ঢাকা, সোমবার 10 September 2018, ২৬ ভাদ্র ১৪২৫, ২৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুরোধ বিএনপির

গতকাল রোববার বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন -সংগ্রাম

# সরকারি হাসপাতালের বাইরে ভর্তি করানোর সুযোগ নেই -আসাদুজ্জমান কামাল
স্টাফ রিপোর্টার: কারাগারে দলের গুরুতর অসুস্থ চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য দ্রুত ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছে বিএনপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সাথে গতকাল রোববার সাক্ষাতের পর  বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের কাছে এই কথা জানান। তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ আছেন। তার স্বাস্থ্যের অবণতি ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে এসেছিলাম। আমরা তাকে অনুরোধ করেছি যে, দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে যেন তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। আমরা ইউনাইটেড হাসপাতাল যেটা তিনি পছন্দ করেন সেই হাসপাতালে নেওয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করেছি। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সরকারি হাসপাতালেই বেগম জিয়াকে চিকিৎসা নিতে হবে।
গতকাল বিকেল ২টা ৫০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত এই সাক্ষাৎ হয়।  সাক্ষাতের এক পর্যায়ে কারা মহাপরিদর্শক মেজর জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করেন। এই সাক্ষাতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ছিলেন। তবে স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বিদেশে, মাহবুবুর রহমান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অসুস্থ থাকায় এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিলম্বে পৌঁছানোর কারণে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে।
সাক্ষাতের বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী) বলেছেন, যারা দায়িত্বে আছেন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও আইজি প্রিজনসহ অন্যান্যদের সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিবেন। তিনি এও বলেছেন যে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যারা আছেন তাদের পরামর্শ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।
কবে নাগাদ ব্যবস্থা নেবেন প্রশ্ন করা হলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে উনি কিছু বলেননি। বলেছেন যে, আজকেই ওই সভাটা করবেন।
গত ৭ সেপ্টেম্বর বিএনপি মহাসচিব সংবাদ সম্মেলনে জানান, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন- তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। তার বাম হাত ও বাম পা প্রায় অবশ হয়ে গেছে। অসহ্য ব্যথা অনুভব করছেন তিনি। একই কথা তিনি গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরিত আদালত কক্ষেও বলেছেন।
খালেদা জিয়ার কোনো চিকিৎসা হচ্ছে না দাবি করে মির্জা ফখরুল আরও বলেছিলেন, আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন তার স্বাস্থ্য নিয়ে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে (খালেদা জিয়া) সাজানো মিথ্যা মামলায় শাস্তি দিয়ে কারাগারে বেআইনিভাবে আটক রেখে হত্যা করার হীনপ্রচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার।
সাংবাদিকদের সাথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কথা বলার সময়ে বিএনপির খন্দকার মোশারররফ, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান ও চেয়ারপার্সনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় আবারও মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হবে। এ বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী জেল কোডের আওতায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে তাদের স্থায়ী কমিটির সাত সদস্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসেছিলেন। তাদের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন, তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে কিছু রিকোয়েস্ট লিখিত আকারে করেছেন।
তিনি বলেন, তারা জানিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ এবং তার অসুস্থতার মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এর আগে যেরকম রিকোয়েস্ট করেছিলেন অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এবার লিখিত দিয়েছেন। আমরা লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে সচিব মহোদয় এবং আইজি প্রিজনকে এখনই দায়িত্ব দিয়েছি। যেসব বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য একটি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল, একইভাবে তাকে যারা চিকিৎসা করতেন এবং আমাদের সরকারি বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা মিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সুপারিশ অনুযায়ী আমাদের নীতিমালার আওতায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করব, যদি প্রয়োজন হয়।
বিএনপি চেয়ারপার্সন আর্থাইটিসে ভুগছেন জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তাকে সেবা করার জন্য একজনকে আমরা কারাগারে অ্যালাউ করেছি। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী যা যা প্রয়োজন আমরা কিন্তু সবই করে যাচ্ছি। কারাগারে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট একদিন পর একদিন থেরাপি দিয়ে যাচ্ছেন। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমাদের ডাক্তাররা তাকে পরীক্ষা করছেন। তিনি আরও বলেন, শুধু তাই নয় একজন ডাক্তার একজন ফার্মাসিস্ট প্রতিদিনই তাকে চেক করছেন। আমাদের আইজি প্রিজন এটা জানিয়েছেন, তাদেরও জানিয়ে দিয়েছেন। জেলকোড অনুযায়ী সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা আমরা তাকে দিচ্ছি। যাতে তার কোনো রকম অসুবিধা না হয়।
তারা (বিএনপি নেতারা) যে কথাটি বলছেন, তারা মনে করছেন বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। সেজন্য তাকে আবারও ইউনাইটেড হাসপাতালের কথা বলছেন, এবার সঙ্গে অ্যাপোলো হাসপাতালের কথাও বলেছেন। তিনি বলেন, আমরা জানিয়ে দিয়েছি আমরা আবার মেডিকেল বোর্ড তৈরি করব। বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেব।
কবে নাগাদ বোর্ড গঠিত হবে- জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সচিব ও আইজি প্রিজনকে বলে দিয়েছি, তারা দুইজন বসে ব্যবস্থা নেবেন, খুব শিগগিরই করব।
সরকারি হাসপাতালের বাইরের নেয়ার সুযোগ আছে কি না- জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান খান বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী তাকে সরকারি হাসাপতালে নেয়া হবে। এটাই আমাদের জেল কোড অনুযায়ী ব্যবস্থা। দেশের বড় বড় হাসপাতালগুলো কিন্তু সরকারি হাসপাতাল। সরকারের সর্বোচ্চ চিকিৎসা কেন্দ্র যেগুলো সেগুলোতেই আমরা নিয়ে যাব। তারপরও যদি প্রয়োজন হয়, চিকিৎসকরা কিছু বলে, আমরা কী করতে পারি সেটা নিয়ে মিটিং করব। ডাক্তাররা বলুক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা আমাদের বড় বড় হাসপাতালে এ ধরনের ফ্যাসিলিটিস নেই। তাহলে সেটার প্রশ্ন আসে।
বিএনপির পক্ষ থেকে বেগম জিয়ার যতটুকু অসুস্থতার কথা বলা হচ্ছে, আপনারা ততটুকু অসুস্থ বলে মনে করছেন কি না- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, তিনি কিন্তু আগে থেকেই আর্থাইটিসসহ অন্যান্য রোগে ভুগছিলেন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা তো হচ্ছে। আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই, কারা কর্তৃপক্ষ তার স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর রেখেছেন। এরপর তারা যে কথা বলছেন সেই রকম পরিস্থিতি হয়েছে কি-না সেটা ডাক্তাররা পরীক্ষা করে দেখবেন।
কারা চিকিৎসকরা এই ধরনের অসুস্থতার কথা বলেছে কি না- জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের কাছে তো এই ধরনের রিপোর্ট নেই। এখন বোর্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যেটা বলবেন সেটাই হবে। একজন মানুষ কোন স্থানে চিকিৎসা নিতে কমফোর্ট ফিল করতে পারে, সেই সুযোগ আছে কি না- জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জেলখানার কোড অনুযায়ী এই ধরনের বিবেচনার কোনো স্কোপ নেই। এখন তারা যেটা বলেছেন, রোগীটা কতখানি সিরিয়াস সেটা আমরা পরীক্ষা করে বসে সিদ্ধান্ত নেব।
অন্য কোনো বিষয় নিয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে কি না- এ বিষয়ে আসাদুজ্জামান খান বলেন, অন্য কোনো বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে আজকে কথা হয়নি।
কথিত জিয়া এতিমখানা দুর্নীতির মামলায় ৫ বছরের দণ্ড নিয়ে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন সড়কের পরিত্যক্ত পুরনো কারাগারে বন্দী আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর এই মাসের শুরুতে তার চিকিৎসায় একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। তার অসুস্থতা গুরুতর নয় বলে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর বোর্ড জানিয়েছেন। মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকদের পরামর্শে তার এক্সরে পরীক্ষা করতে গত ৭ এপ্রিল খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে আনা হয়েছিলো। তবে সরকারের গঠিত এই মেডিকেল বোর্ড নিয়ে বিএনপির অনাস্থা রয়েছে। গত ২৭ মার্চ ও ২২ এপ্রিল দুই দফায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ, আলতাফ হোসেন চৌধুরীর প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ