, আদাবর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, রামপুরা, শেরে বাংলানগর, ভাটারা, খিলক্ষেত, বনানী, গুলশান, উত্তরখান, দক্ষিণখান, তুরাগ, বিমানবন্দর ও ক্যান্টনমেন্ট থানায় অজ্ঞাত শত শত নেতাকর্মীর নামে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।
রিজভী বলেন, পিরোজপুরে বেশ কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। নারায়ণগঞ্জে অনেক নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেলাধীন রুপগঞ্জ  উপজেলায় মোট মামলা হয়েছে ৩টি, মোট আসামী ২৮০ জন। চাটখিল উপজেলা বিএনপির সহ-তথ্য বিষয়ক সম্পাদক মোঃ শাকিল হোসেনকে গত ১ সেপ্টেম্বর পুলিশ গুলি করে। নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলায় অজ্ঞাত ১৬১ জনের বিরুদ্ধে এবং দূর্গাপুরে ১৪৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ১০ জন নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ঝালকাঠি জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রবিউল হোসেন তুহিন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মো: শফিকুল ইসলাম লিটনসহ অনেককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কুমিল্লা জেলাধীন হোমনা পৌর বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো: শাহ আলম, হোমনা পৌর ৮ নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মো: আব্দুল মতিন, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো: কামরুজ্জামান ও হোমনা উপজেলা যুবদলের সহ-সভাপতি মো: আব্দুর রহিমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বাগেরহাট জেলায় গতকাল ছাত্রদল নেতা আরফিুল ইসলাম অনি, আতিক তালুকদার, মো. মহীউদ্দীন, মো. সোহাগ, মো. বাপ্পি শখে, যুবদল নেতা জসমি সরদার, বিএনপি নেতা আলম মোল্লা, ফরিদ মোল্লা ও শ্রমিক দল নেতা সেলিম ভুইয়াকে আটক করেছে পুলিশ। সখিপুর পৌর  বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি হাজী আবদুল গনি কমিশনার, উপজেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক ভেন্ডার, পৌর যুবদলের সহ-সভাপতি সে›ট্টু খান, সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক নাসির উদ্দিন কমিশনার, সখিপুর কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি একাব্বর হোসেনসহ ১৩ জন গ্রেফতার।
চট্রগ্রাম মহানগর বিএনপির প্রশিক্ষন বিষয়ক সম্পাদক ইয়াকুব চৌধুরী, সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক আবু মুসা, আকবরশাহ থানা বিএনপির সভাপতি আবদুস সাত্তার সেলিম, সহ-সভাপতি শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া গোলাপকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। নাটোর জেলাধীন বড়াইগ্রাম উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল মজিদ সরকার, বড়াইগ্রাম উপজেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক সরকার, বড়াইগ্রাম উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি শামীম হোসেন, সাবেক ছাত্রদল সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুর রহমান সুজন, গোপালপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহীন খান, চাপিলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি নয়ন, বড়াইগ্রাম পৌর যুবদলের নেতা আবদুর রহমান আকাশসহ ৩০/৪০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া অজ্ঞাতনামা প্রায় ৪৫০ জনের নামে মিথ্যা বানোয়াট মামলা দায়ের করেছে এবং বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বাড়ীতে বাড়িতে প্রতিরাতে হামলা চালাচ্ছে। রিজভী দলের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ