ঢাকা, মঙ্গলবার 11 September 2018, ২৭ ভাদ্র ১৪২৫, ৩০ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিয়ে বয়স ও ইসলামী দৃষ্টিকোণ

-এডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
ভূমিকা : কোন ছেলে বা মেয়ের ঠিক কত বছর বয়সে বিয়ে হওয়া উচিত সে বিষয়টি আধুনিক বিশ্বের মানব সমাজের একটি নতুন ভাবনা। ভারতীয় উপমহাদেশের সকল ধর্মের ছেলে মেয়েদের বয়স নির্ধারণ করে তৎকালীন বৃটিশ সরকার ১৯২৯ সালে “পযরষফ সধৎৎরধমব ধপঃ”(১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন) প্রবর্তন করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ এবং ১৫ই আগস্ট ভারতীয় উপমহাদেশকে পাকিস্তান ও ভারতীয় ডমিনিয়ন নামে বিভক্ত করে স্বাধীনতা দেয়া হয়। পাকিস্তানের অংশ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান বর্তমানের বাংলাদেশে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আইনটি বলবৎ ছিল। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল পূর্ব পাকিস্তান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। একই সালের ১৬ই ডিসেম্বর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের একপর্যায়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পরিপূর্ণ স¦াধীন রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্বের দরবারে স্থান করে নেয়। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান জাতীয় পরিষদে পাস হয়। ঐ সংবিধানে ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ আইনটিকে পুনরায় কার্যকরিতা দেয়া হয়। আইনটি কার্যকর থাকার পরেও বাংলাদেশের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের বিবাহের ক্ষেত্রে আইনটি মানা হচ্ছে কি না তার কোন কড়াকড়ি ছিল না।
২০১৭ সালের ২৪শে নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনটিকে বিলুপ্ত করে “বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭” অনুমোদিত হয়। আইনটি তৎপূর্বে ২০১৭ সালের ৬ নং আইন হিসাবে ১১-০৩-২০১৭ ইং তারিখে জনসাধারণের জ্ঞাতার্থে গেজেট আকারে আইনটির খসড়া প্রকাশ করা হয়। নতুন আইনটির বৈশিষ্ট্য হলো পূর্বে বলবৎ থাকা ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে ছেলেদের বিবাহের বয়স ছিল ২২ বছর এবং মেয়েদের বয়স ছিল ১৮ বছর। বর্তমান আইনে মেয়েদের বিবাহের বয়স সর্বনিম্ন ১৮ বছর এবং ছেলেদের বিবাহের বয়স সর্বনিম্ন ২২ এর স্থলে ২১ বছর নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বর্তমান বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো আইনটির ১৯ ধারায় বলা হয়েছে যে “এই আইনে অন্যান্য বিধানে যা কিছুই বলা থাকুক না কেন বিধি দ্বারা নির্ধারিত বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্ত বয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং পিতামাতা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিক্রমে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীনে অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না। নতুন “বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭” বাংলাদেশে বলবৎ হওয়ার ফলে ইসলামী আইনে বাল্যবিবাহ আইনের সাথে বর্তমান আইনের অসংগতি দূরিভুত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ইসলামের নামে পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করলেও ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনসহ বৃটিশ সরকারের প্রবর্তিত কোন আইনকেই ইসলামী আইনের সাথে সামঞ্জস্য করে সংশোধন করা হয়নি। যা গোটা পাকিস্তানের ইসলামপ্রিয় মানুষের প্রত্যাশা ছিল। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ও জাতীয় সংসদ নতুন বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন পাস করায় এবং আইনটি ইসলামী আইনের সাথে সামঞ্জস্য হওয়ায় বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আনন্দিত। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রত্যাশা বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর মত দেশে প্রচলিত আইনগুলোকেও ইসলামী আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সংশোধন করা হবে।
বাল্যবিবাহ বলতে কি বুঝায়-
বাল্যবিবাহ সাধারণত দুই প্রকার। এক.সাবালকত্বপ্রাপ্ত হয় নাই এমন একটি কন্যা শিশুকে অভিভাবক কর্তৃক বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ বা তদূর্ধ্ব বয়সের কারো সাথে বিবাহ দেয়া। দুই. ছেলে বা মেয়ে উভয়ের মধ্যে বিবাহের বয়সে পৌঁছার আগে বা সাবালকত্ব লাভের পূর্বে উভয়পক্ষের অভিভাবক কর্তৃক বিবাহ দেয়া।
ইসলামী আইনে বাল্যবিবাহ-
ইসলামী আইন বিশেষেজ্ঞ (ফকিহ)গণ নাবালক নাবালিকা ছেলেমেয়েদের উল্লেখিত দু ধরনের পদ্ধতিতে বিবাহ দেয়ার বিষয়ে দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে ফতোয়া প্রদান করেছেন। একদল সাধারণভাবে বাল্যবিবাহ নিষেধ করেছেন। যেমন ইমাম আবু হনিফা (রঃ) এর সমসাময়িক ইরাকী ফকিহ (ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞ) ইমাম ইবনে শুবরুমা এবং কাজি আকুবকর আল আছাম। যে সমস্ত ফকিহ বাল্যবিবাহ সম্পাদন নিষিদ্ধ করার পক্ষে তাদের শরয়ী দলিল হলো কুরআন মজিদের সুরা আন নিসার ৬ নং আয়াতের প্রথম অংশ। “ ওবতালুল ইয়াতামা হাত্তা ইযা বালাগুন্নিকাহা” অর্থাৎ তোমরা এতিমদেরকে পরীক্ষা করতে থাক যতদিন না তারা বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছে যায়। আয়াতংশটি আইনগত অভিভাবক পিতা, পিতার অভাবে দাদা বা বিকল্প অভিভাবকদের তত্ত্বাবধানে থাকা সম্পদ এতিমদের দায়িত্বে কখন প্রত্যার্পণ করা যাবে সে বিষয়ে নাজিল হয়েছে।
এ বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশ হলো এতিমরা বিবাহের বয়সে না পৌঁছা পর্যন্ত তাদেরকে সম্পত্তির দেখা শোনার দায়িত্ব অর্পণ করা যাবে না। উদ্ধৃত আয়াতাংশটিতে ছেলে মেয়েদের বিবাহের জন্য একটি বয়স নির্ধারিত আছে মর্মে বুঝা যায়। আর সেটা হলো বুলুগ বা সাবালকত্ব । ছেলেরা যখন এমন বয়সে উপণীত হয় যে সময়ে তাদের ইহতিলাম বা স্বপ্ন দোষ হয়  এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে যখন তাদের মাসিক হায়িদ্ব বা মাসিক ঋতু আরম্ভ হয়। ইসলামী শরিয়তে সেটাই হলো ছেলেমেয়েদের বিবাহের বয়স। এই ধারার ফকিহগণের আর একটি যুক্তি হলো আরবী নিকাহ (বিবাহ) শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো যৌনমিলন শব্দটি নিয়ে। যেহেতু বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধ যৌন মিলন । একজন নাবালক ও নাবালিকার মধ্যে বা একজন সাবালক বা সাবালিকার সাথে আরেকজন নাবালিকা বা নাবালকের মধ্যে বিবাহ সম্পাদন করা হলে বিবাহের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। ফলে বিবাহটি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। নাবালক ও নাবলিকার বিবাহ সম্পাদন করা গেলেও তারা সাবালক না হওয়া পর্যন্ত তাদের উপর শরয়ী আইন প্রয়োগ করা যায় না। সে কারণে এ ধরনের বিয়ে অপ্রয়োজনীয় বা পরিত্যক্ত।
উল্লিখিত মতামতটির বিপরীতে ফকিহগণের অধিকাংশের ফতোয়া বা মতামত হলো নাবালক ও নাবালিকার মধ্যে বা কোন নাবালিকা মেয়ের সাথে যে কোন বয়সের সাবালক পুরুষের সাথে সম্পূর্ণরুপে জায়েজ বা বৈধ। এ মতটির সাথে যেসব ইসলামী আইনবিদ ঐকমত্য পোষণ করেছেন তারা হলেন ইমাম আবু হানিফা (রঃ), ইমাম শাফেয়ী (রঃ), ইমাম মালিক বিন আনাস (রঃ), ইমাম আহমদ বিন হাম্বাল (রঃ) এবং তাদের অনুসারী পরবর্তী যুগের ইসলামী আইনবিদগণ। শীয়াহ্ বা জাফরী ফিকহের অনুসারীগণও এ মতের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন। এই ধারার ফকিহ বা ইসলামী আইনবিদগণের অভিমত হলো ইসলামী শরিয়তের বিধান মোতাবেক নাবালক ছেলেমেয়েদের বিবাহ তাদের পক্ষে অভিভাবকগণ সম্পাদন করতে পারেন। ইসলামী শরীয়তে এধরনের বিবাহ সম্পূর্ণরূপে জায়েজ মর্মে তারা মত দিয়েছেন। তাদের এ মতের স্বপক্ষে তারা পবিত্র কুরআনের সুরা আত তালাকের ৪ নং আয়াত এবং সাহাবায়েকেরাম ও তাবেঈগণের কতিপয় আসার (কর্মধারা বা আমল) দলিল হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
সুরা আত তালাকের ৪নং আয়াতে আল্লাহ বলেন“ওল্লায়ী ইয়াইস্না মিনাল মাহিদ্বি মিন নিসায়ীকুম ইনির তাবতুম ফাইদ্দাতুহুন্না ছালাছাতা আশহুরিন ওল্লায়ী লামইয়া হিদ্বনা” অর্থাৎ যেসব স্ত্রীলোকের মাসিক ঋতু বন্ধ হয়ে গেছে তাদের ব্যাপারে তোমাদের যদি সন্দেহ হয়(জেনে নাও) তাদের ইদ্দতকাল হলো তিন মাস(পরবর্তী বিবাহের জন্য বা স্বামীর সাথে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য)। আর যাদের মাসিক ঋতু আরম্ভ হয়নি তাদের জন্যও একই নির্দেশ। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ