ঢাকা, সোমবার 10 September 2018, ২৬ ভাদ্র ১৪২৫, ২৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দূষণ ও যানজট

-অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার এবং মোঃ তৌফিক-ই-এলাহী হোসেন
কথায় আছে যান্ত্রিক নগরী ঢাকা শহর। কর্মঘন্টায় যাওয়ার জন্য প্রায় দুই কোটির কাছাকাছি মানুষ প্রতিদিন রাজপথে চলাচল করে। তবে ঢাকায় এখনো কোনো সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় এই ঘনবসতিপূর্ণ শহরের বাসিন্দাদের প্রতিদিন সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) এর তথ্য অনুসারে, বর্তমানে সারা দেশে যানবাহন আছে ৩৫ লাখ ৪২ হাজার যন্ত্র চালিত যানবাহন আছে। গাড়ির থেকে নিঃসৃত গ্যাস পরিবেশ এর অনেকটা ক্ষতি করছে যা বায়ুম-ল দূষিত হবার প্রধান কারণ। বায়ু দূষণের ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, এর ফলে বায়ুম-লে ওজন স্তর পাতলা হয়ে যায় এবং পরিবেশের উপর অনেক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞানীরা বায়ুতে ক্ষতিকারক পদার্থের সংকেত পরিমাপের জন্য অনেক অত্যাধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করছে, কিন্তু যানবাহন থেকে কতটা বায়ু দূষণ হয়ে আসছে তা ঠিক বোঝে উঠা কঠিন।
কারণ দিন দিন যানবাহনের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। যানবাহন থেকে নিঃসৃত গ্যাস যে ভাবে বায়ুম-ল দূষিত করে তা হল :-
কার্বন মনোক্সাইড : এই সকল গ্যাস প্রধানত যানবাহন থেকে নির্গত হয় যা গন্ধহীন, বর্ণহীন, এবং বিষাক্ত গ্যাস গ্যাসোলিন মত জীবাশ্ম জ্বালানি জ্বলন দ্বারা গঠিত হয়। যখন শ্বাস ফেলা হয়, তখন মস্তিষ্ক, হৃদয় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলি থেকে অক্সিজেন রোধ করে। নবজাত শিশুদের, এবং দীর্ঘ দিন থেকে অসুস্থ মানুষকে বেশ ক্ষতি করে।
সালফার ডাইঅক্সাইড : ডিজেল জ্বালানি দ্বারা চলমান যানবাহনের কারণে গ্যাসটি তৈরি হয়। সালফার ডাই অক্সাইড বায়ুম-লে সূক্ষ্ম কণা তৈরি করতে সাহায্য করে। এই গ্যাস এসিড বৃষ্টির একটি প্রধান কারণ। সালফার-ডাই-অক্সাইডের প্রভাবে ফুসফুসের নানা ধরনের জটিল রোগ হয়।
লেড বা সিসা : এই পদার্থটি লেড ব্যাটারি, পেট্রোল, ডিজেল, হেয়ারডাই, রঙ প্রভৃতি পণ্যে পাওয়া যায়। সিসা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুদের ক্ষতি করে থাকে। এটির প্রভাবে হজমের প্রক্রিয়া ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হয়। কয়েকটি ক্ষেত্রে ক্যানসারও হতে পারে।
ওজন : ওজন বায়ুম-লের উচ্চস্তরে পাওয়া যায়। এই গ্যাস সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির বিকিরণ থেকে পৃথিবীকে বাঁচায়। কিন্তু মাটির কাছাকাছি এই গ্যাস অত্যন্ত বিষাক্ত ধরনের। মাটির কাছাকাছি যে ওজন পাওয়া যায় তা মূলত কলকারখানা এবং যানবাহন থেকে নির্গত হয়। ওজোনের প্রভাবে চুলকানি হয় এবং জ্বালাতন করতে পারে। ওজোনের প্রভাবে ঠাণ্ডা লাগার প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে নিউমোনিয়া হতে পারে।
নাইট্রোজেন অক্সাইড : এই গ্যাসের প্রভাবে ধোঁয়াশা তৈরি হয় এবং এসিড বৃষ্টি হয়। পেট্রোল, ডিজেল, কয়লার মতো জ্বালানি পোড়ানোর ফলে গ্যাস নির্গত হয়। নাইট্রোজেন অক্সাইডের প্রভাবে বাচ্চাদের শীতের সময় সর্দিকাশি হতে পারে।
মানব স্বাস্থ্যের উপর যানবাহন থেকে নিঃসৃত গ্যাস ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে প্রতিনিয়ত। শুষ্ক মৌসুমে বায়ু দূষণ এর প্রভাবটা অনেকাংশে বেশী। বাতাসে থাকা যানবাহন থেকে নির্গত কার্বনসহ বিভিন্ন গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে গেলে বায়ু দূষণ হয়। বায়ুতে ১৫০ পর্যন্ত ইয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স থাকলে তা স্বাস্থ্যকর বায়ু হিসেবে ধরা হয়। আর ২৫০ পর্যন্ত ক্ষতিকর ও এর উপরে গেলে তা অস্বাস্থ্যকর। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা শহরে এর মাত্রা ৩০০ এরও বেশী। পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণায় উঠে এসেছে, বায়ু দূষণের জন্য ইটের ভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া ও কলকারখানা দায়ী।
তবে বায়ুদূষণ রোধে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়: (১) দুই স্ট্রোক ইঞ্জিনে ব্যবহারের জন্য লুব্রিকেটিং অয়েলের ন্যূনতম মান হতে হবে APITC অথবা JASOEB এবং (২) অপরিশোধিত খনিজ তেলের বিপণন যত দ্রুত সম্ভব বন্ধ করা হবে।
বায়ুদূষণের কারণে বেশীর ভাগ ক্ষতির শিকার হয় শিশুরা। শিশুদের মানসিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে বায়ুতে থাকা অতিরিক্ত সীসা। ঢাকার মধ্যে প্রতি বছর প্রাই ৫০ টন সীসা নির্গত হচ্ছে বায়ুতে। বায়ুতে সীসার পরিমাণ সব থেকে বেশী পাওয়া যায় শুষ্ক মৌসুমে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে (Child Development Centre) সম্প্রতি শিশুদের দেহে সীসা দ্বারা দূষণের ঘটনা শনাক্ত করেছেন। পরীক্ষাকৃত শিশুদের রক্তে প্রায় ৮০ মাইক্রোগ্রাম/ ডি.এল থেকে ১৮০ মাইক্রোগ্রাম/ ডি.এল সীসা পাওয়া গিয়েছে যা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে ৭ থেকে ১৬ গুণ বেশি। গ্রামীণ এলাকার তুলনায় শহর এলাকার মানুষের রক্তে সীসার পরিমাণ অনেক দেখা গেছে। ইউ.এস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন-এর নির্দেশনা অনুযায়ী রক্তে ১০ মাইক্রোগ্রাম/ডি.এল পরিমাণ পর্যন্ত সীসার উপস্থিতি নিরাপদ।
কিন্তু ঢাকা শহরে মানুষের রক্তে এর পরিমাণ অনেক বেশী। সীসা দূষণ মানবদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করা ছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করে। শিশুদের রক্তে অতিরিক্ত সীসার উপস্থিতি তাদের মস্তিষ্ককে নষ্ট করে ফেলতে পারে। পূর্ণ বয়ষ্ক মানুষের তুলনায় শিশুরা সীসা দূষণে তিনগুণ বেশি আক্রান্ত হয়। যানবাহন বন্ধ করা সম্ভব না কিন্তু এর নিয়ন্ত্রণ দরকার যাতে করে এই সকল রোগ ব্যাধি থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা যায়।
লেখকদ্বয় : যথাক্রমে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতায় ও গবেষণায় সংযুক্ত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ