ঢাকা, মঙ্গলবার 11 September 2018, ২৭ ভাদ্র ১৪২৫, ৩০ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সংঘাত-সংঘর্ষ ধ্বংসযজ্ঞ নয় নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন

একাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য দেশের বিরোধী দলগুলো ন্যূনতম দাবিতে ঐকমত্য প্রকাশ করেছে। দাবিগুলো হচ্ছে: তফসিল ঘোষণার আগে সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা, এই দাবিগুলোর পাশাপাশি বিএনপি বেগম খালেদা জিয়া এবং রাজবন্দীদের মুক্তিকেও নির্বাচনে যাবার অন্যতম শর্ত হিসেবে ঘোষণা করেছে। তারা বলেছে যে, বেগম জিয়াকে মুক্তি দেয়া না হলে কোনও নির্বাচন হবে না।
এদিকে গত ২ সেপ্টেম্বর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপি বা বিরোধী দলের সাথে আলোচনার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন যে, আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি বলেছেন, নির্বাচন হবেই, কেউ বানচাল করতে পারবে না। এটা ঠেকানোর কারো কোনও শক্তি নেই। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনতেও যাব না বাধাও দেব না। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তি আদালতের বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী  আরও বলেছেন যে, তার দ্রুত মুক্তি চাইলে বিএনপি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করতে পারে। অথবা আন্দোলনও করতে পারে। তাছাড়া আগামী নির্বাচনে সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহারের অনুকূলে তিনি মতামত দেন।
সংলাপ বা আলাপ-আলোচনা প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রত্যাশা ও দাবি-দাওয়া শেষ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে খুব দৃঢ় বলে মনে হয়েছে। আবার তার দল ও সরকারের মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে অনুশীলন ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে বলেও মনে হয়। এই অবস্থায় বয়োজ্যেষ্ঠ অর্থমন্ত্রী আবদুল মাল আবুল মুহিত নতুন খবর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগামী ২০ দিনের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে এবং ২৭শে ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। তিনি আরও বলেছেন যে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলতে কিছু নেই, হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকারে বিএনপি বা সুশিল সমাজের প্রতিনিধি থাকার কোনো সুযোগ নেই । অবশ্য আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কয়েকজন সরকারি নেতা অর্থমন্ত্রীর ঘোষণায় কিছুটা অপ্রস্তুত হয়েছেন বলেও মনে হয়। তারা বলেছেন, অর্থমন্ত্রী জনাব মুহিদ নির্বাচনের তারিখ বলার কেউ না, নির্বাচন কত তারিখে হবে নির্বাচন কমিশনই তা বলবেন। ঘটনা যাই হোক, বিষয়টি যারা বুঝার তারা ঠিক বুঝেছেন। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন নয়, সরকারের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ীই নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তারিখ ও নির্বাচনী সিডিউল প্রভৃতি ঘোষণা করে থাকেন। বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন অবশ্যই স্বাধীন নয়, সরকারের বশংবদ।
এদিকে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই মাসের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ। এর অংশ হিসেবে চলতি সেপ্টেম্বর ও আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যে তারা সাতটি এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই এজেন্ডাগুলোর মধ্যে রয়েছে সারা দেশে ভোট কেন্দ্র ভিত্তিক ১২ লাখ পোলিং এজেন্ট নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ কাজ সম্পন্ন করা, তফসিল ঘোষণার আগেই দলের একক প্রার্থীদের সবুজ সংকেত দিয়ে মাঠে নামানো, চমক রেখে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন, দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল মিটানো, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের সম্ভাব্য আন্দোলন কিংবা ষড়যন্ত্র মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণ, সরকারের ব্যাপক উন্নয়নে’র তথ্য সম্বলিত চিত্র এবং বিএনপি জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানোর ডকুমেন্ট তৈরি করে নির্বাচনী প্রচারণা জোরেশোরে শুরু এবং নির্বাচনী জোটের আসন ভাগাভাগি করা। জানা গেছে, নির্বাচনে হ্যাটট্রিক জয়ের লক্ষ্যে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে দলটি সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। তফসিল ঘোষণার আগেই তারা নির্বাচনী কাজ গুছিয়ে রাখতে চায়।
সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত আরেকটি রিপোর্টে জানা গেছে যে, শাসকদল আওয়ামী লীগ সরকারিভাবে গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে ৩০০ আসনের একটি জরিপ করিয়েছেন। এই রিপোর্টের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী ৫০ আসনে বিশেষ জরিপ করিয়েছেন। এতে প্রতি আসনের জন্য ছয় লাখ টাকা অর্থাৎ সর্বমোট ৩ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এই জরিপের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান নির্ণয় করে সামনে অগ্রসর হতে চান। অর্থাৎ আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসার জন্য তারা ইতোমধ্যে আকাশ-পাতাল দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। ট্রেনে তারা নির্বাচনী অভিযানও শুরু করেছেন। দলের শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী-এমপিরা বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে গিয়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন। কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ লাখ লোক মারা যাবে। আবার কোন কোন শীর্ষ নেতা বলছেন যে, এক রাতেই এক লাখ লোক নিহত হবে। অবশ্য তাদের আশঙ্কা অনুযায়ী সম্ভাব্য নিহত ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগার হবে না বিএনপি-জামায়াতের, সে সম্পর্কে তারা কিছু বলছেন না। আবার ঘাতকরা কি বাংলাদেশী হবে না পড়শি কোন দেশ থেকে তাদের আনা হবে এ বিষয়টিও পরিষ্কার নয়। ফলে মানুষের মনে সাতক্ষীরা ধরনের একটি গণহত্যার কথাও উঠে আসা অস্বাভাবিক নয়। এটা অনেকটা আতঙ্ক ছড়িয়ে বিরোধীদলকে নিস্ক্রিয় করার একটি কৌশল যেমন হতে পারে তেমনি আসন্ন বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের উস্কিয়ে দেয়ার কৌশলও হতে পারে। এক্ষেত্রে আভাষ হচ্ছে, গৃহযুদ্ধের, যা অবাঞ্ছনীয় ও উদ্বেগের বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম অবশ্য ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না গেলে দলটি বিপন্ন হবে। দলটিকে বিপন্ন হবার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বলে মনে হয়। তারা নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী কর্মযজ্ঞ শুরু করার আগেই সারাদেশে সরকারি অর্থে ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করেছেন। আবার বিরোধী দলগুলো যাতে নির্বাচন প্রচার চালাতে না পারে এবং সভা-সমিতি করে জনগণের সামনে দেশ ও সরকারের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে না পারে তার জন্য দমননীতিও তারা অব্যাহত রেখেছেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠ পত্রিকায় নির্বাচনকে ঘিরে সরকারি নির্দেশে পুলিশের বিশেষ একটি পরিকল্পনার কথা প্রকাশিত হয়েছে। এই পরিকল্পনার অধীনে বিএনপি জামায়াতের মাঠ পর্যায়ের নেতাদের তালিকা হালনাগাদ করণ, গত ১০ বছরের মামলাগুলোকে সচল করা, নির্বাচনকে ঘিরে যে কোন আন্দোলন প্রতিহত করা এবং আন্দোলনের আগেই ধরপাকড় শুরু করার বিষয়টি অন্তর্র্ভুক্ত রয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি নির্বাচিত এলাকাসমূহে যৌথভাবে অভিযানে নামবে।
রিপোর্টে ‘নামবে’ কথাটা বলা হলেও ইতোমধ্যে তারা নেমে গেছেন বলে জানা গেছে। এমন দিন নেই যে দিন জামায়াত-বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না। অনেক জেলা-উপজেলায় তারা বাড়িতে থাকতে পারেন না। আবার নিরাপদ সড়ক ও কোটা আন্দোলনের সাথে যেসব ছাত্রছাত্রী জড়িত ছিল তাদেরও গ্রেফতার করা শুরু হয়েছে। কাউকে কাউকে বিনা ওয়ারেন্টে সিভিল ড্রেসে বাড়ি থেকে তুলেও নেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। এ অবস্থায় নির্বাচন নিয়ে লিখতে বসে শিউরে উঠছি। দেশব্যাপী সরকারি দলের নির্বাচনী প্রচারণা ও দাপট, বিরোধীদলকে অবরুদ্ধ রাখা এবং তাদের বিরুদ্ধে হামলা মামলা, গ্রেফতার ও গুম নামক অস্ত্রের ব্যবহার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিরোধীদল দমনে রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ এবং বিরোধী জোট নির্বাচনে না এলেও একাদশ সংসদের নির্র্বাচন আটকে থাকবে ুনা বলে ক্ষমতাসীনদের হুমকি এবং মনোভাবে সংঘাতের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। এই সংঘাত আমাদের জাতীয় জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। গতকাল জনকণ্ঠ পত্রিকা দেশে বর্তমানে চারলাখ অবৈধ অস্ত্র রয়েছে বলে তাদের এক রিপোর্টে তথ্য প্রকাশ করেছে এবং বলেছে যে, নির্বাচন উপলক্ষে সীমান্ত পথে আরো অস্ত্র আসতে পারে। অস্ত্রের সাথে যে সন্ত্রাসী আসবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? এই অবৈধ অস্ত্র এবং সন্ত্রাসীদের বিরোধী দল নয় সরকারি দলের পৃষ্ঠপোষকতা পাবার সম্ভাবনা বেশি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। যদি তাই হয় তাহলে দেশে কি যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে তা  ভাবা যায় না।
বাংলাদেশের নাগরিকদের চাহিদা অত্যন্ত কম। তারা সরকারের মেয়াদান্তে নতুন সরকার গঠনে নির্বিঘেœ এবং স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান। গত ১০ বছরে তারা তাদের এই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনকে সুষ্ঠু নির্বাচন বলা যায় না। এই সময়ে নির্বাচন কমিশন তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে গিয়ে বৃহত্তম জনপ্রিয় দল বিএনপিকে ভেঙ্গে দেয়ার অপচেষ্টা চালায়। তারা দলটির অফিস তালাবদ্ধ করে রাখে এবং পরে ব্যর্থ হয়ে নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে তালা খুলে দেয়। বৈদেশিক হস্তক্ষেপ বিশেষ করে ভারতীয় কূটচালে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বৃটেনের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক দ্যা ইকনমিস্টের ভাষায়, “বস্তায় বস্তায় ভারতীয় অর্থ, ভারতীয় উপদেশ এবং সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতায় নির্বাচনে জয় লাভ করে।” নির্বাচনের ফলাফলে মানুষ হতভম্ব হয়ে পড়ে। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোন সংলাপের ট্রান্সক্রিপ্ট পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে উঠে।  সেখানে কোন কোন বিষয়ে শেখ হাসিনার একগুয়েমী মনোভাবে বিরক্ত হয়ে হিলারী ক্লিন্টন বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে ‘ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী আমি ভেবেছিলাম আমাকে এতদূর যেতে হবে না। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, আমি ভুল ভেবেছিলাম। আপনি জানেন এবং আমরাও জানি কিভাবে আপনার সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ভুলে যাবেন না নির্বাচনের পর আমরা বলেছিলাম সেটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এবং আপনাকে সাহায্য করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী আপনি জানেন, দিল্লীতে আমাদের বন্ধুদের নির্দেশে কিভাবে ফলাফল আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তারা যেভাবে চেয়েছিল সেভাবেই আমরা বলেছিলাম। প্লিজ আপনি এটা ভুলে যাবেন না যে জেনারেল মঈন যিনি আপনাকে ক্ষমতায় এনেছিলেন তিনি এখন আমেরিকাতে আছেন এবং আপনি যতখানি কল্পনা করতে পারেন তার চেয়েও বেশি আমরা জানি।” জনপ্রিয় ভোটে আওয়ামী লীগের এই সরকার নির্বাচিত ছিল না, এটা ভারত কর্তৃক এদেশের উপর চাপিয়ে দেয়া একটি সরকার ছিল। এই সরকার ক্ষমতায় গিয়ে তাদের ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক করার জন্য বিরোধী দল দমন বিশেষ করে জামায়াতের কণ্ঠ রোধ, রেজিস্ট্রেশন বাতিল, শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে মিথ্যা ও বানানো অভিযোগে ফাঁসি প্রদান ও দেশব্যাপী লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার ও অফিসে তালা দেয়া ছাড়াও বহু ত্যাগ, জীবন ও সম্পদের বিনিময়ে অর্জিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধান থেকে তুলে দিয়ে এক নৈরাজ্যকর অবস্থার সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, চাদাবাজি দুর্নীতি ক্ষমতার অপব্যবহার তাদের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। দেখতে দেখতে ২০১৪ সালের নির্বাচন ঘনিয়ে আসে এবং দেশবাসী তাদের মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধার এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি তোলে। বিএনপি জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলো দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে সংকটেনর সুরাহার দাবি তোলে। সরকার সংলাপের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। আন্তর্জাতিক মহলের তরফ থেকেও রাজনৈতিক মীমাংসার অনুরোধ আসে, এক পর্যায়ে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ দূত হিসেবে ঐ সংস্থারই রাজনীতি বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ৬ দিনের মিশনে ২০১৩ সালের পাঁচ ডিসেম্বর ঢাকায় আসেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংলাপে রাজী করাতে পারেন নি, প্রধানমন্ত্রী তার দলের অধীনে ছাড়া নির্দলীয় কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাজী হননি। ফলে আন্দোলন হয়েছে এবং তা দমন কতে গিয়ে রক্তে ভেসেছে দেশ। ছয় শতাধিক লোক পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলা থেকে নারী, শিশু এবং বৃদ্ধরাও রক্ষা পায়নি। আওয়ামী লীগ ও তার জোটের জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং ইনুর জাসদ ছাড়া আর কোনও দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট নির্বাচন বয়কট করে। সরকার তার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনঢ় থাকে এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও বিনা ভোটে ১৫৪ জন সরকারি প্রার্থী পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়। ১৪৬ টি আসনে নামকা ওয়াস্তে নির্বাচন হয় এবং এতে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৪.৫% থেকে ১০%। বিনাভোট ও প্রসহনের মাধ্যমে নির্বাচিত এই পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিয়ে নতুন নির্বাচন দেয়ার কথা থাকলেও জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন এই সরকার অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করে এখন একাদশ সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চাচ্ছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি-জামায়াতের অফিস সরকার বন্ধ করে দিয়েছিলেন। দল দু’টির শীর্ষ এবং মধ্যম সোপানের এমন কোন নেতানেত্রী ছিলেন না যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। পুলিশ কর্তৃক গুলী করে মানুষ হত্যার বিষয়টি বিবেক বিক্রি করা মিডিয়ায় তখন প্রাধান্য পায়নি, পেয়েছে আগুনে পুড়ে মানুষ মরেছে বা আহত হয়েছে এই খবরটি। যারা যানবাহন, দোকানপাট বা কল-কারখানায় আগুন লাগিয়েছে তারা ধরা পড়েনি, পড়লেও পুলিশ রহস্যজনকভাবে তাদের ছেড়ে দিয়েছে। ঐ সময় পত্র-পত্রিকায় এই মর্মে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ যুবলীগ ছাত্রলীগের এক হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে নাশকতা সৃষ্টির জন্য মাঠে নামিয়েছে। তারা বিরোধীুদলীয় বিক্ষোভকারীদের সাথে মিশে গিয়ে নাশকতামূলক কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হত্যা, গুম, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর লুটপাট অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। সরকার এই নিন্দনীয় কাজকে উৎসাহিত করেছেন এবং তার দায় বিরোধী দলের ওপর চাপিয়েছেন। ঐ সময়ে মই বেয়ে, গ্রীল কেটে, দরজা ভেঙ্গে অফিস তছনছ ও লুটপাট করে বিএনপি নেতা রিজভি আহমেদকে যেভাবে পুলিশ দলটির অফিস থেকে গ্রেফতার করেছিল তার নজির ইতিহাসে নেই। এটা দেখে দেশের মানুষ নাশকতার সরকারির ভার্ষণ বিশ্বাস করতে পারেনি।
ঐ সরকার এখনো আছে এবং আরেক মেয়াদে ক্ষশতায় আসার জন্য তাদের নিজেদের অধীনে নিজেদের ছক অনুযায়ী নির্বাচন করতে চায়। ১০ বছর তারা ক্ষমতায় ছিলেন। এ ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং তা বর্জন ও প্রতিরোধ করার উভয় অভিজ্ঞতা যথাক্রমে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের রয়েছে। বাড়াবাড়ি, মানুষের ওপর জুলুম ও তাদের অধিকার বঞ্চিত করার ফলাফল শুভ হয় না। সংঘাত, সংঘর্ষ এবং ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানোর লক্ষ্যে লোভলালসা ত্যাগ করে অবিলম্বে পদত্যাগ করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করার জন্য আমি সরকারের প্রতি অনুরাধ করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ