ঢাকা, সোমবার 10 September 2018, ২৬ ভাদ্র ১৪২৫, ২৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কৃষি ও কৃষক

মাহমুদুল হক আনসারী : বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এ দেশের ৮৬% জনগণ এখনো কৃষি নির্ভরশীল। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো নিয়মিত কৃষি জমিতে ফসল ফলাদি চাষ হচ্ছে। বলতে গেলে বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো জমি ভিটা টিলা ভূমি অকৃষি ভাবে পতিত দেখা যায় না। শহর গ্রামে বাসা বাড়ি ও বাড়ির ছাদের উপর এখন কৃষি শস্য ফলাদি নানা জাতের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন আমাদের কৃষকরা নানা জাতের ফসল ফলাতে দেখা যাচ্ছে। বিদেশি উন্নত জাতের ফসলাদি বাংলাদেশের উর্বর মাটিতে উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার কৃষি উৎপাদন কৃষক স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন সেক্টর খুলে রেখেছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, কৃষি ব্যাংক, কৃষি বিপণন কেন্দ্র, কৃষি বীজ উপাদন ও বিপণন কেন্দ্র কৃষকদের নানামুখী সেবা দেয়া অব্যাহত রেখেছে। গবাদি পশু মৎস চাষ শস্য ফলন ও বাজারজাত করণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ব্যাপকভাবে কৃষকদের নিয়ে কাজ করছে।প্রতিদিন নানা প্রকারের অনুষ্ঠান সাজিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ রেডিও এবং হাজার হাজার দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন মিড়িয়া কৃষির উপর তথ্য উপাত্ত দিয়ে নিবন্ধ প্রবন্ধ প্রচার করে আসছে। বৈষয়িক জলবায়ুর পরিবর্তনে প্রতিবছর বাংলাদেশের ৬টি ঋতু এখন পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে পদে পদে কৃষক ভাইরা কৃষি কাজে মাইর খাচ্ছে। ঝড় তুফান বন্যা, সাইক্লোন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি জমি ও ফসল। উত্তরাঞ্চলের অর্ধেক জেলায় অর্ধ বছর পানির নিচে থাকে। তাদের জীবন চলা কৃষি পণ্য ঘরে তোলা উৎপাদন নানাভাবে ব্যাহত হয়। অনেকের ঘরে চুলা জ্বলে না। খোলা আকাশের নিচে অনেক কৃষককে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। ওইসব এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ জনপদের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়। ফসলের সাথে রাস্তা ঘাটের ধ্বংস স্তুপের মধ্যে চলতে হয় গ্রামের কৃষক জনগণের। মাসের পর মাস রাস্তাগুলো ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন অথবা রাষ্ট্রের কোনো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ থাকে না। সংস্কারের অভাবে গ্রামের এসব রাস্তা যান ও জন চলাচলের সম্পূর্ণ অযোগ্য। কৃষকের স্বার্থে এসব জনপদের জরুরী সংস্কার ও কাজ হওয়া দরকার। জমি থেকে পানে নেমে যাওয়ার পরে কৃষকগণ কৃষি কাজে যথা সময়ে সরকারি সংস্থাসমূহের সাহায্য পায় না। ফলে অনেক কৃষককে উচ্চমূল্যে জমি ও গবাদি পশু অলঙ্কারাদি বন্ধক দিয়ে সুদি মহাজন থেকে টাকা ধার নিতে হয়। উচ্চমূল্যে ঋণ নিয়ে কৃষি পণ্য উৎপাদন করতে গিয়ে ঝড় তুফান বন্যার সম্মুখীন হতে হয় কৃষকদের। কৃষক বাচঁলে জনগণ বাঁচবে, দেশ বাঁচবে, বাচঁবে সরকার। এ মন্ত্রে যদি রাষ্ট্রের বিশ্বাস থাকে, তাহলে অবশ্যই কৃষকদের সারিবক উপকারে সমাজ ওরাষ্ট্রকে এগিয়ে আসা দরকার। কৃষি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ করতে না পারার কারণে বাংলাদেশের অনেক হেক্টর জমি টিলা ভূমি পুকুর জলাভূমি কৃষি উৎপাদন থেকে বিরত থাকে। এসব উৎপাদনহীন জমি টিলা জলাশয় চিহ্নিত করে উৎপাদনের আওতায় আনতে হবে। প্রতিবছর নগর উন্নয়ন রাস্তা ঘাটের চাহিদা পূরণে ঘর বাড়ির প্রয়োজনে জমির পরিমাণ কমে আসছে। যত্রতত্র ঘর বাড়ি নির্মাণ জমির অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। জমির সৎ ব্যবহার ঠিক মতো কৃষি কাজে বাংলাদেশের জমি ব্যবহার হলে অব্যাহতভাবে খাদ্যের চাহিদার এতো সংকট হবে না। বাংলাদেশের জমি মাটি টিলা পাহাড়ভূমি প্রতিবছর ছোট হয়ে আসছে। একদিকে নদী খাল বিল বরাট হচ্ছে, অন্যদিকে পাহাড় পর্বত ধ্বংস হচ্ছে। অপরিকল্পিত পাহাড় ব্যবহারের কারণে পাহাড়ের যেমনিভাবে ক্ষতি হচ্ছে, একইভাবে পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে। বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১২ লক্ষ উদ্বাস্ত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে কক্সবাজার টেকনাফ এলাকার জমি পাহাড় পর্বত শস্য শ্যামল পরিবেশ ধ্বংসের পথে। তাদেরকে পুনর;বাসন করতে গিয়ে সেখানকার কৃষি জমি ও কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা এখন সময়মতো কাজ পাচ্ছে না। বেকার ও অলস জীবন যাপন করছে। চরম অর্থ সংকটে আছে। লাখ লাখ কৃষক ওই এলাকায় কর্মহীন হয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গাদের সুবিধা অসুবিধার চিন্তা রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক মহল করলেও বাংলাদেশের নাগরিক ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা কৃষকদের সুখে দুখে তেমন কোনো পরিকল্পনা নজরে পড়ছে না। এমনিতে দেশের বর্ডারের ওই অঞ্চল মাদক পাচারের ঘাঁটি। লাখ লাখ পিস অবৈধ মাদক দ্রব্য ওই অঞ্চলে ধরা পড়ে। কৃষক ও কৃষি প্রধান উল্লেখযোগ্য ওই অঞ্চলে কর্ম না থাকায় কৃষকদের জীবন জীবিকা পরিচালনা করতে মারাত্মকভাবে তাদের ভোগান্তি হচ্ছে। এসব বিষয় চিন্তা করে রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের ওই ধরনের এলাকার কৃষকদের পাশে দুর্যোগ মূহুর্তে এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় কৃষি উৎপাদন থেকে কৃষকগণ হাত গুটিয়ে নিবে। নানা অজুহাতে অনেক কৃষক জমিতে চাষ করতে চায় না। সারের কথা, কীটনাশক, দিনমজুর শ্রমিকের মজুরীর কথা চিন্তা করে অনেকেই জমি খালি ফেলে রাখে। এটা জমির মালিক কৃষক দেশের জন্য অবশ্যই ক্ষতির দিক।জনসংথ্যার অব্যাহত চাপ উদ্বাস্ত রোহিঙ্গা সমস্যা বন্যা ও সাইক্লোনের কারণে প্রতিবছর মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার পরিবর্তে খাদ্য সামগ্রী আমদানী করতে হয়। না হলে খাদ্যের চাহিদা জনগণের মাঝে পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। জনগণের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে অব্যাহতভাবে বৈদেশিক মুদ্রার পরিবর্তে খাদ্য আমদানী করতে হয়।
 আমদানীতে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যায় করা হয় তার কিঞ্চিৎ পরিমাণ অর্থ দেশের কৃষক ও কৃষি কাজে ব্যায় হলে এদেশের কৃষকদের মাঝে নতুন বিপ্লবের সূচনা হবে।সরকারকে কৃষি অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশের উল্লেথযোগ্য কৃষি এলাকায় কৃষকদের কল্যাণে আরো কর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের সুখে দুখে সরকারি বেসরকারি অর্থ লগ্নি প্রতিষ্টানকে এগিয়ে যেতে হবে। তাদের চিকিৎসা শিক্ষা দীক্ষা গ্রামের অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানকে এগিযৈ যেতে হবে। শহরকে য়েভাবে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকে, অনূরূপ ভাবে গ্রামের কৃষক কৃষি উৎপাদন বিপণন এবং তাদের স্বার্থ রক্ষায় সমন্বিত কর্মসূচী বাস্তবায়ন থাকতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশের কৃষি কৃষক বাচঁবে। তারা বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাদের মুখে হাসি বাংলাদেশের হাসি। তাদের ব্যাথা আর বেদনার সঙ্গি হতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে। সহজ সরল দিনমজুর দুখি এসব মানুষের সুখ দুখের কথা সমাজ রাষ্ট্র যেনো ভুলে না যায়। তাদের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী যথাসময়ে বাজারজাত করার সঠিক ব্যবস্থা থাকা চায়। ন্যায্যমূল্য অর্থ তাদের পাওয়া চায়। এসব সবকিছু ঠিক থাকলে কৃষক বাঁচবে। দেশ বাঁচবে। তাদের মুখে হাসি থাকবে। রাষ্ট্র সচল থাকবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ